বিএনপির ডাকা অবরোধ শুরুর তৃতীয় দিন থেকে রফতানি পণ্য ( গার্মেন্টস পণ্য) নিয়ে আশুলিয়া থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে যাচ্ছি। ভাগ্য ভাল বলতে হবে, কারণ দুর্বৃত্তদের কবলে পড়তে হয়নি। তার পরও চরম আতংকের মধ্য দিয়ে কাটে প্রতি মুহূর্ত। এই বুঝি কেউ গাড়িতে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করলো। পাশাপাশি স্বজনরা ফোন করে প্রতিনিয়ত খবর নেয়, ভাল আছি কীনা। শুধু আমি নয়, আমার মত অনেকের মধ্যেই এ সংশয় কাজ করছে।
এ কথাগুলো কাভার্ডভ্যান চালক আব্দুল করিমের। গতকাল বিকালে রাজধানীর তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে গেলে এভাবেই তিনি তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, আমরা দিন মজুর। একদিন কাজ না করলে পরিবার পরিজন নিয়ে উপোস থাকতে হবে। ফলে সব ভয়কে দূরে ঠেলে দিয়ে আমাদের পথে নামতে হচ্ছে। প্রায় একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানান শ্যামলী পরিবহনের যাত্রী অখিল হালদার। তিনি বলেন, তার গ্রামের বাড়ি যশোরে। এক মাত্র বোনের বিয়ে, তাই না গেলেই নয়। বিয়েতে তার উপস্থিতি একান্ত জরুরি। তাই বাধ্য হয়ে ঝুঁকির মধ্যে বাসে চড়ছেন।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, সরকারের নিরাপত্তার আশ্বাসের ভিত্তিতে দূরপাল্লার বাস নগরীর তিনটি টার্মিনাল থেকে চলাচল শুরু হয়েছে। তবে যাত্রী সংকটের কারণে পর্যাপ্ত গাড়ি চলাচল করতে পারছে না। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-যশোর-বেনাপোল রুটে পুলিশ পাহারায় গাড়ি চলাচল করছে। তবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না পাওয়ার কারণে উত্তর বঙ্গের গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁও, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া রুটে বাস চলাচল শুরু করা যায়নি। তিনি বলেন, ঢাকার আশপাশ এলাকায় বাস চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু তারপরেও চালকদের মধ্যে রয়েছে পেট্রোল বোমা আতংক।
তিনি বলেন, যেসব যাত্রী বাসে উঠছেন তারা নেহায়েত ঠেকায় উঠছেন। পাশাপাশি গাড়ির চালক হেলপার ও মালিকদের মতো যাত্রীদের মধ্যেও একই আতংক বিরাজ করছে। তিনি বলেন, এই আতংকের অবসান না হলে দূরপাল্লার রুটে গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক হবে না।
সোহাগ পরিবহনের মালিক ও বাস ট্রাক ওনার্স এসোসিয়েশন সভাপতি ফারুক তালুকদার সোহেল বলেন, তার পরিবহনের স্বল্প সংখ্যক বাস ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-খুলনা রুটে চলাচল করছে। তবে পর্যাপ্ত যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। তিনিও একই আশংকার কথা জানিয়ে বলেন, অবরোধে তার পরিবহনের তিনটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে গত দুইদিন ধরে দু্’একটি রুটে গাড়ির সংখ্যা বাড়িয়েছেন। তা দিনের চেয়ে রাতে বেশি।
শ্যামলী পরিবহনের মালিক ও বাংলাদেশ বাস ট্রাক ওনার এসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট রমেশ চন্দ্র ঘোষ বলেন, ঢাকা-বেনাপোল- কলকাতা, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-সুনামগঞ্জ, ঢাকা-কুষ্টিয়া, ঢাকা- চট্টগ্রাম রুটে তার পরিবহনসহ অন্য পরিবহনের কিছু বাস ছেড়েছে। তিনি বলেন, সব চেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে যাত্রী সংকট। যাদের খুব প্রয়োজন সেই সব যাত্রীরাই ঝুঁকি নিয়ে বাসে উঠছেন। তিনি বলেন, পুলিশ পাহারা থাকার পরও কোন ভাবেই কাটছে না আতংক। এ আতংক যেমন যাত্রীর তেমনি গাড়ির চালক ও মালিকেরও।
বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রোস্তম আলী খান বলেন, গত কয়েকদিনের চেয়ে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান চলাচল বেড়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের পাশাপাশি বেনাপোল রুটেও চলাচল করেছে। তবে আতংক কাটেনি। তিনি মহাসড়কে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
রেলওয়ে পুলিশের ডিআইজি এসএম রুহুল আমিন বলেন, নিরাপত্তার কারণে ট্রেন চলাচলের গতি কমানো হয়েছে। এ কারণে সিডিউল বিপর্যয় হচ্ছে। তিনি রেল যাত্রীদের উদ্দেশে বলেন, সবাইকে মনে রাখতে হবে সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য বেশি। তবে খুব দ্রুত এ পরিস্থিতির অবসান হবে বলে তিনি আশাবাদী।
তিনি বলেন, দেশের ২ হাজার ৮৭৭ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথের ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে জিআরপি, আরএনবি, পুলিশের পাশাপাশি মোতায়েন করা হয়েছে আট হাজার আনসার ও ভিডিপি সদস্য। তবে গতকাল দেশের কোথাও কোন ধরনের নাশকতার খবর পাওয়া যায়নি।
হাইওয়ে পুলিশর ডিআইজি মল্লিক ফকরুল ইসলাম বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-যশোর রুটে দূরপাল্লার বাস চলাচল করছে। তবে বগুড়া গাইবান্ধাসহ বেশ ক’টি রুটে চলাচল স্বাভাবিক করা যায়নি। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম রুটে পণ্যবাহী কাভার্ডভ্যান ও ট্রাক চলাচল অনেকটা বেড়েছে। তিনি আরো বলেন, যথেষ্ট নিরাপত্তা দেয়ার পরও বাস, কাভার্ডভ্যান চালক ও যাত্রীদের পেট্রোল বোমা আতংক রয়েছে। এ আতংক অবসানের লক্ষ্যে হাইওয়ে পুলিশ ব্যাপক প্রচারণা শুরু করেছে। আশা করা যায় দ্রুত সময়ের মধ্যে এ অবস্থার অবসান হবে।
কোতোয়ালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবুল হাসান বলেন, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। আগের চেয়ে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। গতকাল সকালে দক্ষিণাঞ্চল থেকে ৪০টি লঞ্চ টার্মিনালে এসেছে আর সমপরিমাণ লঞ্চ ছেড়ে গেছে। বাস, ট্রেনে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হবার কারণে লঞ্চে বেড়েছে যাত্রীর চাপ। প্রত্যেকটি লঞ্চে যাত্রী ছিল কানায় কানায় পূর্ণ।