শিল্পাচার্যের হাত ধরে আমাদের চারুকলা

জয়নুল আবেদিনকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার অগ্রযাত্রার সূত্রপাত ঘটে। ১৯৪৮ সালে চারুকলা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের লোকায়ত শিল্পধারাকে অবলম্বন করে গড়ে উঠতে থাকে তরুণ শিল্পীরা
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম যেমন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের গুণে পাওয়া, বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার উন্মেষও তেমনি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের একান্ত প্রচেষ্টার ফসল। শিল্পাচার্যের কথা উঠতেই দেশের স্বনামধন্য শিল্পী মুর্তজা বশীর বললেন, জয়নুল আবেদিন বাংলাদেশে শিল্পচর্চার বীজবপন করেছিলেন আর সেই বাগানে মালির কাজটি করেছিলেন শিল্পী আমিনুল ইসলাম।
একসময় গোটা অবিভক্ত ভারতবর্ষ ছিল প্রায় একই রকম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বন্ধনে অটুট— মহেঞ্জোদারো থেকে মহাস্থানগড়। ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর পশ্চিম পাকিস্তানের (বর্তমান পাকিস্তান) মতো বাংলাদেশ তথা তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান নামক ভূ-খণ্ডটিতেও তত্কালীন শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় মতাদর্শের সমর্থক সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সেই সময় ধর্মীয় সীমারেখা অতিক্রম করে চিত্রকলায় শিক্ষার্থীদের লোকায়ত বাংলার সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়েছেন। বাংলার প্রতি তার যে ভালোবাসা তা তার ছাত্রদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন।
আজ অবস্থা অনেক পাল্টেছে। যেখানে ষাটের দশকে বিদেশিরা ছাড়া ছবির ক্রেতা ছিল না সেখানে বাংলাদেশেই এখন শিল্পসংগ্রাহক গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের ছবির ৯০ শতাংশ ক্রেতাই এখন দেশের। সুতরাং এটাও সত্যি যে, শিল্পী তৈরির পাশাপাশি শিল্পের সমঝদারও সৃষ্টি হয়েছে।
শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী মৃত্যুর আগে দৈনিক ইত্তেফাককে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, ‘জয়নুল আবেদিনের বাসায় লোকশিল্পের, কারুশিল্পের অনেক সংগ্রহ ছিল। সেসব আমাদের দেখাতেন। তার বাসাতেই দেখি ট্যাপা পুতুল। লাল, হলুদ, নীল— এসব প্রাইমারি উজ্জ্বল রঙে রাঙানো। দেখি বাংলার নকশীকাঁথা। বাংলার মেয়েরা সুঁইসুতো দিয়ে কি সাধারণ অথচ অনন্যভাবে নকশা করেছেন সেসব কাঁথা। স্যার আমাদের চেনাচ্ছেন লক্ষ্মীর সরা, শখের হাঁড়ি প্রভৃতি। এসব যে আগে দেখিনি তা নয়। কিন্তু এসবের মাঝ থেকেই বাংলার চিরায়ত রূপকে, বাংলার লোকায়ত শিল্পকে আমাদের চিনতে শেখাচ্ছেন আবেদিন স্যার। আমাদের কাছে একেকটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে। গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রার ভেতরে, বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে ঘুরে আবেদিন স্যার আমাদের মাঝে লোকায়ত বাংলাকে তুলে ধরতেন। যে বাংলাদেশকে নিয়ে এতদিন আমরা গভীরভাবে ভাবিনি — এইভাবে বাংলাদেশ শিল্পীদের মনে জায়গা করে নিয়েছে।’
দেশ বিভাগের পর তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে যেসব শিল্পী চারুশিল্পের চর্চা সূচিত করেন তাদের মধ্যে সৃজনশীল শিল্পী হিসেবে রয়েছেন সফিউদ্দিন আহমেদ, কামরুল হাসান ও এসএম সুলতান। চল্লিশের দশকের শিল্পীদের সাধারণ ঐক্যসূত্রটি স্বদেশের প্রকৃতি ও জনজীবনকে শিল্পে প্রতিবিম্বিত করার প্রয়াসে পরিলক্ষিত হয়। এই তিনজন এবং আরো যে মাস্টার পেইন্টাররা বাংলাদেশের চিত্রকলাকে বিশ্বের আধুনিক চিত্রকলার সমপর্যায়ে তুলে এনেছেন তারা হলেন সফিউদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদ কিবরিয়া, আমিনুল ইসলাম, মুর্তজা বশীর, দেবদাস চক্রবর্তী, রশীদ চৌধুরী, কাইয়ুম চৌধুরী।
এদের প্রত্যেকের এবং পরবর্তী পর্যায়ের শিল্পীদের ধারাবাহিক অবদানের ফসল আজকের বাংলাদেশের চিত্রকলা। বাংলাদেশে চিত্রকলার আধুনিকতা বিনির্মাণ ও প্রসারে, সাংস্কৃতিক অচলায়তন ভাঙ্গতে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সৃষ্টিকর্ম ও তার ব্যক্তিগত কর্মতত্পরতা যুগান্তকরী ভূমিকা রেখেছে। এবছর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের জন্মশত বর্ষ উদযাপন উপলক্ষে দেশজুড়ে সাড়ম্বরে আয়োজন করা হয় নানা অনুষ্ঠানের। কিন্তু নিজের শিল্পজীবনকে প্রায় সরিয়েই রেখে দিয়েছিলেন তিনি।
শিল্পী মুর্তজা বশীর বললেন, বাংলাদেশের শিল্পচর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গিয়ে শিল্পাচার্য নিজের শিল্পচর্চাকে বিসর্জন দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের নতুন শিল্পধারা সৃষ্টিতেও এক অসামান্য অবদান রেখেছিলেন এই ক্ষণজন্মা পুরুষ। জয়নুলের খ্যাতি ছিল সেই খ্যাতিকে কাজে লাগিয়ে সরকারি মহলে দেনদরবার করে তিনি চারুকলা ইন্সটিটিউটকে গড়ে তুলেছিলেন।
গ্যালারি কায়ার পরিচালক শিল্পী গৌতম চক্রবর্তী বললেন, চারুকলা ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠার আগে বাংলাদেশের চিত্রকলা, রিকশা, নৌকা ও নদীর মাঝে আটকে ছিল। এরপরের জয়নুল আবেদিনের প্রয়াস আমাদের আধুনিক চিত্রকলার দিকে পরিচালিত করেছে।
গৌতম চক্রবর্তী বললেন, ছবি আঁকার শেখার যে ভিত্তি তিনি গড়ে দিয়েছিলেন সেই পথ ধরেই আজকে বাংলাদেশের শিল্পের এই অগ্রযাত্রা। সেই সময় শিল্পীদের অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। শুধু ছবি এঁকে জীবন চলে না। কিন্তু অনেক শিল্পী সেই সংগ্রামের পথকে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু আজকে আমাদের মাস্টার পেইন্টারসহ সিনিয়র শিল্পীদের হাত ধরে আজকের একটি শক্ত অবস্থানে পৌঁছেছে। আজো সমস্যা হয়তো আছে, কিন্তু এখন একজন শিল্পী শুধু ছবি এঁকে জীবন কাটানোর কথা চিন্তা করতে পারেন। এটা কম বড় পাওয়া নয়।
এক নজরে শিল্পাচার্য
বিরল শিল্প প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি নিজস্ব শৈল্পিক দক্ষতার গুণে ছাত্রজীবনেই সর্বভারতীয় পর্যায়ে শিল্পী হিসেবে সুনাম অর্জন করেন এবং পরবর্তী কয়েক বছরে (১৯৩৯-৪৭) মুষ্টিমেয় আধুনিক ভারতীয় শিল্পীর নামের তালিকায় স্থান করে নেন। দেশবিভাগের পর ঢাকায় এসে তিনি এ অঞ্চলে শিল্প-শিক্ষালয়ের অভাব অনুভব করেন। তিনি আগ্রহী হয়ে ওঠেন আমাদের সমাজ থেকে রুচির দুর্ভিক্ষ দূর করতে, মানুষের মধ্যে সৌন্দর্যবোধ জাগ্রত করতে। তা তার একার ছবি আঁকার মাধ্যমে সম্ভব ছিল না। এ কারণেই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ব্যাপারে তিনি মনোনিবেশ করেন। আজ সারা বাংলাদেশে শিল্পচর্চার বিপুল কর্মযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করে আমরা তার স্বপ্ন কীভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে তা উপলব্ধি করতে পারি। তার ছাত্রদের কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের হাতে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বগুড়া ও নারায়ণগঞ্জে গড়ে উঠেছে শিল্প শিক্ষার প্রতিষ্ঠান। ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন শিশুদের জন্য চিত্রাঙ্কনের একটি বিদ্যালয়। আজ সারাদেশের শিশুদের মধ্যে চিত্রাঙ্কনের যে আগ্রহ ও সমারোহ আমরা লক্ষ্য করি, তার উত্সমূলে ওই খুদে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা অনস্বীকার্য। এভাবেই সমগ্র জাতির মধ্যে তিনি শিল্প শিক্ষার যে বীজ বুনেছিলেন তা আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে।
১৯১৪ সালে কিশোরগঞ্জে ২৯ ডিসেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে তার শিল্পীমানস গড়ে ওঠে। তিনি বাঙালির শিল্পকলার ঐতিহ্য নির্মাণ ও আধুনিক চিত্রকলার পথিকৃত্ ব্যক্তিত্ব। তার অসাধারণ নেতৃত্ব গুণে ১৯৪৮ সালে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে গড়ে তুলেছিলেন চারুকলা ইনস্টিটিউট। তিনি ছিলেন, চারুকলা ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। শিল্পাচার্যের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৭৫ সালে ঐতিহাসিক সোনারগাঁয়ে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
১৯৩৩ সালে তিনি কলকাতা সরকারি আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। এখানেই তার ইউরোপীয় ও আধুনিক চিত্রকলার সাথে পরিচয় ঘটে। ১৯৩৮ সালে তিনি সর্বভারতীয় চিত্রপ্রদর্শনীতে স্বর্ণপদক লাভ করেন। তার চিত্রকর্মে ফুটে উঠেছে বুভুক্ষু মানুষের আর্তনাদ এবং একই সঙ্গে প্রতিবাদী ভঙ্গি মূর্ত হয়ে উঠেছে। তার ‘সংগ্রাম’ ও দুর্ভিক্ষ সিরিজের চিত্রগুলো আজো মানুষকে শক্তি দেয়। দেয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস।
চারুকলা অনুষদ
জয়নুল আবেদিনকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার অগ্রযাত্রার সূত্রপাত ঘটে। ১৯৪৮ সালে চারুকলা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের লোকায়ত শিল্পধারাকে অবলম্বন করে গড়ে উঠতে থাকে তরুণ শিল্পীরা। বাংলাদেশের মাস্টার পেইন্টার জয়নুল-কামরুল-সুলতানকে সামনে পায় তারা। ধীরে ধীরে একটি উজ্জীবিত তরুণ প্রজন্ম গড়ে ওঠে। আমিনুল ইসলাম, মোহাম্মদ কিবরিয়া, কাইয়ুম চৌধুরী, মুর্তজা বশীর, রশীদ চৌধুরী, দেবদাস চক্রবর্তী, হাশেম খান, রফিকুন নবী, মনিরুল ইসলাম, শাহাবুদ্দিন আহমেদ, শহীদ কবীর — তখনকার এই তরুণ শিল্পীরাই আজকের বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার পথিকৃত্। তাদের অবলম্বন করেই বর্তমানের তরুণ শিল্পীরা গড়ে উঠছেন। বাংলাদেশে প্রথম গ্যালারির নাম ছিল ‘আনসাম্বল’। এ গ্যালারির সঙ্গে অনেক শিল্পীরাও যুক্ত ছিলেন। এখন চারুকলা থেকে পাস করে বের হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ বেড়েছে। বাংলাদেশে এখন আর্ট ইনস্টিটিউশনের সংখ্যা অনেক বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্তত ছয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা বিভাগ রয়েছে। দুটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে চারুকলা অনুষদ। এগুলো হলো- শান্ত মরিয়ম এবং ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ (ইউডা)। এছাড়া বিভিন্ন শহরে চার-পাঁচটি কলেজ রয়েছে যেখানে চারুকলা বিষয়ক শিক্ষা দেয়া হয়। গত ২০ বছরে আর্টিস্টের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান ও গ্যালারির সংখ্যা বেড়েছে। গ্যালারিতে নিয়মিত প্রদর্শনী হচ্ছে। বর্তমানে কমার্শিয়াল গ্যালারির মধ্যে রয়েছে- বেঙ্গল শিল্পালয়, বেঙ্গল আর্ট লাউঞ্জ, গ্যালারি কায়া, ঢাকা আর্ট সেন্টার, গ্যালারি শিল্পাঙ্গন, গ্যালারি টোয়েন্টি ওয়ান, গ্যালারি চিত্রক, অ্যাথেনা, গ্যালারি কসমস প্রভৃতি।
ছবির বাজার
মুক্তিযুদ্ধের পরপরই ১৯৭৪ সালে প্রথম প্রতিষ্ঠা পায় সাজু আর্ট গ্যালারি। এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রমিজ আহমেদ চৌধুরী সাজু বললেন, মানুষের ছবির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। যখন এ গ্যালারি শুরু করি তখন ছবি কিনতেই চাইতো না মানুষ। দেশসেরা শিল্পী জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসানের ছবি বিক্রি হয়েছে নামমাত্র মূল্যে। কিস্তিতেও ছবি বিক্রি করেছি। এখন তো সে অবস্থা পাল্টে গেছে। অনেক গ্যালারি হয়েছে মানুষের ছবির প্রতি, তা সংগ্রহ করার আগ্রহ বেড়েছে। মানুষের এই শিল্প সংগ্রহ তার প্রতি ভালোবাসার যে ক্রমবর্ধমান ধারা এটা তো খুবই ভালো ব্যক্তি মানুষের জন্য, সমাজের জন্যেও।
বাংলাদেশের প্রথম আধুনিক গ্যালারি হিসাবে পরিচিত শিল্পাঙ্গনের পরিচালক রুমী নোমান বললেন, প্রয়াত ফয়েজ আহমদ ১৯৯২ সালে গ্যালারি শিল্পাঙ্গন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর স্বপ্নই ছিল বাংলাদেশের শিল্পচর্চাকে আধুনিক বিশ্বের ধারায় একটি কাঠামোয় নিয়ে আসা। সেদিক থেকে শিল্পাঙ্গনের স্বপ্ন সফল হয়েছে। তবে এটাও ঠিক যে, শুধু ছবি বিক্রি করে একটি গ্যালারির টিকে থাকা সম্ভব না। দেশের কোন গ্যালারিই ছবি বিক্রি করে টিকে নেই। যারা গ্যালারিগুলো চালু রয়েছে মূলত শিল্পপ্রেমী মালিকদের পৃষ্ঠপোষকতায়।
নব্বুইয়ের দশকে গ্যালারি শিল্পাঙ্গন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিল্পের প্রসারে যে অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল এক দশক পরে বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টস সেই ধারাকেই যেন বহু দূর এগিয়ে নিয়ে চলেছে। এখন সারাদেশে সরকারি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গ্যালারি ও কমার্শিয়াল গ্যালারি মিলিয়ে প্রায় ৪০টির মত হবে। কমার্শিয়াল গ্যালারির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু ছবি বিক্রি করে এখনো একটি গ্যালারি টিকে থাকার পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
এই গ্যালারিগুলোতে প্রায় সারাবছরই প্রদর্শনী চলে। জনপ্রিয় প্রবীণ শিল্পীদের প্রদর্শনী তো চলেই পাশাপাশি তরুণ শিল্পীদের প্রদর্শনীও কম হচ্ছে না। এছাড়া শিল্পীদের বেশকিছু সংগঠন হয়েছে এরাও দলবদ্ধ প্রদর্শনী নিয়ে আসেন শিল্পরসিকদের সামনে। ফলে এখন মানুষ প্রচুর ছবি দেখছে। মানুষের মাঝে শিল্পের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে, তেমনি একটি শিল্পরুচিও গড়ে উঠছে। কিন্তু এত এত প্রদর্শনীর ছবিগুলো কারা সংগ্রহ করেন।
গ্যালারি মালিক ও শিল্পীরা বলছেন, প্রধানত বিত্তশালী ও রুচিবান মানুষরাই শিল্পের ক্রেতা। কিন্তু বাংলাদেশ সৃষ্টির পরে যারা বিশাল অর্থের মালিক হয়েছেন এই ব্যবসায়ীদের দ্বিতীয় প্রজন্মই এখন ছবির ক্রেতা। একইসঙ্গে কর্পোরেট ক্রেতাও সৃষ্টি হয়েছে দেশে। ব্যাংক-বীমা প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের বাত্সরিক একটি খাত থাকে যা এই শিল্প সংগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যয় করা হয়।
ছবির বাজার প্রসঙ্গে মুর্তজা বশীর বললেন, একটা সময়ে বাংলাদেশের ছবির ক্রেতা ছিলেন বিদেশিরা। এখন দেশের বড় ব্যবসায়ীরা বিশেষ করে যারা রফতানি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত তাদের মধ্যে ছবি কেনার প্রবণতা বেড়েছে। কিন্তু এদের মধ্যে ভালো ছবি কেনার চাইতে ব্র্যান্ড কেনার প্রবণতা বেশি। ছবির চাইতে শিল্পীর নাম দেখে ছবি কেনেন বেশিরভাগ সংগ্রাহক। এটা হচ্ছে ছবি না বোঝার কারণে।
চিত্রকলার গোড়ার কথা
প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে আমরা মানুষের শিল্পচেতনার পরিচয় পাই। সেই গুহাবাসী মানুষকে জীবন ধারণের জন্য, ক্ষুধা নিবারণের জন্য জীবজন্তু শিকার করতে হতো। এসব জীবজন্তুর ছবি তারা এঁকে রাখতো গুহার গায়ে। বলা যায়, এখান থেকেই চিত্রকলার শুরু।
বাংলার প্রাচীন চিত্রকলা
ঠিক কবে থেকে বাংলায় চিত্রকলার শুরু এটা বলা বেশ কঠিন। তবে বিভিন্ন নিদর্শন দেখে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন, বাংলার প্রাচীনতম চিত্রকলার নিদর্শন পাল-আমলে রাজা মহীপাল দেবের সময়ে তালপাতায় আঁকা নালন্দা মহাবিহারের ‘বৌদ্ধ-অনুচিত্র’। অঙ্কনশৈলীর বিচারে এ চিত্রকলা সর্বভারতীয় ধ্রুপদী চিত্রকলার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন পশ্চিম ভারতের ‘অজন্তা-দেয়ালচিত্রের’ সমগোত্রীয়। সঙ্গত কারণে এ বৌদ্ধ-অনুচিত্রগুলি বাংলার চিত্রকলার সর্বপ্রাচীন বা প্রাথমিক পরিচয় নয়। ওই সময়ের আগে এ অঞ্চলে চিত্রচর্চার ঐতিহ্য বজায় ছিল। বঙ্গীয় অঞ্চলে চিত্রকলার প্রাচীনতম নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার ‘পান্ডুরাজার ঢিবিতে’।  সেখানে পাওয়া যায় মৃত্পাত্রের গায়ে নানা নকশাধর্মী অলঙ্করণ।
পালপূর্ব আমলের প্রাচীন বাংলার ইতিহাস যেমন অস্পষ্ট, ওই সময়ের শিল্পকলাও বিচ্ছিন্ন এবং বিক্ষিপ্ত। বাংলাদেশের বগুড়া অঞ্চলে মহাস্থানের প্রাচীন ‘পুন্ড্রনগর’-এ প্রাপ্ত মৌর্যযুগের এবং ‘চন্দ্রকেতুগড়’-এ আবিষ্কৃত সুঙ্গ যুগের টেরাকোটা ফলকচিত্রগুলি এবং ময়নামতির গুপ্ত পরবর্তী ও পাহাড়পুরের প্রাথমিক পালযুগের পোড়ামাটির ফলকগুলি বিবেচনা করা চলে। পোড়ামাটির ফলকগুলিতে ফুলপাতা থেকে শুরু করে পশুপাখি, নরনারী, দেবদেবী এবং কাল্পনিক গল্পগাথাও রূপায়িত হয়েছিল।