চোখ গেল, ট্রাকও গেল সংসার চলবে কিভাবে

 ‘স্যার, আমার চোখ গেল, ট্রাকও গেল, আমার স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তান এখন কিভাবে বাঁচবে। দয়া করে আমার চোখের আলো ফিরিয়ে দেন। আমি ট্রাক চালিয়ে খাবো।’ শেরেবাংলানগর জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে চিকিত্সাধীন ট্রাক চালক মো. জাহিদ হোসেন লাকী (৪৫) ডাক্তারসহ যে কেউ গেলে এমন আবেদন করেন।

গত ৮ জানুয়ারি গভীর রাতে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী এলাকায় অবরোধকারীরা তার ট্রাকে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করলে আগুন ধরে যায়। অবরোধকারীরা পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করেই ক্ষান্ত হয়নি, ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। আগুন থেকে রক্ষা পেতে লাফ দেন লাকী। ততক্ষণে তার মুখমন্ডলের কিছু অংশ ঝলসে যায়। নষ্ট হয়ে যায় ডান চোখ। তার অন্য চোখটিরও ক্ষতি হয়। ট্রাকটি কাঁচামাল নিয়ে বগুড়ার দিকে যাচ্ছিল।
গুরুতর আহত লাকীকে প্রথমে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখান থেকে তাকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের চিকিত্সকরা পরীক্ষা করে দেখেন যে, লাকীর ডান চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। অপর চোখটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ অবস্থায় পোড়ার চেয়েও চোখের চিকিত্সা আগে হওয়া প্রয়োজন। তাই তাকে চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়।
এই ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. জালাল আহমেদ বলেন, তার ডান চোখটি এমনভাবে নষ্ট হয়েছে চিকিত্সা করে কোন লাভ হবে না। ওই চোখটি তুলে ফেলতে হবে। নইলে ক্ষতিগ্রস্ত অন্য চোখটির আরো ক্ষতি হতে পারে।
লাকী জানান, ১৯৯৯ সালে তিনি ট্রাকটি ক্রয় করেন। নিজেই চালাতেন ট্রাকটি। এ ট্রাক থেকে যে আয় হয় তা দিয়েই তার সংসার চলে। অবরোধের আগুনে এখন তার চোখ গেল, পুড়ে গেল ট্রাকটিও।
লাকী বলেন, তার বড় ছেলে নবম শ্রেণিতে এবং মেয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। স্বপ্ন ছিল তাদের সুশিক্ষিত করবো, ওরা মানুষের মতো মানুষ হবে। অথচ দেখেন, আহত হয়ে আমি হাসপাতালে। এখন সংসার চলবে কীভাবে।
লাকীর স্ত্রী রোকসানা কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলেন, ট্রাক চালিয়ে উনি যা আয় করতেন তা দিয়ে সংসার খরচ ও সন্তানদের পড়াশোনা করাতাম। এখন স্বামী হাসপাতালে। একটি চোখ হারিয়েছেন। অপর চোখটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চিকিত্সকরা বলছেন এ অবস্থায় তিনি গাড়ি চালাতে পারবেন না। তাহলে আমাদের চলবে কীভাবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবরোধে দগ্ধ রোগীদের আর্থিক সহযোগিতা প্রদানের যে ঘোষণা দিয়েছেন সেই ঘোষণা অনুযায়ী তারা আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছেন বলে জানা গেছে।
এসএসসি পরীক্ষার্থী হূদয় ও ট্রাক চালক
লিটন মিয়াকে বিদেশে পাঠানোর নির্দেশ
চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে চিকিত্সাধীন এসএসসি পরীক্ষার্থী শাহরিয়ার হূদয় (১৬) ও ট্রাক চালক লিটন মিয়াকে (৩৫) চিকিত্সার জন্য বিদেশে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাদের বিদেশ পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক ডাঃ জুলফিকার আলী জানান।
হূদয় ও ট্রাক চালক লিটন মিয়াকে নিয়ে ইত্তেফাকে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষিত হয়। তাত্ক্ষণিক প্রধানমন্ত্রী হূদয় ও লিটন মিয়াকে বিদেশে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
৫ জানুয়ারি ফেনীর দাগনভুঁইয়ার খেজুর চত্বরে পরপর দুইটি বোমা নিক্ষেপ করে অবরোধকারীরা। বোমা হূদয় ও তার সহপাঠী এসএসসি পরীক্ষার্থী মিনহাজুল ইসলাম অনীকের (১৫) মুখমন্ডলে বিস্ফোরিত হয়। অনীকের ডান চোখ নষ্ট হয়ে যায়। বাম চোখও মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। হূদয়ের ডান চোখ নষ্ট হয়ে যায়। অপর চোখও বোমার আঘাতে ক্ষতি হয়। প্রধানমন্ত্রী অনিককে ভারতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

১৪ জানুয়ারি রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শিবগঞ্জে ট্রাকে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে অবরোধকারীরা। ট্রাক চালক লিটন মিয়ার বাম চোখ নষ্ট হয়ে যায়। ডান চোখে ভাঙ্গা গ্লাস ঢুকে কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে চিকিত্সকরা জানান।