মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে আনার পর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে জানাজা শেষে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে।
মঙ্গলবার বাদ আসর বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ গেইটে জানাজা শেষে সন্ধ্যায় তাকে সমাহিত করা হয়।
জানাজায় পরিবারের আত্মীয়-স্বজন, বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের নেতা-কর্মী-সমর্থকসহ বিভিন্ন দলের নেতারা ও শুভার্থীসহ বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ অংশ নেন। বায়তুল মোকাররমের খতিব মুহাম্মদ সালাহউদ্দিন জানাজা পড়ান।এর আগে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর থেকে কোকোর মরদেহ সকালে ঢাকায় আনার পর বিমানবন্দর থেকে সরাসরি নেয়া হয় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে। সেখানে মা খালেদা জিয়া ছেলেকে দেখার পর অশ্রুসিক্ত শেষবিদায় জানান। সেখান থেকে বিকেলে অ্যাম্বুলেন্সে করে কফিন নেয়া হয় বায়তুল মোকাররম মসজিদে। উল্লেখ্য, হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে শনিবার দুপুরে মারা যান কোকো। রবিবার মালয়েশিয়ার জাতীয় মসজিদ নাগারায় তার প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মরদেহ কুয়ালালামপুরে একটি হাসপাতালের হিমঘরে রাখা ছিল।
IMG0
কোকোর মৃত্যুতে সোমবার থেকে তিন দিনের শোক পালন করছে বিএনপি। সারাদেশে গায়েবানা জানাজাও হয়েছে। একমাত্র ভাই তারেক রহমান রবিবার লন্ডনে গায়েবানা জানাজায় অংশ নেন।
কোকোর মরদেহ আনতে তার মামা শামীম এস্কান্দারসহ কয়েকজন স্বজন ও বিএনপি নেতা ঢাকা থেকে মালয়েশিয়া রওনা হন।
সকালে কফিন নিয়ে রওনা হয়ে বেলা ১১টা ৪১ মিনিটে ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমাবন্দরে পৌঁছান শামীমসহ বিএনপি নেতারা। বিমানবন্দরে মরদেহ গ্রহণ করেন বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খান, আব্দুল্লাহ আল নোমান, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, গিয়াস কামাল চৌধুরী ও ফজলুল হক মিলনসহ বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল। বিমানবন্দর থেকে কফিনবাহী অ্যাম্বুলেন্স মা খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে পৌঁছায় ১টা ২৫ মিনিটে। কোকোর কফিন রাখা হয় কার্যালয়ের নিচতলার একটি কক্ষে। গত ৩ জানুয়ারি থেকে সেখানে অবস্থান করা খালেদা জিয়া কয়েক মিনিট পর দোতলার অফিসকক্ষ থেকে নিচে নেমে ছেলের কফিনের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
কোকোর মরদেহ আসা উপলক্ষে সকাল থেকেই নেতা-কর্মী-সমর্থকরা ভিড় জমান গুলশান কার্যালয়ে। ভোর থেকেই সেখানে কোরআনখানি ও দোয়া-দরুদ পড়া হচ্ছিল। বেলা বাড়তে থাকলে লোকসমাগমও বেড়ে যায়।
বিশেষ করে বিএনপির নারী নেত্রী-কর্মীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তাদের অনেককেই রাস্তায় বসে তসবিহ হাতে দোয়া-দরূদ পড়তে দেখা গেছে। মরদেহ আসার আগ পর্যন্ত লোকসমাগমের কারণে ওই কার্যালয়ের সামনের সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অনেকে কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশের জন্য তোড়জোড় করেন। এই অবস্থার মধ্যে দুপুর ১২ টা ৫ মিনিটে ভেতর থেকে মাইকে বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান বেগম সেলিমা রহমান বাইরে অবস্থানরত সবাইকে শান্ত থেকে কোকোর জন্য দোয়া-দরূদ পড়ার আহ্বান জানান।
লাশ এসে পৌঁছানোর পর ‘আল্লাহু-আকবর’ বলে উপস্থিত নেতা-কর্মীদের অনেকে স্লোগান দেন। প্রচ্ল ভিড় ঠেলে কফিনবাহী অ্যাম্বুলেন্স কার্যালয়ের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়।
বিএনপি নেতা মোসাদ্দেক আলী ফালু, নাজিম উদ্দিন আলম, অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার ও সানাউল্যাহ মিয়াসহ কয়েকজনকে লাশের সঙ্গে আসতে দেখা যায়।
এরপর বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস ভেতর থেকে মাইকে দীর্ঘ বক্তৃতায় বলেন, ‘ জিয়া পরিবারের ওপর ফখখরুদ্দিন-মইনের পর এই সরকারও নির্যাতন, জুলুম ও অত্যাচার চালায়। সেই অত্যাচারই নির্বাসিত কোকোকে অকালে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। তার বিরুদ্ধে সরকার মিথ্যা মিথ্যা মামলা দিয়েছে, জোরপূর্বক তাকে শাস্তি দেয়া হয়েছে।। এই জালিম সরকারের বিরুদ্ধে সবাই নিরব প্রতিবাদ করুন।
’ লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘উনি বলেছেন-মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের সন্তান, আমার ভাই বিদেশে সমাহিত হতে পারে না। বাংলার জমিনেই তাকে দাফন করব।’ গুলশান কার্যালয়ে প্রায় ৫০ মিনিট রাখার পর কফিন নিয়ে যাওয়া হয় বায়তুল মোকাররমে।
বিকেল সোয়া পাঁচটায় কোকোর জানাজা সম্পন্ন হয়। জানাজার আগে থেকে বায়তুল মোকাররমের উত্তর ও দক্ষিণ ফটক সংলগ্ন সড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। উত্তর ফটকে পুরানা পল্টন মোড় থেকে মতিঝিল পর্যন্ত, দক্ষিণে জিরো পয়েন্ট থেকে গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট ফ্লাইওভার পর্যন্ত পুরো সড়ক ভরে ছিল জানাজায় অংশ নেয়া মানুষে। এরপর কফিন নিয়ে যাওয়া হয় মসজিদের পশ্চিম পাশে খোলা স্থানে, সাধারণস্তানুষের দেখার জন্য খুলে দেওয়া হয় কফিনের মুখ।
বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের নেতারা ছাড়াও জানাজায় অংশ নেন অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন প্রমুখ।
পৌনে ৬টার দিকে দাফনের জন্য বনানী কবরস্থানের পথে রওনা হয় কোকোর কফিনবাহী আলিফ মেডকেল সার্ভিসের অ্যাম্বুলেন্সটি।
হাজার-হাজার মানুষের ভিড়ে কফিন মসজিদ থেকে বের করতে নিরাপত্তাকর্মীদের হিমশিম খেতে হয়।
পৌনে ৭টার দিকে বনানী কবরস্থানে নিয়ে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। অবরোধের মধ্যে বিমানবন্দর থেকে গুলশানের কার্যালয়, সেখান থেকে বায়তুল মোকাররম, জানাজা শেষে বনানীতে নেয়ার পুরোটা সময় কফিনের সঙ্গে ছিল বিএনপি নেতাদের কয়েকটি গাড়ি, সামনে ছিল মোটর সাইকেলের বহর, আর কফিন ঘিরে হাঁটছিলেন বহু নেতা-কর্মী।
প্রসঙ্গত, বিগত জরুরি অবস্থার সরকারের সময় গ্রেপ্তার আরাফাত রহমান কোকো ২০০৮ সালের ১৭ জুলাই কর্তৃপক্ষের নির্বাহী আদেশে মুক্তি পেয়ে চিকিত্সার জন্য থাইল্যান্ডে যান। সেখান থেকে মালয়েশিয়ায় চলে যান। স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথি ও দুই মেয়েকে নিয়ে সাত বছর ধরে কুয়ালালামপুরে থাকছিলেন তিনি। মুদ্রাপাচারের একটি মামলায় তার সাজা হয়েছিল।