আবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজে স্বর্ণের একটি বড় চালান ঢাকায় এসেছে। গতকাল সোমবার দুবাই থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসা বিমানের একটি উড়োজাহাজ থেকে দেড় মণ স্বর্ণ আটক করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সদস্যরা। উদ্ধারকৃত স্বর্ণের মূল্য ৩০ কোটি টাকা। এই স্বর্ণসহ ১২শ’ কোটি টাকা মূল্যের ‘রাঙ্গা প্রভাত’ নামক বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর উড়োজাহাজটিকেও জব্দ করা হয়েছে। গতকাল সোমবার রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এ ঘটনায় কেউ গ্রেফতার হয়নি। তবে এই স্বর্ণ চোরাচালানে বিমানের সংশ্লিষ্ট এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় দুবাই থেকে বিমানের বিজি-০৪৮ নিয়মিত ফ্লাইটটির হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের দুই ঘণ্টা আগে সকাল সাড়ে আটটায় ফ্লাইটটি দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। নিয়ম অনুযায়ী উড়োজাহাজটির সরাসরি চলে আসার কথা বোর্ডিং ব্রিজে। কিন্তু এটি থামানো হয় হ্যাঙ্গারের কাছে খোলা জায়গায়। পরে সিঁড়ি লাগিয়ে সকল যাত্রীকে নামিয়ে বাসে করে টার্মিনালে নিয়ে যাওয়া হয়।
গোপন সূত্রে খবর পেয়ে শুল্ক গোয়েন্দা সদস্যরা উড়োজাহাজে তল্লাশি চালায়। তল্লাশির সময় এর চারটি টয়লেটের মিরর প্যানেলের পেছনের দিকের বক্স এবং অক্সিজেন চেম্বারের ভেতরে লুকানো অবস্থায় ৬০ কেজি ওজনের ৪৮৫টি স্বর্ণের বার পাওয়া যায়। এর মধ্যে চারটি বার এক কেজি ওজনের, বাকিগুলো ১০ গ্রামের। খবর পেয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান বিমানবন্দরে যান এবং সাংবাদিকদের কাছে সোনা আটকের তথ্য প্রকাশ করেন।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এক পদস্থ কর্মকর্তা জানান, এই সোনা চোরাচালানের সঙ্গে বিমানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। কারণ উক্ত ফ্লাইটের ককপিট ও কেবিন ক্রু হিসেবে যারা দায়িত্বে ছিলেন তাদের কারোর সহযোগিতা ছাড়া মিরর প্যানেল ও অক্সিজেন চেম্বারের স্ক্রু খুলে এই বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ লুকানোর কাজটি সমাধা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজনে ওই ফ্লাইটের দায়িত্বে নিয়জিত ক্রুদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয়া হবে। তার মতে, যাত্রী নামিয়ে উড়োজাহাজটি রক্ষণাবেক্ষণের নামে হ্যাঙ্গারে নিয়ে চোরাচালানকৃত স্বর্ণ খালাসের পরিকল্পনা ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি মতিঝিলস্থ সেলস অফিস থেকে এক কর্মকর্তাকে বিধিবহির্ভূতভাবে দুবাই স্টেশনে বদলি করা হয়। এই কর্মকর্তা বছর খানেক আগে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে লন্ডনে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অনেক অভিযোগ ওঠে। এবার দুবাইতে তাকে পোস্টিং দেয়া হয়। এরপর পক্ষকালের ব্যবধানে দুটি ঘটনায় দুবাই থেকে বিমানের ফ্লাইটে চোরাচালানের মাধ্যমে আসা মোট প্রায় দুই মণ সোনা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটক করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত দুই বছরে হযরত শাহজালাল ও চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে চোরাচালানকৃত স্বর্ণের অনেকগুলো চালান ধরা পড়ে। এর সঙ্গে বিমান কর্মকর্তাদের যোগসাজশের অভিযোগ ওঠে। এসব সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একজন পাইলট, একজন উপ-মহাব্যবস্থাপকসহ পাঁচজনকে গত বছরের নভেম্বরে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তারা সোনা চোরাচালানের ব্যাপারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেন। তারা এখন জেল হাজতে রয়েছেন। কিন্তু এ মামলার তদন্ত কাজ বর্তমানে থমকে আছে। এ ব্যাপারে বারবার চেষ্টা করেও গোয়েন্দা পুলিশের কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।