সমুদ্র দেখতে যাওয়াই কাল হলো বাবা-মেয়ের

সমুদ্র দেখে বাড়ি ফিরছিলেন ওরা। কিন্তু বাড়িতে পৌঁছার আগেই পথে অপরাজনীতির আগুনে জীবন্তদগ্ধ হয়ে চলে গেলেন একেবারে না ফেরার দেশে। বায়না ধরে বাবার সাথে কক্সবাজার বেড়াতে গেলেও জীবিত ফেরা হলো না যশোরের মেধাবী ছাত্রী মাইশা নাহিয়ান (১৪) ও তার বাবা নুরুজ্জামান পপলুর (৪৯)। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে যাত্রীবাহী বাসে দুর্বৃত্তদের পৈশাচিক পেট্রোল বোমা হামলায় নিহতদের লাশের মিছিলে তারাও রয়েছেন। গতকাল ভোরে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। এতে আহত হয়েছেন পপলুর স্ত্রী মাহফুজা বেগমও (৩৭)। নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের খবর যশোরে পৌঁছালে আহাজারি আর ক্ষোভে ফেটে পড়েন নিহতদের স্বজনরা।

নিহত পপলু প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার ছিলেন। তিনি যশোর শহরের ঘোপ সেন্ট্রাল রোড এলাকার অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা রোকন উদ্দিন ও অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা নূরজাহান বেগমের ছেলে। মাইশা যশোর পুলিশ লাইনস মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী ছিলো।
স্বজনরা জানান, পপলু কক্সবাজার বন বিভাগে পলিব্যাগ সরবরাহের একটি ঠিকাদারি কাজ পেয়েছিলেন। এজন্য ২৯ জানুয়ারি রাতে তিনি সেখানে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। বাবা কক্সবাজারে যাচ্ছে শুনে বেড়াতে যাওয়ার বায়না ধরে মেয়ে মাইশা। বায়না পূরণে স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে কক্সবাজারে যান পপলু। সোমবার রাতে কক্সবাজার থেকে বাড়ি ফেরার উদ্দেশে রওনা হন তারা। মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৩টার দিকে পেট্রোল বোমা হামলার শিকার হয় তাদের বাস। বাসটিতে আগুন ধরে গেলে পপলুর স্ত্রী মাহফুজা বেগম জীবিত বের হয়ে আসতে পারলেও আগুনের লেলিহান শিখা কেড়ে নেয় পপলু ও মাইশার জীবন।
পপলুরা ৪ ভাই ২ বোন। পপলুর দুই সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে আসিফ ইমতিয়াজ ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অধ্যয়নরত। মঙ্গলবার সকালে বাবা-মেয়ের মৃত্যুর খবর শহরের ঘোপ সেন্ট্রাল রোডের বাসায় পৌঁছায়। এসময় স্বজনদের আহাজারিতে এলাকার পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। তারা পরস্পরকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পরেন। একইসাথে তারা এই পুড়িয়ে মারার রাজনীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
নিহত পপলুর স্বজন রবিউল ইসলাম রবি ও আহসান কবির নিপু জানান, পেট্রোল বোমার আগুনে পপলু ও মাইশার মতো নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে মারার রাজনীতি আর সহ্য করা যায় না। এভাবে আর কত মানুষ মারা গেলে এই রাজনীতি বন্ধ হবে? তারা দুই নেত্রীর কাছে এই অপরাজনীতির অবসান চেয়েছেন।
কুমিল্লায় হাসপাতালে চিকিত্সাধীন মাহফুজা বেগম সাংবাদিকদের বলেন, কক্সবাজার  থেকে ঢাকা ফেরার পথে বাসে উঠেই পাশের সিটে বসে সমুদ্রে তোলা ছবিগুলো দেখছিল মাইশা। বলছিল, ‘মা সমুদ্রে তোলা ছবিগুলো অনেক সুন্দর হয়েছে। বাসায় গিয়েই সবাইকে দেখাতে হবে।’ বাড়িতে যাওয়ার জন্য সে উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। কথাগুলো বলার সময় মাহফুজার দুই চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছিল। একটু পরই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি।

জ্ঞান ফেরার পর তিনি আবার বলতে থাকেন, পেট্রোল বোমাটি বাসে ছোঁড়া মাত্র আমি ও মাইশা দুইদিকে ছিটকে পড়ি। আমি মাথায় আঘাত পাই। আমার কানে ভেসে আসছিল মেয়ের চিত্কার, ‘মা আমাকে বাঁচাও।’ আমার স্বামীও তখন চিত্কার করছিলেন। এর পর আর কিছুই মনে করতে পারছি না।