সেনাহীন জরুরি অবস্থা জারির দাবি সংসদে

পেট্রোল বোমা দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারাসহ চলমান সহিংসতা বন্ধে, বিশেষ করে নির্বিঘ্নভাবে এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠানের স্বার্থে এক-দেড় মাসের জন্য ‘সেনাবিহীন জরুরি অবস্থা’ জারি করতে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের সভাপতি নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারি। আর ২০ দলের বর্তমান আন্দোলনকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কর্মকাণ্ড’ আখ্যায়িত করে এটিকে মোকাবেলায় ভারতের টাডা আইনের মতো আইন করে সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তবে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেছেন, সরকার শক্ত হাতে এই নাশকতা দমন করবে।

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে তারা এসব বিকল্প দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশ্য এসময় সংসদে উপস্থিত ছিলেন না। সরকারি, বিরোধী ও স্বতন্ত্র আরও কয়েকজন সদস্যও বর্তমান নাশকতা বন্ধে ‘একটা কিছু’ করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
আল্লাহর তরফ থেকে বিচার
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে বলেন, ‘খালেদা জিয়া একের পর এক মিথ্যাচার করেছেন। মিথ্যা বলার জন্য আল্লাহর তরফ থেকে তার বিচার হয়েছে, তার ছেলে মারা গেছেন। তিনি কী আল্লার ইশারাও বোঝেন না? এরপরেও কুমিল্লায় গভীররাতে বাসে পেট্রোলবোমা দিয়ে ঘুমন্ত সাতজন মানুষকে পুড়িয়ে মারলেন!’
টাডা জাতীয় আইন চাই
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনে টাডা আইন করা হয়েছিল। যে আইনে অপরাধীদের দীর্ঘমেয়াদে গ্রেপ্তার করে এবং জামিন না দিয়ে বিচার করা হয়েছে। আমাদেরও সময় এসেছে, প্রচলিত আইন বা বিশেষ আইন দিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন করা সম্ভব নয়। কোনরকম দয়া নয়, অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এই সংকট মোকাবেলা করতে হবে। কারণ তাদের আন্দোলন বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে, অসাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক ও উগ্রবাদীদের সংগ্রাম। খালেদা জিয়া ও জামায়াত এই দেশে ফ্যাসিজম প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই সংসদ নিরব দর্শকের ভূমিকায় থাকতে পারে না। শুধু আহাজারি ও বিলাপ করে নয়, এই অবস্থা মোকাবেলায় অবিলম্বে টাডা জাতীয় নতুন আইন করে দ্রুত সংকট সমাধান করতে হবে। গণতন্ত্র নিরঙ্কুশ করতে ওদের নির্মূল করতে হবে।
জরুরি অবস্থা চাই
নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারি বলেন, এতদিন ধরে অবরোধ-হরতাল চলছে। দেশবাসী হতাশ। কার্যকর ও সার্থক যৌথ অভিযান দেখতে চাই। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি’র সঙ্গে যৌথবাহিনীতে সেনাবাহিনীকেও অন্তর্ভুক্ত করা হোক। সন্ত্রাসীদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেয়া হোক। তাতেও না থামলে জরুরি অবস্থা দেয়া হোক, তবে সেনাবাহিনী নামানোর দরকার নেই। হরতাল-অবরোধসহ এই নাশকতা যেন চলতে না পারে, সেজন্য জরুরি অবস্থা দরকার। বিশেষ করে এসএসসি পরীক্ষার সময়টাতে জরুরি অবস্থা দেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
খালেদার স্থান কাশিমপুরে
জাসদের মাইন উদ্দিন খান বাদল ফ্লোর নিয়ে বলেন, অনেক হয়েছে। রাজনীতির নামে যে সহিংসতা চলছে, তা আন্দোলন নয়, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সন্ত্রাস। খালেদা জিয়া যে অন্যায়-অবিচার করেছেন, আর এক মুহূর্তও তিনি বাইরে থাকতে পারেন না। সোজা কথা তার স্থান কাশিমপুর। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার আক্রোস তো এই সংসদের ওপর। আমরা সাড়ে তিনশ সদস্য এই সংসদে আছি। খালেদা জিয়াকে বলবো- ‘আপনি প্রয়োজনে আমাদের ওপর আক্রমণ করুন। তারপরেও সাধারণ মানুষকে বোমা মারা বন্ধ করুন।’
আন্দোলনের পিছনে কোন শক্তি?
জাতীয় পার্টির (জাপা) শওকত চৌধুরী পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে বলেন, এই আন্দোলনকারীদের পেছনে কোন শক্তি রয়েছে, সেটিকে খুঁজে বের করতে হবে সরকারকে। এই অপশক্তি কোত্থেকে আসছে, এর মদদদাতা কে? এটা খুঁজে বের করতে হবে। এই শক্তিকে ধরতে হবে। হরতাল-অবরোধের বিকল্প বের করতে হবে। তিনি বলেন, বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে এই সংসদে তিনদিন কথা বলেছেন। তার কথার সূত্র ধরে সরকারি দলের সদস্যরা শুধু গরম-গরম বক্তব্য দিয়ে চলে গেলেন। জাপার পীর ফজলুর রহমান বলেন, হরতালের মধ্যে যদি এসএসসি পরীক্ষা না হয়, তাহলে অবরোধের মধ্যেও করা সম্ভব হবে না। তাই এনিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি না করে, হয় পরীক্ষা নিতে, অন্যথায় যখন হরতাল-অবরোধ থামবে তখন পরীক্ষা নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
খালেদার সর্বোচ্চ শাস্তি চাই
আওয়ামী লীগের ড. হাছান মাহমুদ বলেন, যারা খালেদা জিয়ার টেলিফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করেছে আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই। কারণ এগুলোর মাধ্যমেই খালেদা জিয়া মানুষ মারার নির্দেশ দিচ্ছিলেন যা ইতিমধ্যে ইউটিউবে এসেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধে খালেদা জিয়ার সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত। এসিড সন্ত্রাসের মতো পেট্রোল বোমা দিয়ে মানুষ মারার বিরুদ্ধেও আইন করার দাবি জানান তিনি। আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক বলেন, একজন আন্ডারমেট্রিক সন্ত্রাসী ও জঙ্গি নেত্রীর কারণে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের জীবন আজ হুমকির মুখে পড়েছে। একই দলের নজরুল ইসলাম বাবু বলেন, তারেক রহমান পোপনে গুণ্ডা-পাণ্ডা ভাড়া করে পাষণ্ডের মতো মানুষ হত্যা করছেন। খালেদা জিয়ার রাজনীতি বন্ধ করে দিতে হবে।
আরো মাযহার আছে কিনা?

স্বতন্ত্র সদস্য হাজী সেলিম বলেন, জ্বলছে দেশ-পুড়ছে মানুষ, কিন্তু সরকার নিবর। সময় এসেছে, জনগণও সরকারকে বলছে- একটা কিছু পদক্ষেপ নেয়ার জন্য। ঝিনাইদহ-২ আসনের স্বতন্ত্র সদস্য তাহ্জীব আলম সিদ্দিকী বলেন, পাকিস্তান হাইকমিশনের কর্মকর্তা মাযহার নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন বলে পত্রিকায় খবর এসেছে। কিন্তু এ ব্যাপারে সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া নেই। ধারণা করা হয়, তিনি পাকিস্তানের আইএসআইয়ের এজেন্ট। এরকম আরো কোনো মাযহার অন্যান্য দূতাবাসে বসে আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে তিনি গোয়েন্দাদের প্রতি আহ্বান জানান। এই ইস্যুতে পয়েন্ট অব অর্ডারে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- আওয়ামী লীগের মনিরুল ইসলাম ও তালুকদার মো. ইউনুস।