প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি জোটের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড প্রতিহত করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, পেট্রোল বোমা মেরে নিরীহ মানুষ পুড়িয়ে মারা ইসলাম-বিরোধী কাজ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ। কেবল জনরোষই এসব দলের অশুভ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করতে পারে। জনরোষেই প্রতিহত হবে বিএনপি-জামায়াত জোট। জঙ্গি ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে অর্থ যোগানদাতাদের চিহ্নিত এবং জঙ্গি অর্থায়ন বন্ধে ব্যাংকে লেনদেন কঠোরভাবে মনিটর করতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় পরিদর্শন ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রণালয়গুলোর কাজে গতিশীলতা আনতে তার প্রত্যেক মন্ত্রণালয় পরিদর্শন পরিকল্পনার অংশ হিসাবে গতকাল অর্থ মন্ত্রণালয়ে যান। শেখ হাসিনা বলেন, নিরপরাধ মানুষ ও দেশের অর্থনীতি লক্ষ্য করে বিএনপি-জামায়াতের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণ সজাগ রয়েছে। জনগণ এ নৈরাজ্য ইতিমধ্যে প্রতিরোধ করতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, সন্ত্রাসী ও জঙ্গি তত্পরতায় পৃষ্ঠপোষকরা দেশে ও দেশের বাইরে অর্থ স্থানান্তরে এখনো ব্যাংকগুলোকে ব্যবহার করছে। এজন্য ব্যাংকের লেনদেন নিবিড়ভাবে মনিটর করা উচিত এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন-কারীদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির প্রতি আমাদের অঙ্গীকার রয়েছে। কারণ আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। দেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর ও মর্যাদাশীল হিসাবে গড়ে তোলা আমাদের দায়িত্ব। আমরা এ কথা মনে রেখে দেশ পরিচালনা করি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় আমরা আগে থেকেই দক্ষ। মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগও মোকাবেলা করতে পারবো। তিনি বলেন, আমরা পারি সেটা আমরা প্রমাণ করেছি। শত প্রতিকূল অবস্থা মোকাবেলা করেই আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, এগিয়ে নিয়ে যাবো। আন্দোলনের নামে বিএনপি জোট সারাদেশে যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে জনরোষের মাধ্যমেই এ পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটবে। তিনি বলেন, জনগণ বিএনপি-জামায়াতের সংঘটিত হামলায় উদ্বিগ্ন। তারা রাজনীতির নামে হত্যা, পেট্রোল বোমা হামলা ও অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকরসহ সব ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। তারা ইসলামের নামে রাজনীতি করছে। কিন্তু তাদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড দেশকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা ইসলাম কখনো সমর্থন করে না। শেখ হাসিনা বলেন, দেশের জন্য বিএনপির কোন সহানুভূতি নেই। কারণ এদেশ সৃষ্টিতে দলটির কোনো আত্মত্যাগ নেই। অন্যের ত্যাগের বিনিময়ে তারা এদেশ পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি ও জামায়াত দেশের সম্পত্তি ধ্বংস করছে। নিরীহ মানুষকে হত্যা করছে। তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য হলো দেশকে ১৯৭১ সালের অবস্থানে ঠেলে দেয়া। সে সময়ে তারা গণহত্যা চালিয়েছিল এখন নিরীহ মানুষকে হত্যা করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সামরিক একনায়ক জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে বিএনপি গঠন করে। অপরদিকে জামায়াত ছিল দখলদার বাহিনীর দালাল ও দোসর। তারা দখলদার বাহিনীর লালসা মেটাতে আমাদের মা-বোনদের পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দেয় এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ী। এজন্য এ দলগুলোর দেশরক্ষা ও দেশের ভবিষ্যত্ বিনির্মাণের কোন দায়িত্ব নেই। বিএনপি-জামায়াত কেবল দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ-সম্পদ লুট করে দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে জানে। তিনি বলেন, যে দল দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে, যে দল সামরিক শক্তির অপব্যহারের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত, তাদের পক্ষেই সম্ভব এভাবে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা ও সাধারণ মানুষের ধন-সম্পদ ধ্বংস করা।
প্রধানমন্ত্রী শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, বাংলাদেশ সঠিক অবস্থানে থাকলে এই অঞ্চল অন্যান্য দেশের চেয়ে অনেক আগেই উন্নত হতো। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পরই এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালে ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে সামরিক সরকার দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করা শুরু করে। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর দেশের অর্থনীতি সঠিক অবস্থানে আসে। বাংলাদেশ এখন বিশ্ব সমপ্রদায়ের কাছে একটি উন্নয়ন মডেল। আওয়ামী লীগ সরকার বিগত দুটি মেয়াদে যুগান্তকারী অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করায় দেশের অগ্রগতি হয়। শেখ হাসিনা ফার্স্ট ট্রাক প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সমর্থন কামনা করে বলেন, এ সকল প্রকল্প বাস্তবায়নে তহবিল সংগ্রহে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তিনি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট সত্ত্বেও দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি স্বাভাবিক রাখায় সরকারি কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানান।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারের সফলতা তুলে ধরে বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরলস পরিশ্রমের ফসল। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি আগের যেকোন সময়ের চেয়ে অনেক ভাল। দেশের সকল সূচক দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। সরকার দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে অনেক ফার্স্ট ট্রাক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের প্রজ্ঞা ও দক্ষতা এবং তার নিরলস কাজ করে যাওয়ার ক্ষমতারও ভূয়সী প্রশংসা করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, সকলের নিরলস শ্রমেই বিএনপি-জামায়াতের রেখে যাওয়া অনেকটা বিপর্যস্ত অর্থনীতি থেকে উত্তরণ সম্ভব হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে আজ ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান কমেছে। উন্নয়নের ফসল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। তিনি বলেন, ২০০৯ সালে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে তার সরকার ৬ষ্ঠ পঞ্চ-বার্ষিক পরিকল্পনা নেয়, যা দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। তিনি বলেন, খাদ্য মজুদ আধুনিকতর করতে তার সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে দুই-তিন বছর পর্যন্ত খাদ্য মজুদ করা সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আর পরমুখাপেক্ষী হয়ে থাকবো না। ভিক্ষুকের জাতি হয়ে থাকবো না।
শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর দল আওয়ামী লীগ সরকারের বাইরে থাকলেও দেশের উন্নয়ন অগ্রগতি নিয়ে ভাবে। বিরোধী দলে থেকেও দলের অর্থবিষয়ক উপ-কমিটি সক্রিয় থেকে দল সরকারে গেলে কিভাবে উন্নয়ন করবে তারই পরিকল্পনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান অর্থমন্ত্রী তখন ওই কমিটির প্রধান হিসাবে আওয়ামী লীগকে উন্নয়নের পথে প্রস্তুত করেছিলেন। অথচ বর্তমানে বিএনপি ক্ষমতার বাইরে থেকে অর্থনীতির ওপরই আঘাত হানছে।
অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত স্বাগত বক্তব্য রাখেন। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান, মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ ও এর অধীনস্থ বিভিন্ন বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ উপস্থিত ছিলেন।