বাবার পোড়া মুখ দেখে কষ্ট পাচ্ছে নদী!

একমাস ধরে এনজিও’র ঋণের টাকায় চলছিল মুশরইলের ট্রাক চালক ফারুক হোসেনের (৪২) সংসার। পেট্রোল বোমায় পুড়ে তিনি এখন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন। বাবার বিভত্স পোড়া মুখ দেখে ভয়ে পালাচ্ছে তার পাঁচ বছরের মেয়ে নদী!

অন্যদিকে, মেয়ের কলেজে ভর্তির টাকার জন্য মালিকের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ট্রাক নিয়ে বের হয়েছিলেন চালক সাইদুল (৪০)। কিন্তু অবরোধের পেট্রোল বোমায় রাজশাহী শহরের আলীগঞ্জের সাইদুলের শরীরের ২৮ ভাগ পুড়ে গেছে। এসময় দগ্ধ হন সাইদুলের সহকারী শহিদুল ইসলাম বিশুও (৩৮)।
সাইদুলের স্ত্রী লাল বানু জানান, ‘একসপ্তাহ আগে কোর্ট কলেজে ভর্তির ফরম জমা দিয়েছে মেয়ে সাথী। ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভর্তির জন্য তার দেড় হাজার টাকা দরকার। প্রায় এক মাস গাড়ি বন্ধ থাকায় সংসারেও টানাপোড়েন চলছিল। হরতাল-অবরোধে গাড়ি বের করতে রাজি ছিলেন না ট্রাকের মালিক। শহরের ভেতরে বালুর ‘খ্যাপ’ দিতে মালিককে রাজি করানো হয়। ২ ফেব্রুয়ারি রাতে ট্রাক নিয়ে বের হয়ে নবগঙ্গা থেকে নওদাপাড়ায় যাবার সময় মোল্লাপাড়ায় কয়েক যুবক ট্রাকে পেট্রোল বোমা মারে। মুহূর্তে সামনের কাঁচ ভেঙ্গে চালকের আসনের জায়গাজুড়ে আগুন ধরে যায়। ট্রাক থামিয়ে নামার আগেই আগুনে ঝলসে যান চালক সাইদুল ও সহকারী বিশু। বাবার পোড়া মুখ সহ্য করতে পারছে না মেয়ে সাথী। অপরাধবোধে ভুগছে। তার ভর্তির টাকার জন্যই বাবার এই অবস্থা ভেবে কষ্টে সেও অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তিন ছেলে-মেয়ের মধ্যে বড় সাথী।  মেজ ছেলে রাসেল সার্ভে ইন্সস্টিটিউটে পড়ে। ছোট ছেলে পড়ে তৃতীয় শ্রেণিতে। একমাত্র উপার্জনক্ষম সাইদুলের এ অবস্থায় তারা অথৈ সাগরে পড়েছেন।
সাইদুলের সহকারী বিশু’র বাড়ি পবার মুন্নাডাইং গ্রামে। তার মুখসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়েছে। দেখে বোঝার উপায় নেই তিনি জীবিত, না মৃত। স্ত্রী মঞ্জুরা বেগম জানান, ‘সমপ্রতি ঋণ করে তারা ঘর তুলেছেন। সপ্তাহে ৭০০ টাকা কিস্তি টানতে হয়। অবরোধ শুরুর পর কোনো কিস্তি দিতে পারেননি। দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে তিনি কোথায় দাঁড়াবেন?’

ভয় পাচ্ছে ফারুকের কন্যা: একই রাতে নগরীর বড়বনগ্রামে অবরোধের পেট্রোল বোমায় দগ্ধ অপর ট্রাক চালক ফারুক হোসেনের মুখ, দুই হাত ও শ্বাসনালীর ক্ষতি হয়েছে। ফারুক জানান, ‘দীর্ঘদিন ট্রাকের হেলপারি করি। মাঝে বেকার ছিলাম। এক মাস আগেই নতুন ট্রাকে উঠি। সকালে পার্শ্বের খানকার মোড়ের গ্যারেজে ট্রাক মেরামত করতে দেন। বাসা কাছে থাকায় মেরামত শেষে একাই ট্রাক নিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। এ সময় অবরোধকারিরা তার ট্রাক লক্ষ্য করে চারটি পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে মারে। গাড়ির সামনের অংশে সেগুলো ফেটে আগুন ধরে যায়। ওই সময় তিনি দগ্ধ হন। ফারুকের স্ত্রী রানী জানান, বড় মেয়ে শান্তনা (১২) শুধুই কাঁদছে। ছোট মেয়ে নদী (৫) বাবাকে চিনতেই পারছে না। তার পোড়া বিভত্স মুখ দেখে ভয় পাচ্ছে। বাবার কাছ থেকে দূরে দূরে থাকছে। বাবা হয়ে ফারুক কিভাবে সহ্য করবে এই কষ্ট!