শিশুদের কলতানে যেন মেলার ঘুম ভাঙলো

বইমেলা যেন ফাল্গুনের আগমনী প্রস্তুতির মতো। প্রকৃতিতে বসন্তের আমেজ এসে গেছে এরই মধ্যে। মাঘের শেষ সপ্তাহের প্রথম শুক্রবার ছিল গতকাল। বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ এবার অমর একুশে গ্রন্থমেলার প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহের শুক্র ও শনিবার দুপুর ২টা পর্যন্ত সময়কে ঘোষণা করেছে শিশুপ্রহর হিসেবে। গতকাল ছিল তেমনি একটি দিন। মেলায় আগত প্রতিটি শিশুই যেন নতুন বসন্তের কথাই ভাবছে। সকাল ১১টায় একাডেমির প্রধান দুয়ার খুলতেই অপেক্ষমাণ ছোট দলটি প্রবেশ করে মেলায়। যেন ঘুমন্তপুরীর ঘুম ভাঙ্গলো শিশুর কলতানে। নানা বর্ণের রঙিন পোশাকে অভিভাবকের হাত ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল তারা। চলমান পরিস্থিতিতে শুক্রবারেও কোন কোন স্কুল খোলা থাকায় ইউনিফর্ম পরে এসেছিল কিছু শিশু। বইয়ের দেশে শিশুদের ঘোড়ে বেড়াতে দেখা গেছে আপন ছন্দে। পছন্দের বই খুঁজে পাবার অনিঃশেষ উত্সাহ ছিল প্রত্যেকের চোখেমুখে। বাবা-মায়ের হাত ধরে শিশু ঘুরে বেড়াচ্ছে একটি স্টল থেকে অপরটিতে। বইমেলার এই শিশু চত্বরটির নাম দেয়া হয়েছে ‘সোমেন চন্দ চত্বর’। নজরুল মঞ্চ ঘেঁষা চত্বরটি বিকাল হতেই আরও জমে উঠে। পুত্রের জন্য শিশুসাহিত্যের বই কিনতে এসেছিলেন পুরান ঢাকার আমিনুল। তিনি একা এসেছেন। ‘একা এলেন কেন’ জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেশের হরতাল-অবরোধের কারণে পরিবারসহ আসার ভরসা পাইনি। বাচ্চারা খুব চাইছিল আসতে। তবে মেলায় জনসমাগম দেখে ঠিক করেছি আগামী সপ্তাহে সবাইকে নিয়ে আসব। প্রকাশনা সংস্থা পাতাবাহারের বিক্রয় প্রতিনিধি কাজী মারুফ জানালেন, মেলার গত সব কটি দিনের চাইতে আজকে উপস্থিতিও বেশি, বিক্রিও বেশি। স্ত্রী ও শিশু পুত্র-কন্যা নিয়ে মেলা প্রাঙ্গণে এসেছিলেন মোহাম্মদপুরের কাজী আনিসুর রহমান। ‘আসা অবধি বাচ্চাদের পিছু পিছু স্টল থেকে স্টলে ছুটছি। জীবজন্তুর ছবি আছে এমন বইয়ের প্রতি তাদের ঝোঁক বেশি। এখানে বেশির ভাগ বই-ই রঙিন ও আকর্ষণীয়। কিছু বই আছে শুধু ফিগারটা দেয়া আছে। বাচ্চারা সেটা দেখে খেয়াল খুশিমতো রঙপেন্সিলে আঁকে। এমন বেশ কয়েকটি বই কিনে দিতে হয়েছে তাদের। তাদের আনন্দ দেখে আমার নিজেরই ভাল লাগছে। হয়তো তাদের কারণেই আবার আসতে হবে।’ গত বছরের মেলায় নিয়ম লঙ্ঘন করে কিছু প্রকাশনী ডোরেমন বা অন্যান্য বিদেশি বই বিক্রি করলেও এবারের মেলায় তা দেখা যায়নি। বিষয়টি এবারের মেলার একটি সাফল্য হিসেবে দেখছেন অনেকেই। শিশুদের মেধা-মনন বিকেশে কাজ করে যাওয়া জাতীয় প্রতিষ্ঠান ‘শিশু একাডেমি’র স্টলেও শিশুদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। স্টলের সজ্জা ও বিস্তৃতি এবার সংশ্লিষ্টদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশের জহিরুল আবেদিন জুয়েল জানান, শিশুপ্রহর মেলার আলাদা কোন অঙ্গ নয়। মেলার পুরো আয়োজনের একটি অংশ শিশুপ্রহর। কিন্তু কোথায় আয়োজন হচ্ছে এই শিশুপ্রহর! বাংলা একাডেমি চত্বরে অবস্থিত শুধু শিশুসাহিত্য করে এমন প্রকাশকদের স্টলের জন্য শিশুপ্রহর। সবাই বিভ্রান্ত হচ্ছে এমন ঘোষণায়। একাডেমি প্রান্তরের বাইরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্টল খুলেছেন এমন অনেক প্রকাশকেরই গুরুত্বপূর্ণ শিশুসাহিত্য প্রকাশনা আছে। বিভ্রান্তিমূলক ঘোষণার কারণে অনেক শিশু ও অভিভাবকরা কেবল বর্ধমান হাউজের প্রাঙ্গণ ঘুরে চলে যাচ্ছেন। আমাদের শিশুসাহিত্য প্রকাশনা অবিক্রিত থেকে যাচ্ছে।

একাডেমি প্রাঙ্গণে দেখা হয়ে গেল সাহিত্যিক ও স্থপতি শাকুর মজিদের সঙ্গে। সঙ্গত কারণেই তার কাছে মেলা বিভক্তির বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখানে নতুন কেউ এলে বুঝতেই পারবে না যে একটি মেলা হচ্ছে। একই ফাংশনের দুটো স্পেস ভাগ করার প্রয়োজন হলে একটি কানেকটিভিটি জোন তৈরি করতে হয়। এটাকে বলে বাফার জোন। একটি বাফার জোন তৈরি করা হলে মেলায় অর্থবোধক সাদৃশ্য তৈরি হতো। বইমেলার আয়োজক কমিটি যে কোন একজন পরিকল্পনাবিদ বা স্থপতির কাছে মেলার স্থানসজ্জার ব্যাপারে মতামত নিতে পারত। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি গতবছরের মতো এ বছরও এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এভাবে দ্বিখণ্ডিত মেলা বইমেলার চেতনারপরিপন্থী।’
গতকাল ছুটির দিন হওয়ায় বেলা গড়াতেই মেলায় জনসমাগম বাড়তে থাকে। বিকেলের দিকে বর্ধমান হাউজে প্রবেশের জন্য দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ে। নতুন বইয়ের ভুবনে প্রবেশের জন্য ক্রেতা-পাঠকের এই সুশৃঙ্খল সারি টিএসসি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। টিএসসি থেকে মেলার প্রবেশ মুখেই এবার একাডেমি কর্তৃপক্ষ আগত পাঠকদের জন্য শুভেচ্ছার স্মারক হিসেবে বিশাল তোরণ স্থাপন করেছে। তোরণের দিকে তাকালেই চোখে পড়ে বাংলা ভাষা ও এই ভাষারাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার জন্য যাঁরা ছিলেন নিবেদিত সংগ্রামী মানুষদের মুখ। ভাষা আন্দোলনের শহীদ সালাম-বরকত-জব্বার-শফিউর, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বঙ্গবন্ধু, মানিক মিয়া, জহির রায়হান, জি.সি. দেব, জয়নুল আবেদিন, মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, কাইয়ুম চৌধুরীসহ অনেকের ছবির সমন্বয়ে নির্মিত কোলাজ। বিষয়টির জন্য একাডেমি কর্তৃপক্ষ ধন্যবাদ পাবে। এই মহত্ ব্যক্তিদের কথা মনে রেখেই সবাই প্রবেশ করুক বাংলা বইয়ের সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী এই একুশে বইমেলায়।
গতকয়েক বছর ধরে মেলার প্রবেশমুখে স্থান করে নেওয়া বারোয়ারি পণ্যের মেলা এবার মেলায় নেই। এবার মেলার প্রবেশপথ অনেক নিরাপদ ও উপদ্রবহীন।
বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশের বিস্তৃত পরিসর এবার পাঠকমনে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তরের ছাত্র সায়েম খান বললেন, এখানে এসে ভাল লাগছে। এবার নিরাপত্তার দিক থেকেও একটু কড়াকড়ি। একটা স্বস্তি কাজ করছে। প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে সুউচ্চ স্বাধীনতা টাওয়ার। চারপাশে বইয়ের সারি সারি স্টলে প্রবেশের সময় মনে হয় যেন মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশেই প্রবেশ করছি। এবারের পরিপাটি মেলায় দেখে শুনে বই কিনতে পারব বলে মনে হচ্ছে।’
আজ শনিবার বেলা ৩টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত বইমেলা পাঠকদের জন্য খোলা থাকবে।
মেলার নতুন বই
তাম্রলিপি থেকে আনিসুল হকের ‘আকাশের ঠিকানায়’, পলাশ মাহবুবের ‘প্যান্ট ও পাজামার গল্প’, রোদেলা থেকে আল মাহমুদের ‘নির্বাচিত কিশোর সাহিত্য’, চারুলিপি থেকে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘অ্যারিস্টটলের কাব্যতত্ত্ব’। মোহিত কামালের মনস্তাত্ত্বিক কিশোর উপন্যাস জাদুর বাকসে সোনার মোহর প্রকাশ করেছে অনিন্দ্য প্রকাশ।
মেলায় বিশিষ্ট জন
গতকাল মেলায় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওয়ায়দুল কাদের ছাত্র-জনতার উপস্থিতিতে কয়েকটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন। এসেছিলেন রাজনীতিক দীপু মনি ও কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। আনিসুল হক তার বইয়ের প্রকাশকের স্টলে বসে বিক্রিত বইয়ের অটোগ্রাফ দেন উত্সুক ক্রেতা-পাঠকদের।
গতকাল মেলা মঞ্চে
মেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় রজনীকান্ত সেন : বাঙালির অন্তরের গীত রচয়িতা শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক নূরুল আনোয়ার। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন অধ্যাপক আজিজুর রহমান এবং অধ্যাপক শিখা আরেফীন। সভাপতিত্ব করেন জামিল চৌধুরী। প্রাবন্ধিক বলেন, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের আগে পরে রবীন্দ্র সমসাময়িক ‘কান্তকবি’ রজনীকান্ত সেন (১৮৬৫-১৯১০) সারা বাংলাদেশের সংগীতপিপাসু মানুষের অন্তর স্পর্শ করেছিলেন তার রচিত অকৃত্রিম সরল শান্তরসের ভক্তিমূলক এবং দেশপ্রেমের গান দিয়ে। রজনীকান্ত তার সুগভীর রসবোধ থেকে এই সুন্দর সংগীত সৃষ্টি করেছেন, যা আজ ‘কান্তগীতি’ বলে পরিচিত। সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক জামিল চৌধুরী বলেন, রজনীকান্ত সেন ছিলেন বাঙালির স্বর্ণযুগের স্বর্ণসন্তান। তিনি শুধু সংগীত জগতেই বিচরণ করেননি তার চিন্তার সুক্ষ্মতাও এক স্মরণীয় বিষয় কারণ তিনি বলেছেন অর্থের কাছে পরমার্থ যখন গৌন হয়ে পড়ে তখন সত্যিই দুর্যোগের সময় ঘনিয়ে আসে। তিনি বলেন, রজনীকান্তের গান বাংলাদেশে প্রসারে ছায়ানট, আনন্দধ্বনি এবং প্রয়াত ওয়াহিদুল হকের অবদান কখনো ভুবলবার নয়। 
সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অনীক বোসের পরিচালনায় নৃত্য সংগঠন ‘স্পন্দন’-এর শিল্পীরা নৃত্য পরিবেশন করেন। সংগীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী শাহীন সামাদ, ফেরদৌস আরা, সালাহউদ্দীন আহমদ, সুজিত মোস্তফা, এ. কে. এম. শহীদ কবীর পলাশ, মো. মফিজুর রহমান, ফারহানা ফেরদৌসী তানিয়া এবং প্রিয়াংকা গোপ।
আজকের অনুষ্ঠান

আজ শনিবার বিকেল ৪-০০টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক জন্মশতবর্ষ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন ড. আকবর আলি খান, ড. মীজানুর রহমান শেলী এবং অধ্যাপক মেসবাহ কামাল। সভাপতিত্ব করবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।