ঘাতক পেট্রোল বোমা কেড়ে নিয়েছে আরো দুটি প্রাণ। এর মধ্যে বগুড়ায় শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে সবজিবাহী ট্রাকে বোমা হামলায় দগ্ধ হেলপার হাসিব উদ্দিন (২৩) গভীর রাতে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছেন। এ ঘটনায় গুরুতর দগ্ধ হয়েছেন আরো তিন জন। এছাড়া শুক্রবার রাতে গাইবান্ধায় বাসে বোমা হামলার ঘটনায় দগ্ধ আবুল কালাম (৪০) নামে আরও এক যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে রবিবার বিকালে তার মৃত্যু হয়। এ নিয়ে এ ঘটনায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো ৮ জনে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে বগুড়া প্রতিনিধি জানান, নাটোর থেকে সবজি নিয়ে জেলার শাজাহানপুর উপজেলার প্রবেশমুখ রুপিহারে পৌঁছার পর পরই দুর্বৃত্তরা ট্রাকটিতে (পটুয়াখালী-ট-১১-০০০৬) পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে। এতে ট্রাকে আগুন ধরে গেলে হেলপার হাসিব, চালক গোলাম মোস্তফা (৩৫), সবজি ব্যবসায়ী আব্দুল আজিজ (৪৫) ও জাহাঙ্গীর হোসেন (৩৫) দগ্ধ হন। স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এসে আগুন নেভায়। পরে পুলিশ অগ্নিদগ্ধদের উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে।
হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের রেজিস্ট্রার ডা. শহিদুল্লাহ দেওয়ান জানান, দগ্ধ ৪ জনের মধ্যে হাসিবের শরীরের শতভাগ পুড়ে গিয়েছিল। রাত ২টা ৫ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। এছাড়া মোস্তফার শরীরের ২০ শতাংশ এবং আজিজ ও জাহাঙ্গীরের শরীরের ১৫ শতাংশেরও বেশি পুড়ে গেছে। তারা কেউই শঙ্কামুক্ত নন।
কাজীপুর (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, নিহত হাসিব উপজেলার পাঁচগাছি গ্রামের আব্দুস সাত্তারের ছেলে। ইসরাফিল নামে তার তিন মাসের একটি শিশু সন্তান রয়েছে। তিন ভাইয়ের মধ্যে হাসিব ছিলেন মেজ। জীবিকার তাগিদে ট্রাক নিয়ে বের হয়েছিলেন রাতে। বাড়ি ফিরলেন লাশ হয়ে। গতকাল রবিবার দুপুরে লাশবাহী গাড়ির শব্দে পুরো গ্রামের মানুষ জড়ো হয় হাসিবের বাড়িতে। এ সময় তার মা আর স্ত্রীর আর্তনাদে পুরো এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। লাশ এতটাই পুড়ে গিয়েছিল যে চেনা যাচ্ছিল না। কাজীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শফিউল ইসলাম এ সময় হাসিবের বাবা ও বড় ভাইকে সমবেদনা জানান এবং দাফনের জন্য কুড়ি হাজার টাকা প্রদান করেন। এছাড়া উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম বেলাল ব্যক্তিগতভাবে দশ হাজার টাকা সহায়তা প্রদান করেন। বিকালে হাসিবের জানাজায় সর্বস্তরের মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, সদর উপজেলার তুলশীঘাটে ঢাকাগামী নাপু পরিবহনের বাসে পেট্রোল বোমা হামলার ঘটনায় গতকাল নিহত আবুল কালাম সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সীচা চন্ডিপুর পাঠানেরপাড়া গ্রামের আব্দুল গফুরের ছেলে। তিনি কাজের খোঁজে ঢাকা যাচ্ছিলেন। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান সহকারী অধ্যাপক ডা. মারুফুল ইসলাম মৃত্যুর সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, এ ঘটনায় দগ্ধ ২২ জন রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। এর মধ্যে গত দুই দিনে কালামসহ চারজন চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা গেলেন।
গতকাল বিকালে নিহত কালামের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সাথে দেখা করে সমবেদনা জানান জাতীয় সংসদের হুইপ মাহবুব আরা গিনি এমপি। পরে তার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে শোকাহত পরিবারটিকে ৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
প্রসঙ্গত, শুক্রবার রাতে ওই পেট্রোল বোমা হামলায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই ৪ বাসযাত্রীর মৃত্যু হয়। আহত হন এক বিজিবি সদস্যসহ ৪০ যাত্রী। যাদের বেশির ভাগই দিনমজুর ও রিক্সাচালক। যারা কাজের সন্ধানে ঢাকা যাচ্ছিলেন। আহতদের মধ্যে হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় গত শনিবার সুজন (১০) নামের এক শিশু, তার মা সোনাভান (২৫) ও সাজু মিয়ার (২২) মৃত্যু হয়।
এদিকে বিএনপি-জামায়াত জোটের চলমান অবরোধে জেলায় পেট্রোল বোমা হামলায় শিশুসহ ৮ জন নিহতের ঘটনায় সর্বস্তরের মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল রবিবার জেলা ১৪ দল, আইনজীবীদের সংগঠন, চেম্বার অব কমার্সসহ বিভিন্ন সংগঠন পৃথক মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ করে। শহরের ১নং ট্রাফিক মোড়ে ১৪ দলের প্রতিবাদ সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও সংসদ সদস্য ফজলে রাব্বী মিয়া।