প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি-জামায়াত জোটের সঙ্গে সংলাপের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, খুনিদের সঙ্গে কিসের সংলাপ? সরকার কেন খুনিদের সঙ্গে বসবে? খুনি, নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী ও পেট্রোল বোমা হামলার প্ররোচনাকারীদের সঙ্গে কোন সংলাপ হতে পারে না। তিনি বলেন, বিএনপি জোট আন্দোলনের নামে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করছে। এটা রাজনীতি নয়, সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জঙ্গিবাদীদের যেভাবে শাস্তি ও বিচার হয় সেভাবেই প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আইনে এই সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের হোতাদের বিচার হবে। এই সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে জড়িত বোমাবাজ এবং এর নির্দেশদাতা, অর্থের যোগানদার ও পরিকল্পনাকারী কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। আমরা যেকোন মূল্যে সন্ত্রাসবাদ দমন করবো। এ জন্য যতদূর যেতে হয় যাব।
গতকাল বুধবার সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট পরিদর্শন শেষে নাগরিক সমাজের পক্ষে সংলাপে বসার আহ্বান প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, সংলাপ কার সঙ্গে? খুনিদের সঙ্গে? আগুনে যে পুড়িয়ে মারে তার সাথে? যার মাঝে এতোটুকু মনুষ্যত্ববোধ নেই, দয়া-মায়া নেই, তার সাথে? হরতাল-অবরোধের নামে এভাবে পুড়িয়ে মানুষ মারার কঠোর সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, মানুষকে বাঁচার সুযোগ না দিয়ে হত্যা করা-এটা কোনো রাজনীতি না। এটা একেবারে জঙ্গিবাদী কাজ, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। চোরাগোপ্তা হামলা রাজনীতি না, এটা সন্ত্রাস। সরাসরি গাড়িতে পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে মারা, মানুষকে বাঁচার সুযোগ না দিয়ে, এভাবে সরাসরি হত্যা করা কোন ধরনের রাজনীতি? তিনি বলেন, সন্ত্রাস যেভাবে দমন করতে হয়, আমরা সেভাবে করে চলেছি।
বিএনপি-জামায়াত জোটের ডাকা অবরোধ-হরতাল চলাকালে পেট্রোল বোমা হামলাসহ সহিংসতায় দগ্ধ হয়ে হাসপাতালের ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে নারী-শিশুসহ বর্তমানে ৫৫ জন চিকিত্সাধীন রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী একে একে চিকিত্সাধীন দগ্ধদের অবস্থা প্রত্যক্ষ করেন। এ সময় তিনি তাদের কথা শোনেন এবং অনেকের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেন। তাদের চিকিত্সারও খোঁজ-খবর নেন। প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরে দগ্ধ ও তাদের স্বজনরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। রোগীদের কান্না, আর্তনাদ ও আহাজারিতে বার্ন ইউনিটের পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী নিজেও কেঁদে ফেলেন। বিশেষ করে ব্রাহ্মণ বাড়িয়ায় বোমা হামলায় দগ্ধ আড়াই বছরের শিশু জুঁইয়ের শয্যাপাশে গিয়ে তার অবস্থা দেখার পর প্রধানমন্ত্রীর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে। এক পর্যায়ে তাকে চশমা খুলে কয়েকবার চোখের পানি মুছতে দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রী এই বার্ন ইউনিটে চিকিত্সা গ্রহণকারী ও বর্তমানে চিকিত্সাধীন দগ্ধ ৬৩ জনের প্রত্যেককে ১০ লাখ টাকা করে মোট ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র প্রদান করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, বর্বর হত্যাকাণ্ড ও জ্বালাও-পোড়াও কোন রাজনীতি নয়। যারা এটাকে রাজনীতি বলছেন, তারা ভুল বলছেন। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা সংলাপের কথা বলছেন, তাদের উদ্দেশে বলতে চাই, আগে নাশকতা বন্ধের জন্য উদ্যোগ নিন। যারা সন্ত্রাস করছে, বোমা মেরে মানুষ হত্যায় লিপ্ত তারা তো জঙ্গিবাদী কাজ করছে। তাদের এসব কাজ থেকে বিরত রাখুন। বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগকে এক কাতারে না ফেলতে পরামর্শ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, একজন মানুষ খুন করবে। এই খুনির সাথে আমাদের এক করে ফেলার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, সংলাপের নামে কিছু লোকের একটা খেলা শুরু হয়েছে। তাদের একেকজন তো তত্ত্বাবধায়ক সরকারে উপদেষ্টা ছিলেন। তখন কী করেছেন? তারা তো ইলেকশন করতে পারেননি? তারা তো পদত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন।
খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মারা যাওয়ার পর সহানুভূতি জানাতে প্রধানমন্ত্রী গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে গেলে দরজা বন্ধ করে রাখা হয়। এ প্রসঙ্গ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমি তো সহানুভূতি জানাতে গিয়েছিলাম। গেট বন্ধ করে রাখল। আমাকে যেতে দেয়নি। আমাকে যেভাবে অপমান করেছে, এখন যারা সংলাপ-সংলাপ বলছে, তাদের যদি এভাবে অপমান করে, তারা দ্বিতীয়বার কী যাবেন?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নেত্রীকে তার খুনের মিশন বন্ধ করতে হবে। তাকে কেউ মানুষ মারার লাইসেন্স দেয়নি। যদি তাদের সংলাপে বসার সে ধরনের কোন আগ্রহ থাকে, তবে আগে হত্যা ও জ্বালাও-পোড়াও বন্ধ করতে হবে। কারণ জঙ্গিবাদের কোন স্থান বাংলাদেশে নেই। উনি জামায়াত-শিবিরকে নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষকে এভাবে পুড়িয়ে মারবে, বোমা মেরে মারবে- এটা কখনো আমরা সহ্য করবো না। এটা কেউ সহ্য করতে পারে না। তিনি বলেন, যারা সন্ত্রাসী ও জঙ্গি কর্মকাণ্ডে অর্থ জোগান দেয়, বোমা বানায়, বোমা মারে তারা সবাই দোষী। সবাইকে ধরতে হবে। জঙ্গিবাদ থাকবে না। এটা হলো বাস্তব কথা। শেখ হাসিনা বলেন, জনগণের প্রতি খালেদা জিয়ার কোন দয়া-মায়া নেই। তা না হলে তিনি এভাবে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে মানুষ মারতে পারতেন না। এ হচ্ছে বিকৃত মানসিকতা। ওই মহিলার মানসিক বিকৃতি ঘটে গেছে। নিশ্চয়ই উন্মাদ হয়ে গেছে।
রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ করতে তিনি খালেদা জিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বোমাবাজদের বিরুদ্ধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। যারা বোমা বানায়, বোমা মারে তাদের ধরিয়ে দিতে হবে। যে কোনোভাবেই হোক না কেন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধের আশ্বাস দেন তিনি।
শুক্রবার সকাল পর্যন্ত হরতাল বাড়ানোর কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই হরতাল শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ও এসএসসি পরীক্ষায় মারাত্মক বিঘ্নের সৃষ্টি করছে। যেদিন পরীক্ষা, সেদিন হরতাল দিয়ে পরীক্ষার পথ বন্ধ করা হচ্ছে। শুক্রবারও বাদ যাবে না। শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত হরতাল। এটা কী? এটা ফাজলামি নাকি? খেলা পেয়ে গেছে মানুষের জীবন নিয়ে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া তার গুলশান কার্যালয়ে একদিকে বিলাসী জীবন-যাপন করছেন, অন্যদিকে এসব নৈরাজ্যের প্ররোচনা দিচ্ছেন। নাশকতাকারীদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এজন্য এরইমধ্যে বেশ কয়েকজনকে পুরস্কার দেয়া হয়েছে।
বিএনপি-জামায়াত জোটের অপশক্তির বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের সংবাদ পরিবেশন না করতে গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এ ধরনের প্রচার-পরিবেশনা তাদের আরো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালাতে প্ররোচিত করছে। কেন জল্লাদের প্রচার করছেন? জল্লাদের প্রচার বন্ধ করেন, সব কমে যাবে। পেট্রোল বোমা হামলায় আহতদের সব ধরনের চিকিত্সা সেবা নিশ্চিত করতে কর্তব্যরত চিকিত্সকদের নির্দেশ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সরকার তাদের চিকিত্সার জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছু করবে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নানা ক্ষেত্রে উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, গত ছয় বছরে বাংলাদেশের যে উন্নতি হয়েছে, আর কোন সরকারের সময় এই উন্নতি হয়েছে? কোথাও কোনো গাফিলতি নেই। তাহলে আমার কী দোষ? অথচ এটা তারা চোখে দেখেন না?
এ সময় অন্যান্যের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের উপদেষ্টা ডা. সামন্ত লাল সেনসহ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।