‘ফিয়ার ফ্যাক্টর’ থমকে দিল অর্থনীতির গতি

অনেক বাধা-বিঘ্ন ঠেলেও যতটা এগুচ্ছিল অর্থনীতি, তা আর ধরে রাখা যাচ্ছে না। এত বেশি দিন ধরে চলা সহিংস কর্মসূচি নাভি:শ্বাস দশায় ফেলে দিয়েছে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের। অবস্থা এতটাই অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আন্দোলন ঠেকাতে তারাও আন্দোলনের পাল্টা হুমকি দিচ্ছেন। তাদের এই আন্দোলনের দাবি একটাই, অর্থনীতিকে যে কোনো মূল্যে সহিংসতার বাইরে রাখতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনীতিতে এখন ‘ফিয়ার ফ্যাক্টর’ কাজ করছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তাদের মনে অনিশ্চয়তা ভর করে, আতঙ্ক জেঁকে বসে। ফল হিসেবে তাদের বিনিয়োগ ইচ্ছা দমিয়ে দেয়। সরকারি খাতের উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নেও চলে ঢিলেঢালা ভাব। সহিংসতা যখন নিত্যব্যাপার, তখন পুঁজির প্রবাহ খুঁজতে চলে নিশ্চয়তা-নিরাপত্তা যেখানে ব্যক্তি নিরাপদ, বিনিয়োগ সুরক্ষিত, প্রত্যাশিত মুনাফাও নিশ্চিত। সঙ্গত কারণেই দেশের বর্তমান সহিংস পরিস্থিতি পুঁজির বহির্মুখিতা উস্কে দিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
বিয়াল্লিশ দিন পার হয়ে গেলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ নেই। এতদিনে বিরাট ক্ষতি হয়ে গেছে। বিদেশি সংস্থাগুলো এবার বলবে না বাংলাদেশের ‘মিরাক্যল’ প্রবৃদ্ধি অর্জনের কথা। টানা প্রায় অনেক বছর ছয় শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার যে কৃতিত্ব, সেখানে এবার ছেদ পড়ার ব্যাপক আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অবরোধ আর হরতালের ধাক্কায় প্রবৃদ্ধির গতি হবে নিম্নমুখী। বেড়ে যাবে বাজেট ঘাটতি। ইতিমধ্যে বেড়েছে মূল্যস্ফীতি। সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ক্রেতা পর্যায়ে বেড়েছে পণ্যের দাম।
ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক ঋণমান সূচকে বাংলাদেশ নিচে নেমে যেতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে শীর্ষস্থানীয় ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি মুডি’স। সংস্থাটির সূচকে বাংলাদেশ গত চার বছর ধরে ‘বিএ-৩’ রেটিং ধরে রেখেছিল। যা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বীকৃতি। কিন্তু এবারে প্রলম্বিত সহিংসতায় রফতানি বাণিজ্য দুর্বল হতে শুরু করেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র  ২ দশমিক ১ শতাংশ হারে। আগের বছরের একই সময়ে এই প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১৫ দশমিক ১ শতাংশ। 
প্রবৃদ্ধি:অর্থবছরের শুরুতে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭.৩ থাকলেও খোদ অর্থমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে এটি অর্জন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি ঘোষিত মুদ্রানীতিতে প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ থেকে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ হবে বলে আশা করা হয়। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) তাদের পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধির হার ৬.২ থেকে ৬.৪ হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে এ অর্জন নিয়েও সংশয় রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি:
জানুয়ারি মাস জুড়ে টানা হরতাল-অবরোধ কর্মসূচির কারণে চাল, ডাল, আটা, মাছ-মাংসসহ অন্যান্য খাদ্য পণ্যের দাম বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, জানুয়ারিতে খাদ্য পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৬ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ডিসেম্বরে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কমে আসাসহ পর্যাপ্ত উত্পাদনের ফলে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল থাকলেও চলমান হরতাল অবরোধে সেটি আবার ঊর্ধ্বমুখি হয়েছে।
ঋণ প্রবাহ:
চলতি (২০১৪-১৫) অর্থবছরের জানুয়ারির আগ পর্যন্ত যখন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমান অবস্থার থেকে তুলনামূলক ভাল ছিল তখন নভেম্বর ২০১৪ সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ১৪ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অনেক পিছিয়ে ছিল। সম্প্রতি ঘোষিত মুদ্রনীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে সাড়ে ১৫ শতাংশ করার লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়েছে। চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সংশয় রয়েছে।
রাজস্ব আদায়:
অবরোধ আরো প্রলম্বিত হলে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরসহ অন্যান্য স্থলবন্দর থেকে রাজস্ব আদায় কমেছে। এছাড়া ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহত্—সব ধরনের ব্যবসায়েই অবরোধের বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ফলে কমে যাবে ভ্যাট-ট্যাক্স আদায়। এ পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রায় বড় ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে।
চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) আদায় হয়েছে ৫৮ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। আর বাকি অর্ধে আদায় করতে হবে ৯০ হাজার ৩২২ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চলমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বাকি ছয় মাসে এ বিশাল পরিমাণ রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে না। ফলে সরকারের ব্যয় কমিয়ে আনতে হবে। নয়তো ব্যাংক ঋণ বাড়াতে হবে।
শেয়ারবাজারে লেনদেন খরা:
প্রতিবছর সাধারণত জানুয়ারি মাস থেকে পুঁজিবাজারে ভালো লেনদেনের প্রবণতা দেখা যায়। অনেক কোম্পানির হিসাব বছর শেষ হয় ডিসেম্বর মাসে। ফলে দুয়েক মাসের মধ্যেই এ কোম্পানিগুলো লভ্যাংশ ঘোষণা করে। আর লভ্যাংশের হারের সম্ভাবনার উপর ভিত্তি করে বিনিয়োগকারীরা এ কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ করতে থাকেন। তাই জানুয়ারি মাস থেকে পুঁজিবাজারে ভালো লেনদেনের প্রবণতা দেখা যায়। অথচ এ বছর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তা হচ্ছে না। জানুয়ারি থেকেই শুরু হয়েছে লেনদেনের পতন। এ মাসে লেনদেন তিনশ কোটি টাকায় নেমে আসে। আর ফেব্রুয়ারিতে ডিএসই’র লেনদেন দুইশ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার তোপে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা সতর্কভাবে বিনিয়োগ করছেন।
ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দাবি:

মূল্যস্ফীতি হ্রাসের সাথে সাথে ব্যংক ঋণের সুদ হারও কমে আসবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন আশাবাদ থাকলেও বিগত সময়ে তা হয়নি। গত তিন বছরে মূল্যস্ফীতির সাথে সাথে সুদ হার কমেনি। ২০১১ সালের পর থেকে মূল্যস্ফীতি গড়ে ৫ শতাংশের মত কমলেও ব্যাংক ঋণের সুদ হার কমেছে মাত্র ১ শতাংশ। বর্তমানে দেশে বিনিয়োগ করতে গড়ে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ সুদ গুনতে হচ্ছে। কোন কোন ক্ষেত্রে এ হার আরো বেশি। চলমান সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা তাদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকারি সহযোগিতা কামনা করেছেন। অবরোধ-হরতালকালে সুদ মওকুফ করে বা ঋণ শ্রেণীবিন্যাসের সময়সীমা বাড়ানোসহ প্রণোদনার মাধ্যমে অর্থনীতিকে সচল রাখতে সরকারের সহায়ক ভূমিকা দেখতে চান উদ্যোক্তারা।