সব ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলায় সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সাধারণ মানুষকেও প্রশিক্ষিত করে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। যে কোনো ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলায় জনগণ যেন সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকতে পারে, সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে ‘প্রশিক্ষিত বাংলাদেশ’ গড়তে নানামুখী কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচিকে সামনে রেখেই মার্চে ‘জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস’ উদযাপন করতে যাচ্ছে একবছর পেরিয়ে দ্বিতীয় বছরে পদার্পণ করা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। উল্লেখ্য, ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন-২০১২’র মাধ্যমে প্রাক্তন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যুরো এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন অধিদপ্তরকে একীভূত করে ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর’ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম জোরদার করতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন মাঠ পর্যায়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে, দ্রুত নগরায়ণের ফলে বেড়ে যাওয়া জলাবদ্ধতা, অগ্নিকাণ্ড, ভবন ধস, কারখানায় অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা ও নৌ-দুর্ঘটনার মতো মানবসৃষ্ট দুর্যোগ কমিয়ে আনতে হলে ওই আইনের তফসিলের আওতায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রচারণা কার্যক্রম গতিশীল করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তাদের মতে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের জন্য দেশে কোনো প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নেই। জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানামুখী গবেষণা ও মাঠপর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসহ সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। পাশাপাশি বিদ্যমান ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) স্বেচ্ছাসেবক ও সিডিএমপি’র সহায়তায় গড়ে তোলা নগর স্বেচ্ছাসেবকদের সম্মিলন ঘটিয়ে জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক দল গঠনের ওপরও জোর দেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াজেদ জানান, বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ নিরূপণ ও দুর্যোগকালীন সময়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের লক্ষ্যে দুর্যোগ এলাকার মানচিত্র প্রস্তুত করা এবং দুর্যোগের ফলে ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে দুটি শক্তিশালী সেল গঠনের কথা ভাবছে অধিদপ্তর। তবে এজন্য বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তার সংস্থান থাকতে হবে। তিনি জানান, দুর্যোগ মোকাবেলায় সক্ষম প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্যে গত এক বছরে অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মকর্তাদের নিয়োগ-পদোন্নতিসহ বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। অনিয়ম রোধে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ে এমএলএসএস পদে ৪৮৪জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ততথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদী দর্শন হচ্ছে- প্রাকৃতিক, পরিবেশগত ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দেশের মানুষকে, বিশেষ করে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর দুর্যোগের মাত্রা মানব সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা। পাশাপাশি যে কোনো বড় দুর্যোগ মোকাবেলায় সক্ষম একটি দক্ষ জরুরি ‘সাড়াদান ব্যবস্থা’ গড়ে তোলাও দীর্ঘমেয়াদী দর্শনের অংশ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর মূলত এই দুটি দর্শনকে সামনে রেখেই কর্মপন্থা নির্ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে। কর্মপন্থার অংশ হিসেবে গত এক বছরে আইনি কাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, প্রশিক্ষণ ও এর সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো, নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগে উদ্ধারসহ অনুসন্ধান তত্পরতা বৃদ্ধি, অবকাঠামো নির্মাণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
একবছরের অর্জন সম্পর্কে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানান, মাঠ পর্যায়ে ঝুঁকি নিরূপণ এবং এর ওপর ভিত্তি করে কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুতের একটি গাইডলাইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এর ফলে কমিউনিটি পর্যায়ে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন এখন আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়ে গেছে। অধিদপ্তরের করা প্রশিক্ষণ হ্যান্ডবুক ও সহায়িকা সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। দুর্যোগ বিষয়ক সকল কমিটিতে নারীদের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি জানান, অধিদপ্তরের নতুন অর্গানোগ্রাম তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। এর সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পানিসম্পদ, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং আইসিটি বিশেষজ্ঞদের যুক্ত রাখা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, দুর্যোগে ক্ষয়-ক্ষতির মাত্রা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম এরইমধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনও গত বছরের এপ্রিলে এক বাণীতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের কার্যক্রমের প্রশংসা করেন।