রাজনৈতিক বৈরি পরিস্থিতি ও হরতাল-অবরোধের মধ্যেই মেহেরপুরের গাংনী থেকে এসেছেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক রফিকুর রশীদ। একাডেমি প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে এই প্রতিবেদকের কথা হচ্ছিল তার সঙ্গে। ‘কিভাবে যে এসেছি মনে করতে চাই না। অবিরাম ভয় ও আশঙ্কা নিয়ে ঢাকা এসেছি শুধু এই বইমেলায় আসার জন্যই’। একই কথা বলছিলেন নাট্যকার শাহজাহান চৌধুরী। অ্যাম্বুলেন্সে করে তিনি ঢাকায় এসেছেন কুমিল্লা থেকে। জানালেন, ‘মেলায় না এসে পারি না। বইমেলা আমাদের ডাকে। এই ডাক অগ্রাহ্য করতে পারি না।’ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ‘ইত্যাদি’ গ্রন্থপ্রকাশের সামনে দেখা চট্টগ্রাম থেকে আগত খ্যাতনামা লেখক শাহনেওয়াজ বিপ্লবের সঙ্গে। ‘আমি অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা থাকি। মেলায় ইত্যাদি থেকে আমার একটি গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। বইমেলার জন্যই দেশে আসা। তিনি বলেন, মেলায় দাঁড়িয়ে লেখক-প্রকাশক বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাবো না-এটা ভাবতেই পারি না। গতকাল রাতের ট্রেনে চট্টগ্রাম থেকে এসেছি। আরো আগে আসার কথা থাকলেও পেট্রোল বোমার ভয়ে বাসে-ট্রেনে উঠতে সাহস হয়নি। এবার ঝুঁকি নিয়েই চলে এসেছি।’
ঢাকার বাইরে থেকে যারা এতদিন বইমেলায় আসার অপেক্ষায় ছিলেন, কিন্তু রাজনৈতিক বৈরি পরিস্থিতির কারণে আসতে পারছিলেন না, সকল বাধা অগ্রাহ্য করে তারা ছুটে আসছেন মেলায়। তাদের দৃপ্ত পদচারণায় মেলায় নব-প্রাণ সঞ্চারিত হচ্ছে, এভাবে একুশে গ্রন্থমেলা একটা ক্রমেই একটা জাতীয় চরিত্রের রূপ পাচ্ছে। প্রশস্ত মেলা প্রাঙ্গণের এদিক-সেদিক লেখকদের আড্ডায় মেতে উঠতে দেখা গেছে। আয়োজক কর্তৃপক্ষও ক্লান্ত দর্শনার্থী ও আড্ডাবাজদের কথা মনে রেখে মেলার উভয় অঙ্গনে বসার জন্য বাঁশের অস্থায়ী বেঞ্চ ছাড়াও ছাউনীসহ বেশ কয়েকটি লেখক কর্নার তৈরি করেছে আগেই। আগত ক্রেতা-দর্শনার্থীর অনেককেই সেখানে বসে পরিবার বা বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে থাকতে দেখা গেছে গতকালও।
বিকেলে সোহরাওয়ার্দী মেলা প্রাঙ্গণে আগতদের লাইন দিয়ে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। মেলা ভিড় তেমন ছিল না। অনন্যা প্রকাশনীর কর্ণধার মনিরুল ইসলামের কাছে এ নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একই সময়ে বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলা চলছে বলে আজকে মেলার ভিড় একটু কম। গতকাল এই সময়ে অনেক ভিড় ছিল। বিক্রিও তুলনামূলক কম।’ মেলা প্রাঙ্গণে কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও খ্যাতনামা লেখক মোহীত উল আলমকে দেখে এগিয়ে গিয়ে জানতে চাওয়া হল তার মেলার ভাবনা। জবাবে তিনি বলেন, ‘ভাল লাগছে, ভিড় নেই। আবার লোকে ভর্তি। এবার মেলা সম্প্রসারিত হয়েছে। লেখক-পাঠক ও প্রকাশকদের সুবিধাও বেড়েছে। পাঠকরা তাদের ইচ্ছামতো বই কিনছে। মেলা দুই উদ্যানের পরিবর্তে এক জায়গায় হওয়া উচিত। তাছাড়া মূল একাডেমির দিকে একটি ক্যান্টিন থাকলেও উদ্যান অংশে কোন ক্যান্টিন নেই। আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আড্ডা, বই ও চা। অথচ এখানে সে ব্যবস্থা নেই’। এবারের মেলায় এই লেখকের এসেছে ৪টি বই।
নতুন বই: গতকাল মেলায় আগত উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে ছিল অনিন্দ্য থেকে তুষার কবিরের কবিতার বই ‘ঘুঙুর ছড়ানো ঘুম’, আগামী থেকে নাসির আহমেদের কবিতার বই ‘এই বসন্তে তোমাকে’, সময় থেকে মুনতাসীর মামুনের বই ‘ঔপনিবেশিকোত্তর ঔপনিবেশিক মন’, পলল থেকে রাসেল মাহমুদের কবিতাগ্রন্থ ‘ইনবক্স ভরে গেছে বকুলের ঘ্রাণে’ ও একই প্রকাশনী থেকে নাসিমূল আহসানের উপন্যাসিকা ‘গোলাপ মেয়ের সাথে স্বর্গযাত্রা’ এবং হাক্কানী পাবলিশার্স থেকে সম্পদ বড়ুয়া অনুদূত গ্রন্থ ‘গল্প দেশে দেশে’সহ প্রভৃতি।
আজকের অনুষ্ঠান: আজ সোমবার বিকেল ৪টায় মেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন আহমেদ রেজা। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়, রশিদ আশকারী এবং মোহাম্মদ জয়নুদ্দীন। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী। আজ সোমবার মেলার দুপুর তিনটায় শুরু হয়ে শেষ হবে সাড়ে নটায়।
মেলায় টাস্কফোর্স কমিটির অভিযান: মেলায় গতকাল রবিবার বাংলা একাডেমির ভেতরে অভিযান চালিয়েছে মেলা টাস্কফোর্স কমিটি। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মনজুরুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত টাস্কফোর্স অভিযানে গ্রন্থমেলার নীতিমালা ভঙ্গ করে অন্য প্রকাশনীর বই বিক্রির অভিযোগে তিনটি স্টল বন্ধ করে দেয়া হয়। স্টলগুলো হলো, ‘বইপোকা, ‘শিশুপ্রকাশ’ ও ‘শিশুঘর’। গ্রন্থমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক ড. জালাল আহমেদ বলেন, ‘বেশ কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ শোনা যাচ্ছিল কদিন থেকেই। আজ টাস্কফোর্স অভিযান চালিয়ে অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পায়। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেয়া হলো। টাস্কফোর্স এখন থেকে নিয়মিত এ অভিযান পরিচালনা করবে।’ পাইরেটেড বই বিক্রির নীতিমালা কঠোর অবস্থানের কারণে এবার পাইরেটেড বই স্টলগুলোতে পাওয়া যায়নি। নীতিমালা লঙ্ঘন করলে একাডেমি কর্তৃপক্ষ অন্য যে কোন স্টলের বরাদ্দ যে কোন সময় বাতিল করার ব্যাপারে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এবং আগামী বছর অভিযুক্ত স্টলগুলোর বরাদ্দ না দেয়ার কথা ভাবছে একাডেমি কর্তৃপক্ষ।