বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় ভাষা শহীদদের স্মরণ, সর্বত্র বাংলা ভাষা চালু, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় দ্রুত কার্যকর, জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ এবং সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকারের মধ্যদিয়ে বাঙালি জাতি গতকাল শনিবার পালন করলো শোক আর গর্বের অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। এসময় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জনতার ঢল নামে। বিএনপি জোটের অবরোধ কর্মসূচি উপেক্ষা করে বুকে কালো ব্যাজ নিয়ে শহীদ মিনারে আসা সর্বস্তরের লাখো মানুষের কণ্ঠে ছিল একাত্তরের ঘাতকদের দ্রুত ফাঁসির দাবিতে গগণবিদারি শ্লোগান।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শুরু করে শহর গ্রাম-পাড়া-মহল্লা এমনকি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে একটু ভিন্ন আঙ্গিকেই এবার পালন করা হলো মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এ উপলক্ষে সরকারি ছুটির দিন ছিল কাল। সরকারি ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। উত্তোলন করা হয় কালো পতাকা। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতার এবং বেসরকারি টেলিভিশন ও রেডিও চ্যানেলগুলো বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সমপ্রচার করে। সংবাদপত্রগুলোও বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে।
একুশের প্রথম প্রহর থেকে শুরু করে পরদিন বিকাল পর্যন্ত অসংখ্য রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। ফুলে ফুলে ভরে যায় শহীদ মিনারের বেদি। শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করতে আসা অধিকাংশ মানুষের পোশাকে ছিল একুশের চেতনার ছাপ শোকের কালো রং। অনেকেই গালে, হাতে শহীদ মিনারের আল্পনা, বর্ণমালা, কবিতার চরণ বা গানের কলি এঁকে নিয়েছিলেন। আবার অনেকের টি-শার্ট ও কপালের ফিতায় লেখা ছিল: ‘যুদ্ধাপরাধীদের অবিলম্বে ফাঁসি দিতে হবে’, ‘সহিংসতাকারীদের প্রতিহত করতে হবে।’ ফুলের তোড়া হাতে অপেক্ষমাণ মানুষের সারি পলাশীর মোড় ছাড়িয়ে নীলক্ষেত পর্যন্ত চলে যায়। দীর্ঘ লাইনে ফুল আর ছোট ছোট পতাকা হাতে অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায় সব বয়সের, সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে। তাদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় সেই চিরচেনা গান, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি...।’
একুশের প্রথম প্রহরে রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সফররত ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উচ্চ কক্ষ হাউস অব লর্ডসের স্পিকার ব্যারোনেস ডি সুজা। এরপর ফুল দেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। সফররত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তাদের পরেই। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন তার সফরসঙ্গী দুই মন্ত্রী, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ ও কয়েকজন সংস্কৃতিকর্মী। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে নিয়ে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাত ১২টা ১০ মিনিটের দিকে। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। প্রায় একই সময় আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ১৪ দলের নেতারা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পরে পর্যায়ক্রমে তিনবাহিনী প্রধান, ইন্টারপার্লামেন্টারি ইউনিয়নের চেয়ারপারসন সাবের হোসেন চৌধুরী, বিদেশি দূতাবাসের কর্মকর্তা, অ্যাটর্নি জেনারেল, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি নেতৃবৃন্দ এবং ভাষা সৈনিকরা শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেন।
এছাড়া রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে ওয়ার্কার্স পার্টি, হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের নেতৃত্বে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, খালেকুজ্জামান ভূইয়ার নেতৃত্বে বাসদ, দিলীপ বড়ুয়ার নেতৃত্বে সাম্যবাদী দল প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে। সকালে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রভাতফেরি সহকারে আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়।
এদিকে এবার ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনারে যাননি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বিএনপি জোটের কোনো দল বা নেতাকেও প্রথম প্রহরে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে দেখা যায়নি। তবে সকালে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে শহীদ বেদিতে ফুল দেন বিএনপি ও এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
জেপি’র শ্রদ্ধা: দলের মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলামের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির (জেপি) পক্ষ হতে একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। এসময় উপস্থিত ছিলেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এ এইচ সালাহ উদ্দীন মাহামুদ, আবু সাঈদ খান, এজাজ আহমেদ মুক্তা, দপ্তর সম্পাদক এম. সালাহউদ্দিন আহমেদ, যুগ্ম দপ্তর সম্পাদক জীবন কৃষ্ণ বৈরাগী প্রমুখ। পরে সকাল ৭টায় জেপি’র সকল কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত ও কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। এছাড়া সকাল ৮টায় আজিমপুর কবরস্থানে ভাষা শহীদদের কবর জিয়ারত, ফাতেহা পাঠ ও পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়।
গর্বিত মমতা: ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, মহান শহীদ দিবসের মতো একটি দিনে বাংলাদেশে এসে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পেরে খুবই গর্ব অনুভব করছি। তিনি বলেন, ভাষা শহীদদের আমি স্যালুট জানাই। কলকাতাতেও সার্বজনীনভাবে এ দিবসটি পালন কর?া হয়। ওপার বাংলার অভিনেতা ও তৃণমূল এমপি দেব বলেন, এই দিনে বাংলাদেশে আসার সুযোগ পাবো ভাবিনি। এ সুযোগ করে দেয়ায় তিনি সরকারকে ধন্যবাদ জানান।
এদিকে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বিএনপি নেত্রীর উদ্দেশে বলেন, জ্বালাও-পোড়াও বন্ধ করে সঠিক ধারার রাজনীতির পথে ফিরে আসুন। বাঙালি বীরের জাতি। এখানে জোর করে কিছু হয় না। খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, একাত্তরের পরাজিত শক্তিই আজ দেশকে জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করছে। এদের রুখে দিতে তিনি জনগণের প্রতি আহ্বান জানান ।