নিহতদের পরিবারে শোকের মাতম

পদ্মায় লঞ্চ দুর্ঘটনার শিকার হওয়া হতভাগ্যদের পরিবারগুলোতে চলছে শোকের মাতম। কোনো কোনো পরিবারের ৩/৪ জন পর্যন্ত সদস্য ঐ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। বিভিন্ন জেলা থেকে ইত্তেফাক সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:

রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে লঞ্চ ডুবিতে রাজবাড়ীর ১৩ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব পরিবারে এখন চলছে শোকের মাতম। লঞ্চ ডুবিতে প্রাণ হারিয়েছেন গোয়ালন্দের গৃহবধূ সুফিয়া, তার কন্যা হ্যাপী ও মাতা নবিজান বিবি। একই লঞ্চে ৪ বছরের ছেলে উত্সব ও আড়াই মাসের কন্যা নূশরাত নূর উষ্ণকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে গোয়ালন্দের রুমানা রশীদ স্বপরিবারে মারা যান। মানিকগঞ্জে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়ানো শেষে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির নিজ বাড়িতে ফেরার পথে মারা যান পারুল আক্তার, তার মেয়ে মারজানা ও ভাই স্কুল ছাত্র ইমামুল মাসুম। এ দুর্ঘটনায় নাসিমা নামে বালিয়াকান্দির আরও একজন মারা গেছেন। এ দুর্ঘটনায় রাজবাড়ীর পাঁচুরিয়া এলাকার আঃ রহমান ও রাবেয়া খাতুনও মারা গেছেন। জেলা সদরের শেরে বাংলা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এক সহকর্মী জীবিত উদ্ধার হলেও শেষ রক্ষা হয়নি শিক্ষিকা অসীমা রানীর। তার মৃতদেহ সোমবার সকালে রাজবাড়ীর শহীদ খুশী রেলওয়ে ময়দানে নির্মিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনা হয়। সেখানে হাজারো মানুষ তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এদিকে, গোয়ালন্দ পৌরসভার আদর্শ গ্রামের মৃত রহমান মোল্লার স্ত্রী, মেয়ে, নাতি-নাতনি ও জামাতা মিলে ওই লঞ্চে উঠেছিলেন। জামাতা ও ১২ বছরের নাতি সাঁতরিয়ে জীবন রক্ষা করলেও বাকিরা ডুবে যান। ডুবে যাওয়া লঞ্চ থেকে বেঁচে যাওয়া রহমান মোল্লার জামাতা ফারুক খান বলেন, দুর্ঘটনার আগে আমরা পরিবারের সকলে মিলে লঞ্চের নিচ তলায় নাস্তা করছিলাম। হঠাত্ কার্গোর ধাক্কায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এ সময় তার কোলে থাকা দেড় বছরের মেয়েটি হাত থেকে পড়ে যায়। আমার ছেলে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র সুমনকে ধরতেই সকলেই হাত ছাড়া হয়ে যায়। ছেলে ও আমি জীবন বাঁচাতে পারলেও আমার শাশুড়ি নবিজান বেগম, স্ত্রী সুফিয়া বেগম ও ছোট মেয়ে তিথির মৃত্যু হয়।
অপর দিকে, গোয়ালন্দ উপজেলার ছোটভাকলা ইউনিয়নের কাঁটাখালী উত্তর চর পাঁচুরিয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন বলেন, তার ছেলে মানিকগঞ্জে ডিবি পুলিশের চাকরি করে। সেখান থেকে ফেরার পথে পুত্রবধূ রোমানা রশিদ (২৫) ও তার ৪ বছরের ছেলে উত্সব এবং আড়াইমাস বয়সী মেয়ে উষ্ণ মারা যায়।
অন্যদিকে, জেলা সদরের পাঁচুরিয়া ইউনিয়নের মৃত জবেদ আলীর ছেলে আব্দুর রহমান (৪০) লঞ্চ দুর্ঘটনায় মারা যান। এছাড়া, একই ইউনিয়নের ব্রক্ষণদিয়া গ্রামের সাগর আহম্মেদের স্ত্রী রাবেয়া খাতুন (২০) লঞ্চ ডুবিতে নিহত হন। নিহত গৃহবধূ রাবেয়া ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন এবং ঢাকার কল্যাণপুর থেকে বাড়ি ফিরছিলেন।
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে লঞ্চ দুর্ঘটনায় এক প্রকৌশলী ও ডাক্তারসহ কুষ্টিয়া জেলার বিভিন্ন এলাকার ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে তিনটি পরিবারের রয়েছে ৯ জন সদস্য। ১৬ জনের লাশ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এদের বাড়ি কুষ্টিয়া সদর, কুমারখালী, খোকসা ও মিরপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। নিহতদের পরিবারে ও এলাকায় চলছে শোকের মাতম।
তবে শিশুসহ অন্তত তিনজনের লাশ এখনো পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার সালেহা আক্তার জানান, নিহতদের লাশ প্রশাসনিক তদারকির মাধ্যমে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
ফরিদপুর প্রতিনিধি জানান, রবিবার পাটুরিয়ার পদ্মা নদীতে কার্গোর ধাক্কায় এমভি মোস্তফা-৩ লঞ্চডুবির ঘটনায় সোমবার পর্যন্ত ফরিদপুর সদর উপজেলার ৬ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এদের সকলের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। অনাকাঙ্খিত এই মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না স্বজনসহ এলাকাবাসী।
কৈজুরী ইউনিয়নের ফুসরা গ্রামের স্বপন সরকারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় স্বজনদের আহাজারিতে সেখানে এক হূদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। দুপুর ১২টার দিকে তাঁর লাশ বাড়িতে আনা হয়। স্বজনরা জানান, বৃহস্পতিবার রাতে তিনি মানিকগঞ্জ জেলার ঝিটকা গ্রামের তাঁর গুরুদেব কুমুদ গোস্বামীর বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পথে সে লঞ্চডুবির শিকার হয়ে মারা যায়।
সালথা (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, হিন্দু সমপ্রদায়ের ধর্ম গুরু মানিগঞ্জের কুমুদ গোস্বামীর বাড়ি থেকে গুরু সেবা দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে লঞ্চডুবির কবলে পড়ে লাশ হয়ে ফিরলেন ফরিদপুরের সালথার একই পরিবারের ৪ জন। গত বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলার আটঘর ইউনিয়নের ভটরকান্দা গ্রামের বৌধ নাথ সরকার (৬৫), তার স্ত্রী অনিমা রানী (৫৫), বৌধ নাথের ৩ কাকি চম্পা রানী (৬২), অর্চনা রানী (৪২) ও বাসন্তী রানী (৫০) এক সাথে গুরু সেবা দিতে মানিগঞ্জের কুমুদ গোশ্বামীর বাড়িতে যান। গুরু সেবা দিয়ে রবিবার তারা বাড়ি ফেরার পথে বাসন্তি রানী ছাড়া বাকি ৪ জনেরই সলীল সমাধি ঘটে।   
গতকাল সোমবার দুপুরে লাশ সবার গ্রামের বাড়িতে আনা হলে স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে পরিবেশ। শোকবহ পরিবারের সদস্যদের শান্ত্বনা দিতে ছুটে আসেন প্রতিবেশীসহ প্রসাশনের কর্মকর্তারা। বিকালে বাড়ির পাশে নিহতের শেষ সমাধি করা হয়।
গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, পদ্মায় লঞ্চ ডুবির ঘটনায় নিহত গোপালগঞ্জের মা ও ছেলেসহ ৩ জনের লাশ দাফন করা হয়েছে। সোমবার কাশিয়ানী উপজেলার আড়ুয়াকান্দি গ্রামের বাদ যোহর জানাজা শেষে গ্রামেই জুনায়েদ শেখ (১৩ মাস) ও তার মা রিনা বেগমের লাশ দাফন করা হয়। অন্যদিকে, বাদ আসর কাশিয়ানী উপজেলার জোতকুরা গ্রামে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিহত গৃহবধূ শাহানাজ বেগমের মরদেহ।

নগরকান্দা (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, পদ্মায় লঞ্চ ডুবিতে নিহত ফরিদপুরের নগরকান্দার শহীদ নগর ইউনিয়নের ছাগলদি গ্রামের কাঠ মিস্ত্রি খোকন দাসের পুত্র বাঁধন দাসের (৫) মরদেহ গতকাল সোমবার সকালে বাড়ীতে পৌঁছালে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। বাঁধনকে শেষবারের মতো দেখার জন্য  প্রতিবেশীরা ভীড় জমায়। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বাঁধন মানিকগঞ্জে মাসির বাড়ী বেড়াতে গিয়েছিল। সেখান থেকে মেসোর সাথে নিজ বাড়ীতে ফেরার পথে দুর্ঘটনার শিকার হয়। দুপুরে বাঁধনের লাশ বাড়ীর পাশে সমাহিত করা হয়। বাঁধনের মা লক্ষ্মী রানী দাস আর্তনাদ করে বলেন, আমার বাজানরে স্কুলে ভর্তি করবার চাইছিলাম, এখন আমি কারে ভর্তি করাবো।