গণপরিবহনে গণভোগান্তি

রাজধানীর গণপরিবহনে অব্যবস্থাপনা দুঃসহ হয়ে উঠেছে। যেখানে চরমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে জনস্বার্থ। বিশেষ করে ভাড়া আদায়ে স্বেচ্ছাচারিতা, যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, যেখানে সেখানে গাড়ি থামানো, সিটিং সার্ভিসের নামে প্রতারণা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, লাইসেন্সবিহীন চালক, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে পুরুষ বসা, ছেঁড়া-ফাটা সিট প্রভৃতি কারণে গণপরিবহন এখন গণভোগান্তির অন্যতম উত্স হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর উপর তীব্র যানজট তো রয়েছেই।

গণপরিবহনে অব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ফিটনেস ছাড়া কোন গাড়ি আইনত চলতে পারে না। তবু ফিটনেসবিহীন কিছু গাড়ি চলছে। এছাড়া কিছু চালক ভুয়া লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, গণপরিবহনে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতিনিয়ত ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে গত ৫ জানুয়ারি থেকে আদালতের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। শিগগিরই এই কার্যক্রম আবার শুরু করা হবে বলে তিনি জানান।
নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বাস সার্ভিসের জন্য টিকিট কাউন্টার থাকার কথা থাকলেও বিআরটিসি ছাড়া অন্যদের টিকিট কাউন্টার হাতেগোনা। গাড়ির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় যাত্রীদের। স্টুডেন্ট ভাড়া অর্ধেক হলেও লোকাল বাস ছাড়া তথাকথিত সিটিং সার্ভিসে এ নিয়ম মানা হয় না। অধিকাংশ বাসের সিট ছেঁড়া-ফাটা। ব্যাকলাইট ও ইন্ডিকেটর (সিগন্যাল লাইট) নেই। এ কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে অহরহ। বেশির ভাগ সময় বাসে তিলধারণের ঠাঁই থাকে না। অন্যদিকে ট্যাক্সিক্যাব অপ্রতুল, ভাড়াও অতিরিক্ত। সিএনজিচালিত অটোরিকশাও চলে মিটারবহির্ভূত ভাড়ায়। অনেক সময় তারা প্রয়োজনীয় গন্তব্যে যেতেও চায় না। এ অবস্থায় মানুষের ভোগান্তির কোনো সীমা-পরিসীমা নেই।
এছাড়া গণপরিবহনে জনদুর্ভোগের মধ্যে চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর আতংকও তাড়া করে নগরবাসীদের। আইন অনুযায়ী এই অপরাধের শাস্তি লাইসেন্স বাতিল ও জরিমানা। কিন্তু এসবের কিছুই হচ্ছে না। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর ট্রাফিক বিভাগের যুগ্ম-কমিশনার মোসলেহউদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, ঢাকা সিটিতে গণপরিবহন চলাচলে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা রয়েছে। তবে তা নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক সব সময় সক্রিয়। গণপরিবহন ব্যবস্থাকে জনবান্ধব করার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি বলে তিনি জানান ।
৮৮ কিমি সড়ক, যানবাহন চলে ৫ লাখ : আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী যে কোনো শহরে মোট আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ যান চলাচলের জন্য রাস্তা থাকা আবশ্যক। ঢাকা শহরের মোট আয়তন ৮১৫ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার। এ হিসাবে ২০৪ কিলোমিটার রাস্তার প্রয়োজন হলেও শহরে প্রধান রাস্তার পরিমাণ মাত্র ৮৮ কিলোমিটার। এ পরিমাণ রাস্তায় ৫ লাখ যানবাহন চলাচল করছে। অথচ আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী এই রাস্তায় ২ লাখ ১৬ হাজার যানবাহন চলাচল করার কথা। সে হিসাবে ঢাকায় রাস্তার তুলনায় প্রায় ৩ লাখ বেশি যানবাহন চলছে।
সোয়া লাখ ফিটনেসবিহীন গাড়ি: রাজধানীতে চলাচলকারী অনেক গাড়িরই ফিটনেস নেই। বাইরে থেকে রং দিয়ে চাকচিক্য বাড়ানো হয়। অথচ এগুলোর বেশির ভাগই চলাচলের অনুপযোগী। বিআরটিএ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঢাকায় ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা প্রায় সোয়া লাখ। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, নগরীতে চলাচলরত মিনিবাসগুলো অধিকাংশই মেয়াদ অতিক্রম করেছে। ৬৮ শতাংশেরই দরজা-জানালা ও কাঠামো ভাঙা এবং ৫২ শতাংশের সিট ছেঁড়া ও ভাঙা।
এছাড়া বাস মালিক সমিতির দেয়া তথ্যে জানা যায়, নগরীর বাস চালকদের ৪০ শতাংশেরই চালক হিসেবে বৈধ লাইসেন্স নেই। চালকদের বয়স ন্যূনতম ২০ এবং হেলপারের ১৮ বছর হওয়ার কথা থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কিশোরদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।
ভাড়া আদায়ে স্বেচ্ছাচারিতা, সিটিংয়ের নামে চিটিং: গণপরিবহনে ইচ্ছামত আদায় করা হচ্ছে ভাড়া। বিআরটিএ বাসের (চালকসহ ৩১ আসনের বেশি) ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটার ১ দশমিক ৬০ টাকা এবং মিনিবাসের (চালকসহ সর্বোচ্চ ৩১ আসন) ক্ষেত্রে ১ দশমিক ৫০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েছে। এছাড়া বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া সাত টাকা এবং মিনিবাসের পাঁচ টাকা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। অথচ দু’একটি বাস কোম্পানি ছাড়া বেশিরভাগই অতিরিক্তি ভাড়া আদায় করে।
এর উপর সিটিং সার্ভিসের নামে করা হচ্ছে চিটিং। প্রায় প্রতিটি রুটে ‘গেটলক’, ‘সিটিং’ সেবার কথা বলে ভাড়া আদায় করা হলেও কার্যত দেয়া হচ্ছে লোকাল বাসের সেবা। মিরপুর-সদরঘাট, মিরপুর-গুলিস্তান, মিরপুর-আজিমপুর, মিরপুর-গুলশান, মিরপুর-যাত্রাবাড়ী, মিরপুর-মতিঝিল, গুলিস্তান-উত্তরা, গাবতলী-সদরঘাট, যাত্রাবাড়ী-উত্তরা ও সদরঘাট-চন্দ্রা রুটে চলাচলকারী বাসগুলোর মধ্যে শুধু গাবতলী-সদরঘাট রুটের ৭ নম্বর বাসে লোকাল ভাড়া আদায় করা হয়। আর বাকি সব বাসে সিটিং সার্ভিসের নামে ভাড়া আদায় করা হলেও সেবা দেয়া হয় লোকালের মতো।
অতিরিক্ত যাত্রী, যেখানে সেখানে ওঠানামা: রাজধানীতে চলাচলকারী বাসের জন্য কোন টার্মিনাল নেই, স্টপেজগুলোতে যাত্রী ওঠা নামারও পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেই। গণপরিবহনগুলোয় ইচ্ছামত যাত্রী ওঠানামা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। যাত্রী নেয়ার ক্ষেত্রে চালক-হেলপাররা কোন কিছুরই তোয়াক্কা করে না। এটা নিয়ন্ত্রণে আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই।
অন্যদিকে অধিকাংশ গণপরিবহনে নির্ধারিত আসনের চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী নেয়া হয়। চালকসহ ৩১ সিটের বাসে বহন করা হয় ৫০ জনের অধিক যাত্রী। পঞ্চাশোর্ধ্ব আবদুল মতিন গুলিস্তান থেকে ফার্মগেট এসেছেন বাসে করে। তিনি বলেন, ‘বাসে ওঠার সময় পাল্লা দিয়ে উঠতে হয়েছে। তাও দাঁড়িয়ে বাদুড়ঝোলা হয়ে আসতে হলো। আবার নামতে গিয়ে দম বন্ধ হয়ে আসার জোগাড়।’
আসন সমস্যা: গণপরিবহনে আরেকটি বড় সমস্যা হলো, গাড়ির আকারের তুলনায় অধিক পরিমাণ সিট রাখা। বিআরটিএ অনুমোদিত সিটের চেয়ে বেশি সিট রাখায় যাত্রীদের বসতে কষ্ট হয়। অনেক ক্ষেত্রে পা গুটিয়ে বসতে হয় যাত্রীদের। তেলচিটচিটে অপরিচ্ছন্ন সিটে বসতে গা ঘিন ঘিন করে। এছাড়া সিট এবং গাড়ির জানালা ও বডি ভাঙা থাকার কারণে যাত্রীদের পরনের কাপড়-চোপড় ছিঁড়ে যায়, শরীরও ক্ষত-বিক্ষত হয়।
এছাড়া প্রতিটি বাসেই নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সিট বরাদ্দের কথা থাকলেও বিআরটিসি ছাড়া অধিকাংশ বাসে এ নিয়ম মানা হয় না। এসব বাসে বসে থাকেন পুরুষ যাত্রীরা। পরিবহন শ্রমিকরা জানান, নারীদের ফাঁকা সিটে পুরুষ যাত্রী বসে পড়লে উঠানোর মতো পরিস্থিতি থাকে না।
সিগন্যাল মানতে অনীহা: ঢাকার রাস্তা ও গণপরিবহন নিয়ে বুয়েটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর বাসচালকদের চোখ থাকে লুকিং গ্লাসের দিকে। তারা তাকিয়ে দেখেন পেছন দিয়ে একই পথের অন্য কোনো বাস আসছে কি না। কোনোভাবেই সেই বাসকে আগে যেতে দেয়া যাবে না, এই মানসিকতা তাদের মধ্যে প্রবল। এছাড়া বিআরটিসি ছাড়া অধিকাংশ বাসে চালকদের জন্য আলাদা কোন দরজা সংরক্ষণ করা হয়নি। রাজধানীতে চলাচলকারী সব পরিবহনের চালকরা যাত্রীদের ডিঙ্গিয়ে ওঠানামা করেন।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রাজধানীতে প্রায় ২২ হাজার ছোট-বড় বাস চলে। এসবের মালিক মাত্র ২ হাজার। এর মানে অল্প কিছু মানুষ রাজধানীর সমগ্র পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে। গণপরিবহনে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ফিরিয়ে আনতে এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি বলে অনেকে মনে করেন।