অনিশ্চয়তায় ভ্যাট আইনের সংশোধন

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফের আপত্তিতে নতুন ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) আইনের সংশোধন ঝুলে যাচ্ছে বলে আশংকা করা হচ্ছে। ফলে ভ্যাটের নামে ভোক্তার পকেট থেকে বাড়তি অর্থ কাটার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকছে। ‘গোঁজামিল’র ভ্যাট আইন কার্যকর থাকায় এটি হয়ে উঠেছে রাজস্ব আদায়ের প্রধান খাত। এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে রাজস্ব প্রশাসনের দ্বন্দ্ব বরাবরই প্রকট। তবে নতুন ভ্যাট আইন সংশোধন করে সেই দ্বন্দ্ব কিছুটা কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু এখন সেই উদ্যোগও কার্যকর করা যাচ্ছে না। ফলে এক ধরনের অনিশ্চয়তা আর উদ্বেগে রয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশকে বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা দেয়া আইএমএফ বলেছে, সংসদে পাস হওয়া ভ্যাট আইনটিই কার্যকর করতে হবে। কোন সংশোধন চলবে না। অথচ আইনটি সংশোধনে সরকার গঠিত পর্যালোচনা কমিটি সমপ্রতি তাদের সুপারিশে আইনে বড় দুটি ইস্যুতে পরিবর্তন আনার সুপারিশ করেছে। এ নিয়েই নতুন করে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাহলে পর্যালোচনা কমিটি করার দরকার কি ছিল? ব্যবসায়ীরা বলছেন, আইএমএফ অতিমাত্রায় খবরদারি করছে, কিন্তু নীতিমালা অনুযায়ী সংস্থাটি এটি করতে পারে না। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিওটিও) সাথে এ সম্পর্কিত চুক্তিতে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ এ ধরনের সংস্থা স্বাক্ষরও করেছে। বিষয়টি উল্লেখ করে সমপ্রতি অর্থমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
বাংলাদেশে ১৯৯১ সালে তত্কালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর  রহমান ভ্যাট আইন চালু করেন। শুরুতেই ভ্যাট আইন নিয়ে নানা জটিলতা ও সমালোচনা দেখা দেয়। পরবর্তীতে ঐ আইনটি বাংলাদেশের জন্য ‘লাগসই’ আইন নয় বলেও বিশেষজ্ঞরা মতামত ব্যক্ত করেন। তবে বড় বড় ব্যবসায়ীরা আইনের পক্ষে থাকেন এ কারণে যে, কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে ক্রেতার পকেট থেকে আদায় করা পুরো অংক রাজস্ব বিভাগে জমা দিতে হয় না। সর্বশেষ ২০১২ সালে নতুন ভ্যাট আইন সংসদে পাস হয়। এই আইন নিয়েও ব্যবসায়ীরা তীব্র আপত্তি তোলে। বিষয়টি নিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বাদানুবাদও হয়। পরবর্তীতে সংসদে পাস করা আইনটি সংশোধনের জন্য একটি কমিটি করা হয়। কমিটি পর্যালোচনা শেষে তাদের সুপারিশ প্রদান করে এবং সরকার এই সুপারিশ গ্রহণে নীতিগতভাবে সম্মত হয়। কিন্তু বাধ সাধে আইএমএফ। আইএমএফ বলেছে- ২০১২ সালে সংসদে পাস করা আইনটিই কার্যকর করতে হবে।
যেসব বিষয়ে সংশোধনী: নতুন ভ্যাট আইনে সব ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হয়। এই ইস্যুটি নিয়েই ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় আপত্তি ছিল। পর্যালোচনা কমিটি বাংলাদেশের বাস্তবতা বিবেচনায় ১৫ শতাংশের পরিবর্তে ভিন্ন ভিন্ন হারে (যারা উপকরণ রেয়াত নিতে পারেন না) ভ্যাট আরোপের সুপারিশ করে। এর যুক্তিতে বলা হয়, বিদ্যুত্ বিতরণ ও নির্মাণ সংস্থা সেবায় বর্তমানে যথাক্রমে ৫ ও সাড়ে ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট ব্যবস্থা বলবত্ রয়েছে। এছাড়া আরো কিছু পণ্যের ক্ষেত্রেও হ্রাসকৃত হারে ভ্যাট আরোপিত রয়েছে। নতুন আইনে বার্ষিক টার্নওভারের (বিক্রয়) ভ্যাটমুক্ত সীমা ২৪ লাখ টাকা করা হয়। এর পর ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত ৩ শতাংশ করা হয়। ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল টার্নওভার ভ্যাটমুক্ত সীমা ১ কোটি টাকা করা। কমিটির সুপারিশে টার্নওভার ভ্যাটমুক্ত সীমা ২৪ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৬ লাখ টাকা করা হয়। এর পর দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত ৩ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়। এছাড়া নতুন আইনে ব্যবসায়ী পর্যায়ে ১৫ শতাংশের স্থলে ৩৬ লাখ টাকার ঊর্ধ্বে টার্নওভারের ক্ষেত্রে ২ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপের সুপারিশ করা হয়। এনবিআর ও ব্যবসায়ী - উভয় পক্ষের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি এ সুপারিশ করে। দফায় দফায় বৈঠক শেষে গুরুত্বপূর্ণ এসব ইস্যুতে উভয় পক্ষ একমত হন। এ ব্যাপারে ১০টি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।
টার্নওভার করের আদলে ব্যবসায়ীরা বর্তমানে প্যাকেজ পদ্ধতিতে ভ্যাট দিয়ে থাকেন। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে বার্ষিক প্যাকেজ ভ্যাট ১১ হাজার টাকা। অন্য সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ৮ হাজার টাকা, জেলা শহরে ৬ হাজার ও উপজেলায় এর পরিমাণ ৩ হাজার টাকা।
আইনটি পর্যালোচনায় গঠিত কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন এনবিআরের সাবেক সদস্য আলী আহমেদ আর কো-চেয়ারম্যান ছিলেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহ-সভাপতি জসীম উদ্দিন। আলী আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, উভয় পক্ষই তাদের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। ফলে শেষ পর্যন্ত একটি গ্রহণযোগ্য সুপারিশ দিতে পেরেছি। তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় সব ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট কার্যকর করা মুশকিল। এটি কার্যকর হলে বেশকিছু পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য ভিন্ন ভিন্ন হারে ভ্যাট আদায় করার জন্য রিপোর্টে সুপারিশ করা হয়েছে।
আইএমএফের আপত্তি:ভ্যাট আইন সংশোধনে পর্যালোচনা কমিটি ১০টি বিষয়ে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে অর্থমন্ত্রীকে প্রতিবেদন জমা দেয়। কিন্তু আইএমএফ এ সুপারিশে আপত্তি তোলে। আইএমএফের মতে, নতুন আইনে কোন ধরনের পরিবর্তন আনা ঠিক হবে না। অর্থাত্ সব ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট রাখার বিধান বলবত্ রাখার জন্যই সংস্থাটি মত দেয়।
প্রসঙ্গত, আইএমএফ বাংলাদেশকে ঋণ সহায়তা দিয়ে থাকে। ব্যালেন্স অফ পেমেন্ট ঠিক রাখাসহ বাংলাদেশের অর্থনীতি পর্যালোচনা করে থাকে আইএমএফ। তারা সরকারকে দেয়া বর্ধিত ঋণ সহায়তার (ইসিএফ) ঋণের শর্তে রাজস্ব খাত সংস্কার তথা ভ্যাট আইনের বাস্তবায়নের শর্তটিও জুড়ে দেয়। বর্তমানে ওই ঋণের শেষ কিস্তিও (১৪ কোটি ডলারের বেশি) ঝুলে আছে। বছরের শুরুতেই এই অর্থ পাওয়ার কথা ছিল।
ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ: সংশোধিত ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে আইএমফের আপত্তিতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তারা বলছেন, সরকারের সঙ্গে ঋণ বা অন্য কোন চুক্তিতে এ ধরনের সংস্থা আইন করার ক্ষেত্রে কোন ধরনের শর্ত দিতে পারে না। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিওটিও) বিদ্যমান নীতির সঙ্গেও এটি সাংঘর্ষিক। সমপ্রতি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই অর্থমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে ডব্লিওটিও’র এসব বিধিবিধান উল্লেখ করে বিষয়টি অবহিত করেছে।

এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশের ৮০ শতাংশ ব্যবসায়ী উদ্যোক্তাই ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের। তাদের একটি অংশ আবার গ্রামীণ উদ্যোক্তা। তাদের পক্ষে চালান ফরম দেখিয়ে উপকরণ রেয়াত নেয়া কার্যত সম্ভব নয়। এই বিধান বাংলাদেশে বাস্তবসম্মতও নয়। এছাড়া প্রতিবেশী ভারত, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশকিছু দেশসহ অনেক দেশেই ভ্যাটের ভিন্ন ভিন্ন হার প্রচলিত রয়েছে। সে ক্ষেত্রে যারা উপকরণ রেয়াত নিতে সক্ষম নন, এমন ব্যবসায়ীদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন হারে ভ্যাট প্রথা চালু রাখাই যুক্তিপূর্ণ।