হারিয়ে যাচ্ছে তিস্তাসহ উত্তরবঙ্গের ৫০ নদ-নদী

পানিশূন্য হয়ে পড়ায় মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে খরস্রোতা তিস্তাসহ উত্তরাঞ্চলের ৫০টি নদ-নদী। পানির অভাবে বিলীনের পথে অনেক নদীর অস্তিত্ব। নদী অববাহিকার লাখ লাখ মানুষ নিজেদের পেশা হারিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে পথে বসেছেন। অনেক মাঝি-মাল্লা ও জেলেরা বেঁছে নিয়েছেন অন্য পেশা। কেউ কেউ বাপ-দাদার পেশা নৌকা চালানো, মাছধরা ছেড়ে দিয়ে চরাঞ্চলের গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিক্রি করছেন হাড়ি-পাতিল।

পানি সংকটের কারণে আবাদি জমির পরিমাণ কমে গিয়ে ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে হাজার হাজার হেক্টর জমি। অথচ এসব নদীতে একসময় পানি প্রবাহ এতো ছিল যে, নদী পার্শ্ববর্তী হাজার হাজার হেক্টর জমি বছরের ৬ মাসেই পানির নিচে থাকতো। নদীতে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক ছিল। মাঝি-মাল্লাদের কণ্ঠে ভেঁসে উঠতো সেই পল্লীগীতি, ভাটিয়ালী গানের সুর। নদীর উপর নির্ভরশীল মত্স্যজীবীরাও পরিবার-পরিজন নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতো। বর্তমানে এ অঞ্চলের নদ-নদী মরে যাওয়ার উপক্রম হওয়ায় পাল্টে গেছে সার্বিক চিত্র।
সরেজমিন জানা যায়, রংপুর, গাইবান্ধা, লালমণিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের তিস্তা, ঘাঘট, ধরলা, করতোয়া, দুধকুমার, সতী ঘাঘট, নীলকুমার, বাঙালি, বরাই, মানাস, কুমলাই, ধুম, বুড়িঘোড়া, সোনাভরা, হলহলিয়া, লহিতা, ঘরঘরিয়া, নলেয়া, জিঞ্জিরাম, ফুলকুমার, কাঁটাখালী, সারমারা, রায়ঢাক, যমুনেশ্বরী, চিতনী, মরা করতোয়া, ইছামতি, আলাই, কুমারীসহ ৫০টি নদ-নদী আজ মৃতপ্রায়। মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে এসব নদ-নদী। নদ-নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় চারিদিকে ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে হাজার হাজার হেক্টর জমি। ফলে কমে গেছে আবাদি জমির পরিমাণ।
রংপুর মহানগরী থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে গঙ্গাচড়া উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে ৭টি ইউনিয়ন তিস্তা নদীবেষ্টিত। বর্তমান মৌসুমে তিস্তা নদী ধু-ধু বালুচরে পরিণত হওয়ায় এ অঞ্চলের কৃষক, জেলে, মাঝি-মাল্লারা বেকার হয়ে পড়েছেন। ডালিয়া থেকে কাউনিয়া পর্যন্ত প্রায় ৭০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে জেগে উঠেছে বিশাল বিশাল বালুচর। পানির অভাবে তিস্তা প্রকল্পে আধুনিক সেচ সুবিধা থাকলেও পানি প্রবাহ না থাকায় তিস্তা অববাহিকার লাখ লাখ মানুষের জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়েছে। নদীর উপর নির্ভরশীল এসব মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম হাহাকার। অথচ একসময় তিস্তানদীর শাখা ঘাঘট ও মানাস নদীর পানি প্রবাহে এ অঞ্চলে সবুজের সমারোহ ছিল। এসব বহমান নদীর দু’পারে ছিল অসংখ্য খেয়াঘাট। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ পারাপার হতো খেয়াঘাট দিয়ে। সেই সব খেয়াঘাটের অনেক স্থানে এখন ব্রিজ নির্মাণ করে রাস্তা করা হয়েছে। আবার অনেক স্থানের আবাদী জমি ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে। গঙ্গাচড়া উপজেলার আলমবিদিতর, সদর থেকে পীরগাছা উপজেলার প্রায় ৮০ কিলোমিটার বিস্তৃত ছিল মানাস নদ। বর্তমানে এ নদীর কোন অস্তিত্ব নেই। একই অবস্থা ঘাঘট নদীর। নগরীর অদূরে ঘাঘট নদীকে কেন্দ্র করে এক সময়ের গড়ে ওঠা নদী বন্দর বিলীন হয়ে গেছে।
১৮২০ সালের পর থেকে এ অঞ্চলের প্রমত্তা করতোয়া নদী ক্ষীণ হয়ে আজ প্রায় মরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। করতোয়া গাইবান্ধা ও বগুড়ার উপর দিয়ে প্রবাহিত। পীরগাছা উপজেলা দিয়ে এক সময়কার প্রবাহিত আড়াইকুমারী নদীর কোন অস্তিত্বই আজ আর নেই। শুধু রংপুর বিভাগের মধ্যেই প্রায় ৩৪টি নদ-নদী শুকিয়ে গেছে। ধ্বংস হয়ে পড়েছে কৃষিক্ষেত্র। প্রতিটি জেলায় দেখা দিয়েছে মত্স্য ঘাটতি।

নদ-নদীগুলো মরে যাওয়ার উপক্রম হওয়ায় উত্তরাঞ্চল জুড়ে মরুকরণ সৃষ্টির লক্ষণ দেখা দেয়ায় শংকিত হয়ে পড়েছেন পরিবেশবিদরা। তাদের মতে, বাঁধ নির্মাণ করে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ অঞ্চলের নদী-উপনদী, শাখা-প্রশাখা, ছড়ানদী এবং নদীখাতগুলোকে বাঁচিয়ে তুলতে পর্যাপ্ত পানির প্রবাহ বজায় রাখতে হবে। পাশাপাশি নদীগুলো পুনরুদ্ধার করতে অবৈধ বাঁধ অপসারণ, তলদেশ খনন, ড্রেজিং মাধ্যমে উত্স মুখ খোলাশা করে কৃত্রিম ক্যানেলের মাধ্যমে ছোট নদীগুলোর সঙ্গে বড় নদীগুলোর সংযোগ করা প্রয়োজন। দ্রুত সমস্যা সমাধান করতে না পারলে একসময় উত্তরাঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে বলে পরিবেশবিদদের আশংকা।