লেখক ও ব্লগার ড. অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার অন্যতম সন্দেহভাজন শফিউর রহমান ফারাবীকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। র্যাবের দাবি, ফারাবী এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তিনি এ হত্যার উস্কানিদাতা। র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ফারাবীকে ডিবিতে হস্তান্তর করেছে। ড.অভিজিত্ হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ফারাবীকে গ্রেফতারকৃত আসামি হিসাবে দেখানো হয়েছে।
সর্বশেষ অভিজিৎ হত্যার পর পরই ফারাবীকে তার এক ফেসবুক ফ্রেন্ড অভিজিতের রক্তাক্ত ছবি পাঠিয়ে বলে যে, ছবি পাইছেন কি, উত্তরে ফারাবী ছবি পেয়েছেন বলে জানায়।’ এরপর ঐ ফেসবুক ফ্রেন্ড ফারাবীর অনুভূতি জানতে চাইলে সে বলে যে, আমি গ্রেফতার হবো কাল পরশুর মাঝে।
এদিকে, ড. অভিজিৎ রায় হত্যার পর হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে টুইটটি ইউকে থেকে করা হয়েছিল বলে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে অভিজিৎকে হত্যার কিছুক্ষণ পরই ‘আনসার বাংলা-৭’ পরিচয়ে দায় স্বীকার করে একটি টুইট করা হয়।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ন কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম জানান, হত্যার দায় স্বীকার করে যে টুইটটি করা হয়েছিল তা ইউকে থেকে আপলোড করা হয় বরে তারা নিশ্চিত হয়েছেন।
ঐ গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরো জানান, অভিজিতের বাবা অজয় রায়কে মোবাইল ফোনে হুমকি দেয়া হয়েছিল গাইবান্ধা থেকে। এ ব্যাপারে হুমকিদাতাকে গ্রেফতারের চেষ্টা করা হচ্ছে।
সোমবার ভোর সাড়ে ৫ টায় র্যাব-১০ একটি দল রাজধানীর যাত্রাবাড়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে ফারাবীকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানান র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান।
তিনি জানান, উগ্রপন্থি ব্লগার ফারাবীই লেখক ড. অভিজিত্ রায় হত্যাকাণ্ডের প্রধান সন্দেহভাজন। অভিজিৎ রায় ও তার পরিবারের বিভিন্ন তথ্য ফারাবী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার অনুসারীদের মাঝে প্রচার করতেন। তাকে হত্যার জন্য উস্কানি দিতেন। ফারাবী তার ফেসবুকে গত ৯ ফেব্রুয়ারি যে স্ট্যাটাস দিয়েছেন তাতে লেখা হয়েছে, ড. অভিজিৎ রায় তার স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে আমেরিকায় থাকেন। তার ব্যাপারে আমেরিকায় বসবাসরত তার অনুসারীরা খোঁজ খবর রাখছে। এরপর ফারাবী অভিজিত্ রায়ের পরিবারের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে বলেছেন, ‘অভিজিত্ রায় আমেরিকায় থাকে। তাই তাকে এখন হত্যা করা সম্ভব না। তবে সে যখন দেশে আসবে, তখন তাকে হত্যা করা হবে।’
আজ দুপুরে উত্তরায় র্যাব সদর দফতরে ফারাবীকে হাজির করা হয়। এসময় সাংবাদিক সম্মেলনে র্যাবের লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া উইং শাখার পরিচালক কমান্ডার মাহমুদ খান গ্রেফতারকৃত ফারাবীর বিষয়ে সাংবাদিকদের কাছে ব্রিফিং করেন। তিনি জানান, অভিজিৎ রায় হত্যার ঘটনায় ফারাবীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছে গুরত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে ফারাবী নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন।
র্যাবের এই কর্মকর্তা জানান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেও পড়াশুনা শেষ করতে পারেননি। ছাত্রবস্থায় তিনি শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। পরে তিনি নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের যোগ দেন।
২০১০ সালে ফারাবী গ্রেফতার হয়ে একমাস কারাগারে ছিলেন। পরে জামিনে মুক্তি পেয়ে অনলাইনে ধর্মীয় উগ্রবাদ ছড়ানোর কাজ শুরু করেন।
তিনি বলেন, ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি শাহবাগ আন্দোলনের কর্মী ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারের জানাজা পড়ানোয় ইমামকে হত্যার হুমকি দিয়ে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেন ফারাবী। ঐ ঘটনার পর ২৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই নম্বর গেইট এলাকা থেকে পুলিশ ফারাবীকে গ্রেফতার করে।
তিনি বলেন, ফেসবুক ব্যবহার করে ইমামকে হত্যার হুমকি দেয়ায় তথ্যপ্রযুক্তি আইনে জুন মাসে ঢাকার একটি আদালত তার বিরুদ্ধে অভিযোগও গঠন হয়। কিন্তু হাইকোর্টের জামিনে ২০১৩ সালের ২১ অগাস্ট কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে যান ফারাবী। আর মুক্তি পেয়েই ‘নাস্তিকদের’ হত্যাকাণ্ড সমর্থন করে তিনি ফেইসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন।
কমান্ডার মাহমুদ খান বলেন, বছর পাঁচেক আগে অনলাইনে অভিজিতের সঙ্গে ফারাবীর পরিচয়। কিন্তু লেখালেখি নিয়ে মতবিরোধের এক পর্যায়ে তাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এরপরে অনলাইনে অভিজিৎ ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাপারে উস্কানিমূলক পোস্ট দিতেন ফারাবী। বিভিন্ন সময়ে তিনি অভিজিৎক হত্যার হুমকি দেয়া ছাড়াও নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও ব্লগে তাকে হত্যার বিষয়ে প্রচারণা চালাতেন।
অভিজিৎহত্যার সঙ্গে ফারাবী সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে কমান্ডার মাহমুদ খান বলেন, কোনো অপরাধিই প্রথমে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন না। জিজ্ঞাসাবাদের পর প্রকৃত তথ্য পাওয়া যাবে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, তবে কৌশলগত কারণেই এখনই সব তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ করা যাবে না বলে জানান এই র্যাব কর্মকর্তা।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে সঙ্গে নিয়ে বইমেলা থেকে ফেরার পথে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরের উল্টো পাশে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সংলগ্ন ফুটপাতে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ড. অভিজিৎ রায়কে। হামলায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বন্যার একটি আঙুল। তারা দুইজনই যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিক।