‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন’

সাধুসঙ্গ আর সাধু-গুরুর ভাব-বিনিময়ের মধ্যে দিয়ে ছেঁউড়িয়ায় চলছে পাঁচ দিনব্যাপী লালন দোল উত্সব। উত্সবের তৃতীয় দিনে গতকাল মানব মিলন মেলায় পরিণত হয় ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়া। পাপ মুক্তি এবং আত্মার মুক্তি নিয়ে ভাব-আচার বিনিময় করেছেন আগত সাধুবৃন্দ।
ফকির নহির শাহ বলেন, আত্মসংস্কারের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি লাভ হয়। আর আত্মশুদ্ধি লাভের মাধ্যমে আত্মার মুক্তি ঘটে। আত্মার মুক্তি ঘটার যে মূল কথা সেটি সম্পর্কে খোদ সাঁইজি বলেছেন ‘মানুষের করণ, সেকি সাধারণ, জানে রসিক যারা’। সে কারণে আত্মার মুক্তি আনতে হলে রসিক হতে হবে। রসিক হতে হলে গুরুর সাধন-ভজন করতে হবে।
ফকির মোতালেব শাহ বলেন, দোল পূর্ণিমায় উত্সবের আয়োজন করে ফকির লালন সাঁইজি হিন্দু-মুসলিম শুধু নয়; সব ধর্মের-সম্প্রদায়ের মানুষকেই একত্রিত করার চেষ্টা করেছিলেন। ধর্মের চেয়ে সাঁইজির নিকট ছিল মানুষ বড়; ধর্ম কিংবা জাত-পাতের মধ্য দিয়ে নয়, ঈশ্বরকে পেতে হলে, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করতে হলে জানা দরকার সুপথের সন্ধান। এজন্যই সাঁইজির উদার আহ্বান ‘সত্য বল সুপথে চল/ ওরে আমার মন।’
ছেঁউড়িয়ায় দোল উত্সব সম্পর্কে লালন গবেষক ড. অনুপম হাসান বলেন, বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁই জাতবিভেদ বিশ্বাস করতেন না। তিনি তার কাজের মধ্য দিয়েও সেটা প্রমাণ করেছেন। তিনি বলেন, সাঁইজি জীবদ্দশায় ফাল্গুনের শুভ পূর্ণিমা তিথি বা সৌর ফাল্গুনী পূর্ণিমায় এ উত্সবের আয়োজন করতেন। একালে সাঁইজির ভক্তকুল দোল উপলক্ষে তাঁর মাজার প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়ে গান, সাধুসঙ্গ, অধিবাস, যুগলান্ন প্রভৃতি অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করে উত্সবের মেজাজে। তিনি বলেন, আমরা জানি, লালনভক্তবৃন্দের কোনো বিশেষ ধর্ম-বর্ণ কিংবা জাত-পাতের বিভেদ নেই। ফলে দোল-উত্সবে সারাদেশের বিভিন্ন ধর্ম, শ্রেণী, পেশা ও বয়সের মানুষ ভিড় করেছে।
ফকির আজিজুল শাহ বলেন, দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে মহাগুরুর ধামে দোল উত্সবে আসি। যতোদিন বাঁচবো আসবোই। তিনি গুরু শব্দের অর্থ সম্পর্কে বলেন ‘গু’ অর্থ অন্ধকার আর ‘রু’ শব্দের অর্থ আলো। অর্থাত্ গুরুর কাজ হলো অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যাওয়া। মহাগুরু ফকির লালন সাঁইজি মানবকুলকে অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখিয়েছেন তাঁর গানের মধ্যে।
বাউল শব্দের অর্থ সম্পর্কে বাউল শুনিল বলেন, ‘বাউ’ মানে বাতাস। আর ‘উল’ শব্দের অর্থ সন্ধান করা। দেহের মাঝে যে বাতাস আসা যাওয়া করে তার সন্ধান পূর্বক সাধন সিদ্ধি লাভ করতে পারলেই বাউল হওয়া সম্ভব।
‘খাচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’ সম্পর্কে জামেলা ফকির বলেন, প্রতিটি মানুষের দেহ খাচা আছে। এই দেহ খাচার ভেতর যে শ্বাস প্রশ্বাস নামক পাখি আসা যাওয়া করে তারই নাম অচীন পাখি। এই অচীন পাখি আমার সাথেই থাকে, কথা বলে, কিন্তু ধরা দেয় না। সে কারণেই অচীন পাখি ধরা দেয় না।
ফকির জলিল শাহ বলেন, ফকির লালন সাঁই তাঁর গানের ভেতর দিয়ে সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের চেষ্টা করেছেন। তিনি বিশেষ এক মানবতাবাদী ধর্ম প্রচার করে গেছেন। এ দর্শনে মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখা হয়। জাতি ধর্ম বর্ণ গোত্রের বিচারে মানুষকে ছোট করে দেখা হয় না।
মহামতি ফকির লালনের মূল মাজারের সামনে মরা কলী নদীর তীরে স্থায়ী লালন মঞ্চে প্রতিদিন রাতভর চলছে স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় লালন সঙ্গীত। সরকারিভাবে বানানো মূল মঞ্চে প্রকৃত বাউলদের খুব একটা দেখা মেলেনি। তবে মূল মঞ্চে কে এলো আর না এলো, কে কতো বড় আর ছোটো এতে আগত সাধুদের কিছু যায় আসে না। তারা সব সময় সাঁইজির ধামে ধ্যানে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। গত বারের তুলনায় এবার খেলাফতপ্রাপ্ত সাধু-গুরুদের আখড়া বাড়িতে বেশি আগমন ঘটেছে। সারারাত সাধু ভক্তরা সাধুসঙ্গ আর মহাগুরু সাঁইজির স্মরণে ধ্যান করছেন। খুব সকালে সাঁইজি দরবারে ভক্তি পর্ব শেষে তারা চাল-জল নিয়ে স্নান করছেন কালী নদীতে। এরপর সেরে নিচ্ছেন বাল্য সেবা (সকালের নাস্তা)। পাশাপাশি ভক্তদের নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন আস্তানায় আসনে বসে লালন সাঁইজীর গান দিয়ে আরাধনায় ব্যস্ত থাকছেন তারা। এছাড়া একাধারে গানের পিঠে গান করছেন ভক্তরা। ভক্তের ভুল ত্রুটি ধরিয়ে দিচ্ছেন গুরু সাঁইজিরা।
রাজশাহী বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জিন্নাত নাসরিন লালন ভূমিতে এবার প্রথম এসে তার অনুভুতি প্রকাশ করে বলেন, ইতিপূর্বে শুধু টেলিভিশনেই দেখেছি। এবার সাঁইজির ধামে এসে ধন্য হলাম। তিনি বলেন, বাংলার মাটি বাউল রসে সিক্ত।
বৃহস্পতিবার রাতে লালন একাডেমির আয়োজনে কলীনদীর তীরে মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন কুষ্টিয়া-৪ কুমারখালি খোকসা আসনের সংসদ সদস্য আবদুর রউফ। সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন।