কিংবদন্তিদের পাশে মাহমুদুল্লাহ

 
বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে নিজের নামটা চিরস্থায়ী করে ফেলেছিলেন আগের ম্যাচে ১০৩ করেই। এবার ক্রিকেটের সর্বোচ্চ আসরেও নিজেকে স্মরণীয় করে রাখলেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে গতকাল অপরাজিত ১২৮ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলে স্থান করে নিয়েছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা সব ব্যাটসম্যানের সংক্ষিপ্ত এক তালিকায়। ইতিহাসের মাত্র অষ্টম ব্যাটসম্যান হিসাবে বিশ্বকাপে টানা দুই সেঞ্চুরির মালিক এখন রিয়াদ।
যেখানে তার সাথে আছেন কেবল কুমার সাঙ্গাকারা, রাহুল দ্রাবিড়, রিকি পন্টিং, মার্ক ওয়াহ, ম্যাথিউ হেইডেন, সাঈদ আনোয়ার এবং এবি ডি ভিলিয়ার্স।
প্রথম বাংলাদেশি হিসাবে বিশ্বকাপ সেঞ্চুরির ইতিহাস গড়ার দিনে অ্যাডিলেডে গত সোমবার প্রতিপক্ষ হিসাবে পেয়েছিলেন ইংল্যান্ডকে। গতকাল ভেন্যু আর প্রতিপক্ষ পাল্টে গেলেও রিয়াদ ধরে রাখলেন সেই ফর্মই। সেই ইস্পাত কঠিন স্নায়ু আর সেই নিঁখুত টেকনিক; ম্লান হয়ে গেল স্বাগতিকদের তেজস্বী পেস আক্রমণ। ট্রেন্ট বোল্ট, টিম সাউদি আর মিচেল ম্যাকক্লিনাঘ্যানের উপর রীতিমতো ছড়ি ঘুরিয়ে রিয়াদ তুলে নিলেন ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি। চলতি বিশ্বকাপ এবং ক্যারিয়ারেরও দ্বিতীয় সেঞ্চুরি এটি তার।
কেবল খারাপ করলেই খবরে আসছেন, সমালোচনার চাবুকে বিদ্ধ হচ্ছেন বারবার, মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছেন সাবেক অধিনায়ক মুশফিকুর রহীমের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের কারণে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিনিয়তই পরিণত হচ্ছেন হাস্যরসের খোরাকে। বিশ্বকাপের আগেও রিয়াদ বললে এমন একজনকেই বোঝাত।
তবে দুই একটি ঘটনা বাদ দিলে পুরো ক্যারিয়ার জুড়েই বিনয়ী আর হাস্যোজ্জ্বল এক ক্রিকেটারের পরিচয় দেয়া রিয়াদ কখনোই সেগুলোর প্রতিবাদ করতে মুখ খোলেননি। সেই সুযোগই হয়তো নিয়েছিলেন সমালোচকরা। তা না হলে বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে ঢাকায় ৩৩, ৮২ ও ৫১ রানের তিনটি অপরাজিত ইনিংস খেলার পরেও রিয়াদ ধারাবাহিক নন এমন অপবাদ কেন শুনতে হবে তাকে!
সব সমালোচনা আর তাকে নিয়ে বানানো সামাজিক মাধ্যমের কৌতুকের জবাব দিতে যেন ক্রিকেটের সর্বোচ্চ আসরটাকেই বেছে নিলেন রিয়াদ। মুখে নয়, বরাবরের মতো এবারও জবাব আসলো ব্যাট থেকেই।
রিয়াদের আগে দেশের পক্ষে টানা দুই সেঞ্চুরির রেকর্ড ছিল কেবল শাহরিয়ার নাফিসের। তবে জাতীয় দলের সাবেক এই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানের সেই দুই সেঞ্চুরি এসেছিল দুই টুর্নামেন্ট মিলে। প্রতিপক্ষ ছিল জিম্বাবুয়ে। প্রথমে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে আফ্রিকান এই দেশটির বিরুদ্ধে নাফিসের ব্যাট থেকে আসে ১২৩। এরপর দ্বিপক্ষীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচে করেন ১০৫।
তবে প্রতিপক্ষ আর টুর্নামেন্ট বিবেচনায় রিয়াদ নিশ্চিতভাবেই ছাড়িয়ে গেলেন নাফিসকে। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচ জয়ের ভিত্তি গড়ে দেয়া সেই ১০৩ রানের পর নিউজিল্যান্ডকেও প্রায় হারিয়েই দিচ্ছিল মাহমুদুল্লার দ্বিতীয় শতরান। শেষ পর্যন্ত সেটা না হলেও কেবল রিয়াদের ব্যক্তিগত অর্জনের কথা ভেবেই এই ম্যাচকে মনে রাখবে বাংলাদেশ ক্রিকেট। তিন উইকেটের হার ছাপিয়ে তাই বড় করে দেখা যাচ্ছে রিয়াদের ব্যক্তিগত অর্জন।
শচিন টেন্ডুলকার, ভিভ রিচার্ডস কিংবা ব্রায়ান লারার মতো কিংবদন্তিরা যেটা করতে পারেননি সেটাই করে দেখালেন তিনি। এই বিশ্বকাপেই টানা চার সেঞ্চুরি করে সবার উপরে থাকা সাঙ্গাকারা বাদে বিশ্বকাপে টানা দুই সেঞ্চুরি করতে পেরেছেন মাত্র সাত ব্যাটসম্যান। সেই তালিকায় আছেন তিন অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি মার্ক ওয়াহ, রিকি পন্টিং এবং ম্যাথিউ হেইডেন। আছেন দক্ষিণ আফ্রিকার এবি ডি ভিলিয়ার্স। ভারতের রাহুল দ্রাবিড় এবং পাকিস্তানের সাঈদ আনোয়ার। সর্বশেষ ব্যাটসম্যান হিসাবে সেখানে যুক্ত হলো রিয়াদের নাম।
চলতি টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত রিয়াদের ব্যাট থেকে এসেছে ৩৪৪। কোন একটি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ। মাত্র পাঁচ ম্যাচে এই রান করেছেন তিনি। চলতি বিশ্বকাপের চতুর্থ সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক তিনি। বাংলাদেশের পক্ষে এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডটি ছিল এতদিন মোহাম্মদ আশরাফুলের। ২০০৭ বিশ্বকাপে নয় ম্যাচে ২১৬ রান করেছিলেন ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগে নিষিদ্ধ হওয়া সাবেক এই অধিনায়ক।