‘পুলিশের পেশাদারিত্ব বাড়াতে স্বতন্ত্র কমিশন জরুরি’

 
 
 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সেমিনারে বক্তারা বলেছেন—প্রত্যেক সরকারের আমলে রাজনৈতিক দলগুলোর মতাদর্শের অনুগত পুলিশ অফিসাররা অগ্রাধিকার পান। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, উচ্চপদে তাদের মতাদর্শের অফিসাররা থাকেন। সরকার পরিবর্তন হলে আবার দৃশ্যপট পাল্টে যায়। অনেকেই ওএসডি কিংবা চাকরিচ্যূত হন। অথচ একজন পুলিশ অফিসারের পেছনে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। দেড় শ বছরের পুরোনো আইনে পুলিশকে জনগণের শাসক হিসেবে কাজ করার নির্দেশনা থাকাই হচ্ছে এর অন্যতম কারণ। সময় এসেছে এ আইন পরির্বতন করে পুলিশ বাহিনীকে আরো যুগোপযোগী করার। এতে পুলিশের পেশাদারিত্ব মান বাড়াতে পুলিশ আইন এবং স্বতন্ত্র পুলিশ কমিশন জরুরি।
শনিবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে এক সেমিনারে এ কথা বলেন সরকারের নীতিনির্ধারক ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিরা। ‘মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের অবদান এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষায় পুলিশের ভূমিকা’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘জার্নি’।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলেন, ‘বর্তমানে হরতাল-অবরোধের নামে বোমাহামলা করছে, বারবার পুলিশের উপর হামলা করছে। এরা একাত্তরের পরাজিত শক্তিরা, দেশকে একটি জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাইছে তারা।’
এইচ টি ইমাম বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে লেখক হুমায়ুন আজাদকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছিল, ঠিক একই ভাবে হত্যা করা হয়েছে মুক্তমনা লেখক অভিজিেক। হুমায়ুন আজাদের ঘটনাটির যথাযথভাবে বিচার হলে অভিজিতের ঘটনাটি ঘটত না।’
 তিনি আরো বলেন, ‘পুলিশের নাকের ডগায় অভিজিতের যে হত্যাকাণ্ডটি ঘটল, সেটি গ্রহণযোগ্য নয়। এ সময় তিনি দায়িত্বে গাফিলতির জন্য দায়ী পুলিশ সদস্যদের ব্যবস্থা নিতে বলেন। ’
এইচ টি ইমাম বলেন, ‘এ ঘটনা যারা করছে না, আমি ধরে নেব তারা এই সার্ভিসের ব্ল্যাকশিপ। এদের খুঁজে বের করুন, শাস্তি দিন। তাহলে পুলিশের ওপর গণমানুষের আস্থা ফিরে আসবে। মানবাধিকার লঙ্ঘনও হবে না।’
সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান বলেন, ‘জটিল ও কঠিন কাজগুলো পুলিশ করে থাকে। সবার ক্রুটি আছে। তাই পুলিশ বাহিনীরও ক্রুটি থাকতে পারে, তবে বিষয়টি অনেকেই অতিরঞ্জিত করে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ডাকসুর সাবেক ভিপি অধ্যাপক মাহফুজা খানম বলেন, পুলিশের পেশাদারিত্ব সংকট বহুমাত্রিক। পুলিশ সত্যিকারের জনগণের বন্ধু হতে ব্যর্থ। গণমাধ্যম পুলিশের নেতিবাচক বিষয়গুলো নজরে আসায় আড়ালে পড়ে যায় সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে পুলিশের সেবার বিষয়টি।
জার্নির প্রধান উপদেষ্টা ও ঢাবির বাণিজ্য অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. খন্দকার বজলুল হকের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) এ কে এম শহীদুল হক ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (প্রশাসন) মোখলেসুর রহমান, ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন প্রমুখ।
আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘দেশের স্বাধীনতা অর্জনে পুলিশ বাহিনী যেভাবে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছেন বর্তমানেও নাশকতা ও জঙ্গি দমনে তা অব্যাহত রেখেছে। আশা করি—আগামীতে তারা আরো বলিষ্ট ভূমিকা রাখবেন।’
এ কে এম শহীদুল হক বলেন, ‘দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান অনুযায়ী, যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তাদের এবং দেশের জনগণের সহায়তা করতে সব সময় প্রস্তুত পুলিশ বাহিনী। তবে অগণতান্ত্রিক উপায়ে কোনো অশুভ শক্তি ক্ষমতায় আসতে চাইলে তাদের কঠোর হস্তে দমন করা হবে। যেভাবে ২০১৩ সালে হেফাজত ইস্যুতে পুলিশ কাজ করেছে।’
তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়ার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কোর্ট ওয়ারেন্ট হলেও এখনো সংশ্লিষ্ট থানায় না আসার কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। ওয়ারেন্ট আসামাত্র তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। কারণ, আইন সবার জন্য সমান।’
মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সঠিকভাবে না চললে মানবাধিকারও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এতে পুলিশের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।’
আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘২০১৩ সালের ৫ মে স্বাধীনতা-বিরোধীরা দেশের গণতন্ত্রকে ভুল পথে পরিচালিত ও অর্থনৈতিক যাত্রা ব্যাহত হতে যে ষড়যন্ত্র করছিল, তা নস্যাত্ করে দিয়েছিল ডিএমপি পুলিশ। সে দিন পুলিশের পেশাদারিত্ব ও দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল। ঠিক তেমনি গত ৫ জানুয়ারি থেকে ২০ দলীয় জোটের অবরোধ-হরতালকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে পুলিশ। এরই মধ্যে তা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে পুলিশ।
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘দেশের কোনো প্রতিষ্ঠান ক্রুটি-বিচ্যুতির বাইরে নয়। কিন্তু পুলিশ বাহিনী একটি জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ—১৮৬১ সালের আইন অনুযায়ী এ পুলিশ বাহিনী চলছে। তাই সময় এসেছে এ আইন পরির্বতন করে কীভাবে পুলিশ বাহিনীকে আরো যুগোপযোগী করা যায়।’