রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া জনগণের কল্যাণ সম্ভব নয়: আনোয়ার হোসেন মঞ্জু

পরিবেশ ও বন মন্ত্রী এবং জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে মানুষের প্রয়োজনীয় উন্নয়নে গৃহীত কোন কাজই সঠিকভাবে সম্পাদন করা যায় না। আমাদের দেশে সরকার সীমিত সম্পদ নিয়ে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করে বলে বিরাজিত প্রতিবন্ধকতা-প্রতিকূলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া দুরূহ হয়ে পড়ে। অস্থিরতা ছাড়াও বরাদ্দকৃত সম্পদের সদ্ব্যবহারের সীমাবদ্ধতার জন্য শেষতক জনগণই ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়। এ অবস্থা নিরসনে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

মন্ত্রী গতকাল রবিবার পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি মতবিনিময় সভায় আরো বলেন, ১৯৭২ সালে স্বাধীনতা পরবর্তী কালে আমাদের অনেক কিছুই ছিল না। আজ গর্ব করার মতো প্রভূত অবকাঠোমোগত দিক গড়ে উঠেছে। এ এলাকাসহ প্রত্যন্ত দুর্গম এলাকায় রাস্তা-ঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য সেবা, বিদ্যুত্, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, হাট-বাজার তৈরি হয়েছে। নিভৃত গ্রামের মানুষ এর ন্যূনতম সুবিধা পাচ্ছেন। গ্রামে গ্রামে ক্যাবল নেটওয়ার্ক, মোবাইল নেটওয়ার্ক মানুষের দ্বারে দ্বারে, হাতে হাতে। সরকারের একার পক্ষে এ বিশাল অগ্রগতি সম্পাদন সম্ভব হয় না। যে সরকারি বরাদ্দ পাওয়া যায় তা প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। এর জন্য বেসরকারি ব্যক্তি উদ্যোগের বিকল্প নেই। দেশ-বিদেশের দাতা সহায়তা এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আমাদের উন্নয়ন কাজ করতে হবে।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, সরকারি যে বরাদ্দ পাওয়া যায় তার একটি বড় অংশ আবার আত্মসাত্-অপচয়ের মধ্য দিয়ে বিনষ্ট হয়। এ লাভের গুড় পিঁপড়ায় খাওয়ার প্রবণতা রোধ করা গেলে সম্পদের নিঃসরণ বন্ধ করা যেত। মানুষের সচেতনতা বোধ তথা অধিকার রক্ষার মানসিকতা সৃষ্টি না হলে সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে না। এখন ঢাকায় যা চলছে তা অব্যাহত থাকলে মানুষের প্রয়োজনে অনেক কিছুই করা যাবে না। দেশের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হলে, পরিস্থিতি শান্ত হলে বিদ্যুত্সহ এলাকার মানুষের বিভিন্ন চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। অথচ যারা দেশ পরিচালনা করে তাদেরকে সুস্থভাবে কাজ করতে দেয়া হচ্ছে না। মানুষ তার ভাগ্যের পরিবর্তন চায়। আগে মানুষ রাস্তা-ঘাট চাইত। তখন গ্রামের লোকজন সন্ধ্যার পর ঘুমাত,  এখন ১২টা পর্যন্ত রাত জেগে টিভিতে টকশো দেখে বলে মানুষ বিদ্যুত্ চায়। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার জন্য বৈদ্যুতিক আলো চায়। সন্তানদের ভাল করে লেখা-পড়া শিখিয়ে বড় করে এলাকার উন্নয়ন করার জন্য তৈরি করতে হবে। আমাদের দক্ষিণাঞ্চলে জনগণের কণ্ঠস্বর দুর্বল ছিল, এটা শক্তিশালী করতে হবে।
মন্ত্রী জিয়ানগর উপজেলার বালিপাড়া ইউনিয়নের উত্তর কলারণ গ্রামের দুইটি মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন। এসব সভায় বালিপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা জেপির সদস্য সচিব মশিউর রহমান মঞ্জু সভাপতিত্ব করেন। সভায় আরো বক্তব্য রাখেন ইউপি সদস্য ইউসুফ আলী জোমাদ্দার ও মিজানুর রহমান, সমাজ সেবক ড. ইব্রাহীম জোমাদ্দার প্রমুখ। এ সময় উপজেলা জেপির সভাপতি ও পত্তার্শী ইউপি চেয়ারম্যান আসাদুল কবির স্বপনসহ স্থানীয় জেপি নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সভা দুইটির আগে মন্ত্রী পৃথকভাবে বালিপাড়া ইউনিয়নের খোলপটুয়া-মুন্সিরহাট-জোমাদ্দারহাট-উত্তর কলারণ রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় সড়ক উন্নয়ন কাজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন এবং উত্তর কলারণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-কাম-সাইক্লোন শেল্টারের নির্মাণ কাজ সমাপ্তির দোয়ায় অংশ নেন।
মন্ত্রী গতকাল বিকালে জিয়ানগর উপজেলা কমপ্লেক্সে কৃষি ও প্রযুক্তি মেলার উদ্বোধন করেন। এ সময় পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক এ কে এম শামিমুল হক ছিদ্দিকী, জিয়ানগর উপজেলা চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদী, ভারপ্রাপ্ত ইউএনও জাহাঙ্গীর হোসেন, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ফাইজুল কবির তালুকদার, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান সাহিদা বেগম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
মন্ত্রী এখানে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে প্রাপ্ত আর্থিক অনুদানের চেক এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রীর ঐচ্ছিক তহবিল থেকে সুবিধা বঞ্চিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনুদানের চেক বিতরণ করেন। দুপুরে তিনি এ উপজেলার পাড়েরহাট ইউনিয়নের টগড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-কাম-সাইক্লোন শেল্টারের নির্মাণ কাজ সমাপ্তির দোয়ায় অংশ নেন।
ভান্ডারিয়া সংবাদদাতা কে এম ফজলুর রহমান জানান, পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু গতকাল বিকালে ও রাতে ভান্ডারিয়া উপজেলার কাটাখালী কঁচানদীর ভেড়িবাঁধ-হেতালিয়া-নেছারিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সড়ক উন্নয়ন, দারুল হুদা সওজ সড়ক-সরদার বাড়ী ভায়া আব্দুল তালুকদার বাড়ী পর্যন্ত সড়ক, ধাওয়া ইউপি-বোথলা বাজার ভায়া বীণাপাণি বাজার সড়ক, ইকড়ি স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র সড়ক (কার্পেটিং) এবং চারখালী-মঠবাড়িয়া সওজ সড়ক থেকে মতি তালুকদারের বাড়ী ভায়া মিরাজ হাওলাদারের বাড়ী ও ৩৬ নং প্রাথমিক বিদ্যালয় সড়ক উন্নয়ন কাজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন এবং সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সব কর্মসূচিতে উপজেলা চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম তালুকদার উজ্জল, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটি সহ- সম্পাদক মহিউদ্দিন মহারাজ, ভান্ডারিয়ার ইউএনও মনির হোসেন হাওলাদার, সদর ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম সরওয়ার জোমাদ্দার, নদমুলা-শিয়ালকাঠি ইউপি চেয়ারম্যান শফিকুল কবির বাবুল তালুকদার, ধাওয়া ইউপি চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান টুলু, ইকড়ি ইউপি চেয়ারম্যান তানভীর হোসেন তালুকদার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। 
ভান্ডারিয়া সংবাদদাতা আরও জানান, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু শনিবার রাতে ভান্ডারিয়া উপজেলার ধাওয়া রাজপাশা আদর্শ মাধ্যমিক ও কারিগরি বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, সন্ত্রাস-আইন ভঙ্গ কোন ক্রমেই কাম্য নয়। ভোটের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, তাই স্থিতিশীলতা আনতে হবে। এখনও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসে নাই। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা মানে একটি দল হয়ত সব সময় ক্ষমতায় থাকবে বা থাকবে না। কিন্তু প্রতি পাঁচ বছর পর ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় আসলে সেই সময়ে শান্তিপূর্ণ ভাবে তা করতে যেন সক্ষম হই। যে দেশে রাজনীতিবিদরা নিরাপত্তা দিতে পারে না আমি মনে করি সেই রাজনীতিবিদদের সম্মিলিত ভাবে স্বীকার করে নেয়া উচিত তারা ব্যর্থ হয়েছেন। দেশ পরিচালনায় ভিন্ন চিন্তা, ভিন্ন কৌশল থাকতে পারে কিন্তু স্থিতিশীলতার ব্যাপারে সকলে ঐক্যবদ্ধ না থাকলে যতই দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের কথা বা তাদের সহায়তার কথা বলি আমাদের দ্বারা কিছু অর্জিত হবে বলে আমি অন্তত মনে করি না।
আনোয়ার হোসেন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, সুন্দরভাবে লেখাপড়া করতে হবে। কারণ এই পৃথিবী অনেক নিষ্ঠুর অত্যন্ত নির্মম, তার মধ্যে এখানে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হয়। এই প্রতিযোগিতায় ব্যর্থতার কোন অবকাশ নেই। আর যদি সফলতাকে নিশ্চিত করতে হয় তা হলে সুশিক্ষার কোন বিকল্প নেই।
অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ধাওয়া ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ সিদ্দিকুর রহমান টুলু’র সভাপতিত্বে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ভান্ডারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম তালুকদার উজ্জল, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক মোঃ মহিউদ্দিন মহারাজ, টুঙ্গিপাড়া আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক হাফিজুর রশিদ তারিক জোমাদ্দার প্রমুখ। এসময় ভান্ডারিয়ার ইউএনও মোহাম্মদ মনির হোসেন হাওলাদার, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ মিরাজুল ইসলাম, ওসি শেখ মোহাম্মদ আবু যাহিদ, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফাইজুর রশিদ খসরু জোমাদ্দার, ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম সরওয়ার জোমাদ্দার, মশিউর রহমান মৃধা, তানভির হোসেন বাবু তালুকদার ও বদিউজ্জামান টিপু, সমাজ সেবক মোঃ আবুল কালাম পোদ্দার, ইউসুফ আলী আকন, মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার হোসেন বেপারি, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলহাজ্ব মজিবুর রহমান বাদশা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রভাষক মোঃ মাসুদুজ্জামান। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অভিনয়, সঙ্গীত ও নৃত্য পরিবেশন করেন শিক্ষার্থী কথা হাওলাদার, মারিয়া, লামিয়া, দোলা, নোমান, সীমা, দলীয় নৃত্যে মিম, মিমি, সুমাইয়া, জহুরা, অর্পা, তানজিম, ইকরা ছাড়াও ঢাকার অতিথি শিল্পী কনক চাঁপাসহ অন্য শিল্পীরা। এ মনোমুগ্ধকর অনুষ্ঠান উপভোগ করেন নানা বয়সের কয়েক হাজার মানুষ। স্থানীয় সংবাদ উপস্থাপন করেন শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার। অনুষ্ঠানটি ভান্ডারিয়াসহ পার্শ্ববর্তী কয়েক উপজেলায় ক্যাবল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সমপ্রচার করা হয়।