আমাদের ক্যাপ্টেন

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে নিজেদের শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জিততে জিততে হেরে গেলেও, প্রশংসায় ভাসছে বাংলাদেশ। মাত্র যখন খেলা শেষ হলো, ওদিকে আফগানিস্তান-ইংল্যান্ডের ম্যাচ তখন বৃষ্টির কারণে বন্ধ হয়ে রয়েছে। কী করা, ধারাভাষ্যকাররা তখন বসে গেলেন এই ম্যাচ নিয়েই। বাংলাদেশ নিয়ে এসব আলোচনা করার এক পর্যায়ে ক্যারিবীয় সাবেক পেসার ইয়ান বিশপ বলেন, ‘মুশফিকুর রহিমের মতো ব্যাটসম্যানের কাঁধ থেকে ওয়ানডে অধিনায়কত্বের বোঝা নামিয়ে সঠিক কাজই করেছে বিসিবি। মাশরাফির নেতৃত্বে বাংলাদেশ দলটি এই মুহূর্তে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী।’ তবে এখানে কিন্তু মুশফিককে ছোট করেননি একটুও। বরং অধিনায়কত্ব ছাড়ার পর মুশফিকের তার ব্যাটিং পারদর্শিতায় যুক্ত হয়েছে নতুন পালক। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের বর্তমান দলেরও প্রশংসা করেন তিনি। মুশফিকুর রহিমকে ওয়ানডে অধিনায়ক হতে সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে কম পানি ঘোলা হয়নি। তবে তাকে সরিয়ে যখন মাশরাফি বিন মর্তুজাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো, স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো কথা থাকেনি। থাকার কথাও নয়। দলের প্রতি এমন নিবেদিত প্রাণ ক্রিকেটার আর কোথাও আছে বলে শোনা যায় না।
অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে ওভালে ইংল্যান্ডকে ১৫ রানে হারিয়ে গোটা ওভাল ছেয়ে যায় লাল-সবুজে। ম্যাচসেরা পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে জাতীয় দলের পতাকা মাথায় বেঁধে হাজির হয়েছিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। পতাকাটা কে তার মাথায় বেঁধে দিয়েছিলেন, তা অবশ্যই জানা যায়নি। বাংলাদেশকে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বের মঞ্চে তুলে দেওয়ার পর মুখে চিরচেনা সেই মিষ্টি হাসি। এমন একটি জয়ের কৃতিত্ব নিজ দলের মাঝে ভাগ করে দিলেও তা উত্সর্গ করলেন সমর্থকদের উদ্দেশেই। মাশরাফি বলেন, ‘দেশ থেকে বা এখানে এসে যারা আমাদের সমর্থন জুগিয়েছেন, পাশে ছিলেন, যারা আমাদের এই পর্যায়ে দেখার স্বপ্ন বুনেছিলেন তাদের সবাইকে জানাচ্ছি আন্তরিক ধন্যবাদ। এই জয়টা তাদের জন্য।’ ইংল্যান্ডের সাবেক ক্রিকেটার ও বর্তমানের ধারাভাষ্যকার নিক নাইটকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে মাশরাফি বলেন, ‘এই জয় আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য উত্সর্গ করলাম’। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নিজেদের কাজের ফাঁকে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটি যারা দেখেছেন এবং ক্রিকেট-পাগল বাংলাদেশের মানুষদের ধন্যবাদ। এই সাফল্য আপনাদের জন্য। দেশে আমাদের মানুষ, যারা কঠোর পরিশ্রম করেন; এই সাফল্য তাদের জন্যও।’ গুরুত্বপূর্ণ কাজের ফাঁকে গ্যালারিতে উপস্থিত হয়ে খেলা দেখা এবং খেলোয়াড়দের উত্সাহিত করার জন্য অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশি প্রবাসীদেরও ধন্যবাদ জানান নড়াইল এক্সপ্রেস। একজন অধিনায়ক এমনই করে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে রাখেন তার দলকে, তার সমর্থকদের। খেলা বা অনুশীলনের বাইরেও একজন অধিনায়কের ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তার চাল-চলন, আচার-ব্যবহার, লাইফ স্টাইল সবই পুরো দলের ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলে। তার নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলাবোধ, পেশাদারিত্ব, মাঠে কাজ করার নিষ্ঠা, দলের প্রতি মমত্ববোধ, দেশপ্রেম—এ সবকিছুই দলের সবার জন্য অনুপ্রেরণার উত্স। তাকে হতে হয় একজন আদর্শ। পেশাদারিত্ব কথাটার অর্থ কিছুটা ব্যাপক। অধিনায়ক তার মেধার প্রকাশ, চর্চা ও দায়িত্ব পালন করে থাকেন। এভাবেই দলের রণকৌশলে অধিনায়ক তার ভূমিকা পালন করেন। ফলে তার কাজের ক্ষেত্র ব্যাপক, ভূমিকা বেশি, ক্ষমতাও বেশি। ক্রিকেট দলের অধিনায়কের যথার্থ কার্যকারিতার জন্য দলের প্রত্যেকের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা, নিজের প্রতি আস্থা ও সমর্থনের প্রয়োজনীয়তাটা ব্যাপক। তার প্রতিটি লক্ষ্যই অর্জন করতে সমর্থ হয়েছেন আমাদের অধিনায়ক। সময়ের সাথে সাথে মাশরাফি নিজেকে বদলেছেন সেই সাথে বদলেছেন দলকেও। সামনে নেতৃত্ব দিয়ে বাড়িয়েছেন দলে আত্মবিশ্বাস। 
বারবার বাধা পেয়েও যুদ্ধ করে সে ফিরে আসা আমাদের জাতিগত ইতিহাস। মাসরাফি যেন তারই আদলে গড়া। হাঁটুতে বেশ কয়েকটা অপারেশনের পরও খেলে যাচ্ছেন, সেই সাথে অধিনায়কত্ব করছেন সমানতালে। কারণ এরচেয়ে অনেক কমবার অপারেশন করিয়েই অনেক ক্রিকেটারকে খেলা ছেড়ে দিতে হয়েছিল। মাশরাফির এখনো খেলে যাওয়া তার চিকিত্সকের কাছেও এক বিস্ময়। এত কিছুর পরও তার অনেক শারীরিক ও সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা নিয়েও দেশের জন্য খেলার তার যে প্রচেষ্টা তা উল্লেখ করার মতো। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে রেকর্ড গড়া ম্যাচে ইনজুরি নিয়েও খেলে যাওয়া এবং খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে যেভাবে বল করল কিংবা ফিল্ডিং করল, সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দিল। সেখানে দেশপ্রেম ছিল বলা যায় নিঃসন্দেহে। মাশরাফি ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে, সে শুধু বাংলাদেশি ক্রিকেটার নয়, বিশ্বের সকল ক্রিকেটারের জন্য অনুকরণীয়।
আমরা তোমাকে নিয়ে গর্ব করি ক্যাপ্টেন, আমরা গর্ব করি বাংলাদেশকে নিয়ে।