গরম পড়ার সাথে সাথে মশার উত্পাতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে নগরবাসী। দিনের আলোতে কিছুটা রক্ষা পেলেও রাতের পরিস্থিতি ভয়াবহ। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অবস্থা আবাসিক এলাকাগুলোতে। ছেলেমেয়েরা রাতেরবেলা মশার উত্পাতে পড়াশুনায় ঠিকভাবে মনোযোগ দিতে পারছে না। শুধু তাই নয়, অফিস-আদালতগুলোর ভবনেও মশার কারণে কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে। ফলে মশাবাহিত রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মশা নিধনে তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। দেখা মিলছে না মশা নিধনকর্মীদেরও। অথচ মশা নিধনে দুই সিটি করপোরেশনে বরাদ্দ ২০ কোটি ৩০ লাখ টাকা। নগরবাসীর অভিযোগ, মশার উপদ্রবে রাতে ঠিকমতো ঘুমানো যায় না। নিয়মিত মশা নিধন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছরই মশা নিধনের জন্য বড় অংকের অর্থ বরাদ্দ থাকে। চলতি অর্থবছরে (২০১৪-১৫) ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মশা নিধন কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১০ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ওষুধ কেনার জন্য ৮ কোটি টাকা, পুকুর-ডোবা ও জলাশয়ের কচুরিপানা, আগাছা পরিষ্কার ও পরিচর্যার জন্য ১ কোটি টাকা, ফগার, হুইল, স্প্রে মেশিন ও পরিবহনে জ্বালানি খরচ বাবদ ১ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ। এছাড়া আনুষঙ্গিক কাজে আরো ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। আর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে মশক নিধন ওষুধ এবং নিধন কর্মচারীদের পোশাক ও সুরক্ষার জন্য ৭ কোটি টাকা, কচুরিপানা, আগাছা পরিষ্কার ও পরিচর্যার জন্য ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং ফগার, হুইল, স্প্রে মেশিন ও পরিবহনে জ্বালানি খাতে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ। এ হিসাবে দুই সিটি করপোরেশনের মোট বরাদ্দ ২০ কোটি ৩০ লাখ টাকা। সেই অনুযায়ী গড়ে প্রতিমাসে বাজেট দাঁড়ায় ১ কোটি ৬৯ লাখ ১৭ হাজার টাকা।
দুই সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, সংস্থা দু’টির মশক নিধনের জন্য ৬৩৮ জন কর্মী ও পাঁচ শতাধিক উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ফগার মেশিন রয়েছে। শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত মশার ডিম বিনষ্টে লার্ভিসাইডিং এবং বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত উড়ন্ত মশক নিধনে তাদের কার্যক্রম চালানোর কথা।
ডিএসসিসি বলছে, সংস্থাটির আওতায় ৫৭টি ওয়ার্ডে গত ১৯ অক্টোবর থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত মশা নিধনের জন্য ক্র্যাশ প্রোগ্রামও চালানো হয়েছে। কিন্তু নগরবাসী বলছেন, তারা এসব কার্যক্রমের কিছুই দেখেননি। সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, বছরের প্রায় সবসময় রাজধানী ঢাকায় কম-বেশি মশার উত্পাত থাকে। নগরীর পুকুর, ডোবা ও লেকগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করার কারণে মশার বংশ বৃদ্ধি হচ্ছে নির্বিঘ্নে।
পুরান ঢাকার ১ নং শশীমোহন বসাক লেনের বাসিন্দা গোবিন্দ চন্দ্র দে বলেন, বর্তমানে সিটি করপোরেশনের অবস্থা দেখে বুঝা যায় আমাদের সিটি আছে, কিন্তু করপোরেশন নেই। তাদেরকে শুধু ট্যাক্সের টাকা আদায়ের সময় দেখা মেলে। কিন্তু আর পুরো বছর দেখা মেলে না। তিনি বলেন, শুধু মশা নয়, বর্জ্যের গন্ধেও এলাকায় থাকা যায় না।
গুলশানের বাসিন্দা কামরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, প্রতিবছর দেখি মশা মারার খাতে সিটি করপোরেশনের সর্বোচ্চ বরাদ্দ। কিন্তু এতো টাকা বরাদ্দ দিলেও কেন মশা মরে না?
তিনি বলেন, মশার জন্য ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। করপোরেশনের মধ্যে থাকা মশার মতো বড় ভূতদের তাড়াতে পারলেই নগরবাসী আসল মশা থেকে মুক্তি পাবে।
আরামবাগের স্কুল শিক্ষার্থী রিতা আক্তার বলেন, সন্ধ্যার পর আমরা বাসায় পড়তে পারি না। কয়েল জ্বালালেও মশার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি মেলে না। আম্মু সারাক্ষণ পাশে বসে থেকে মশা তাড়ান। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. একেএম মাসুদ হাসান বলেন, আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়েই মশা নিধন করছি। তবে নগরীতে ব্যক্তিমালিকানাধীন পুকুর ও জলাশয়ের কারণে মশা নিধনে কিছুটা বিঘ্ন ঘটছে। তাদেরকে কচুরিপানা পরিষ্কার করতে বারবার বলেও কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এরপরও আমরা নিয়মিত কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছি।
অপরদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. মাহবুবুর রহমান দাবি করেন, মশা নিধনে আমাদের কর্মীরা নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। এর আগেও আমরা সপ্তাহব্যাপী মশা মারার কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। এ খাতে বরাদ্দ দেয়া টাকা সঠিকভাবেই ব্যয় হচ্ছে।