এ কেমন ‘যাদু’ দেখালেন পুতিন!

 
গত সপ্তাহজুড়ে এটাই ছিল ইউরোপের সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন। কোথায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। কারণ টানা ১০ দিন লাপাত্তা ছিলেন রাশিয়ার এই ডাকসাইটে নেতা। ওই দশদিনের মধ্যে একবারের জন্যও প্রকাশ্যে কোথাও দেখা যায়নি তাকে। বিশ্বের বাঘা বাঘা সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের চোখ ফাঁকি দিয়ে কোন যাদুবলে অদৃশ্য হয়ে ছিলেন তিনি। অনেকে মজা করে বলছেন, এত দীর্ঘ সময় ধরে অদৃশ্য হওয়ার ‘মন্ত্র’ ডেভিড কপারফিল্ডও জানতেন কি না সন্দেহ!
এই কারণে ইউরোপ-আমেরিকার বিখ্যাত গণমাধ্যমগুলোর প্রধান শিরোনাম হয়ে ওঠে পুতিনের নিখোঁজ হবার খবর। বিবিসি, সিএনএনের মতো সংবাদমাধ্যম যখন খবর প্রকাশ করে পুতিনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না তখন মানুষ বিশ্বাস না করে পারে না। কারণ ওইসব গণমাধ্যমের খবরের সোর্স অনেক শক্তিশালী। তারাই যখন পুতিনের সন্ধান দিতে পারছিলেন না তখন পুতিন সত্যি সত্যিই ‘অন্তর্ধান’ হয়ে গেছেন বলে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল অনেকে।
পুতিনের ক্ষেত্রে এমনটা আগে কখনো হয়নি। তাই গুজবের খাতায় কত কিছু যে উঠেছিল। পুতিনের ‘অন্তর্ধানের’ রহস্য খুঁজতেই নাকি ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল রাশিয়াসহ ইউরোপের জনতা!  ইউরোপের পত্র-পত্রিকাগুলোও যথারীতি কানাঘুষা শুরু করে দিয়েছিল। নানা উত্তরও ভেসে বেড়াতে থাকে বাতাসে। তবে সেগুলো প্রশ্নের জবাব, নাকি আরো বড় গুজব তা কারো মাথায় আসছিল না।
ব্রিটেনের জনপ্রিয় অনলাইন দৈনিক ডেইলি মেইল গত শনিবার দাবি করে, অজানা এক জ্বরে ভুগছেন পুতিন। এমন এক জ্বর যা একবার হলে আর প্রাণ বাঁচানো সম্ভব নয়! তাই পুতিন আর সামনে আসছেন না। কখন পৃথিবীকে বিদায় জানাবেন সেই অপেক্ষা করছেন! আরেকটি পত্রিকায় বলা হয়, ‘প্রেমিকার সন্তানকে দেখতে সুইজারল্যান্ডে উড়ে গেছেন প্রেসিডেন্ট।’ অলিম্পিক শরীরচর্চা প্রতিযোগিতায় রাশিয়ার হয়ে দু’বার অংশ নেয়া এলিনা কাবায়েভার সঙ্গে পুতিনের প্রেমের গুজব অনেক দিনের। ধারণা করা হয়, এলিনার প্রেমে পড়েই পুতিন গত বছর তার স্ত্রী লুদমিলার সাথে ৩০ বছরের বিবাহিত জীবনের ইতি টেনেছিলেন।
গত শুক্রবার নিউ ইয়র্ক পোস্ট পত্রিকা পুতিন আর তার প্রেমিকার ছবি প্রকাশ করে শিরোনাম করে- ‘মেয়ে হয়েছে!’ পরদিন পত্রিকাটি পুতিনের নিখোঁজ হবার রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে দাবি করে, সেই মেয়েকে দেখতে পুতিন অতি গোপনে সেখানে গেছেন। ডেইলি বিস্টের বরাত দিয়ে সুইস রেডিও আরএসআই জানায়, ‘অতিসুরক্ষিত’ ওই ক্লিনিকে পুতিন দুটি কামরা নিয়েছেন। একটি কাবায়েভার জন্য, আরেকটি তার দেহরক্ষীদের জন্য।
যুক্তরাজ্যের অনলাইন মেট্রো তার প্রতিবেদনে দাবি করে- জ্বর নয়, হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়েছেন পুতিন। তাই প্রকাশ্যে আসার মতো পরিস্থিতি নেই। জনগণ যাতে ভেবে না বসে প্রেসিডেন্ট আর বোধহয় ফিরবেন না, সেই জন্য কাউকে জানতে দেয়া হয়নি হার্ট অ্যাটাকের খবর। তাহলে অসুস্থ পুতিনকে আগামীতে আর ভোট নাও দিতে পারে জনগণ! নিতান্ত যদি মারাই যান তখন না হয় খবরটি প্রকাশ করা যাবে। ক্রেমলিনের ভেতরে অ্যাম্বুলেন্স ঢুকছে এমন ছবি দিয়ে পত্রিকাটি দাবি করেছে, রাশিয়ার কয়েকজন হূদরোগ সার্জনকে নাকি তলব করা হয়েছে প্রেসিডেন্টের বাসভবনে। আবার কিছু পত্রিকা এমন খবরও প্রকাশ করে, ‘সেনাবিদ্রোহ’ ঘটেছে রাশিয়ায়।  তাই ক্রেমলিনে বন্দী হয়ে পড়েছেন গত ১৫ বছরের রুশ প্রেসিডেন্ট।
আরো একধাপ এগিয়ে ‘প্রেসিডেন্ট আর বেঁচে নেই’-এমনও লিখে ফেলে ইউরোপের ট্যাবলয়েডগুলো। সুইডেন ও ইউক্রেনের সংবাদপত্রে মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়েছে-এমনটি দাবি করে ব্রিটেনের দ্য মিরর। ‘সুঠাম প্রেসিডেন্টের’ ৬২ বছর বয়সে ‘অকালমৃত্যুর’ খবরটি নাকি আড়াল করা হচ্ছে বিশ্ব গণমাধ্যম থেকে- এমন দাবিও করে মিরর।
অবশ্য গুজব জোরদার হতেই নড়েচড়ে বসে ক্রেমলিন। তড়িঘড়ি করে গত সপ্তাহে রুশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে প্রেসিডেন্টের বৈঠকের কিছু ছবি প্রকাশ করা হয়। বলা হয়, ছবিগুলো শুক্রবার তোলা। তবে ছবি প্রকাশের কিছুক্ষণ পর সামাজিক যোগাযোগের গণমাধ্যমে গত ৪ মার্চে একই ভঙ্গিতে, একই পোশাকে, একই ব্যক্তির সাথে পুতিনের তোলা অপর একটি ছবি ছড়িয়ে যায়। দেশটির সরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘রাশিয়া ২৪’ পুতিনের বৈঠকের একটি ভিডিও সমপ্রচার করে। তবে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্রসহ অন্য পত্রিকাগুলো এ ব্যাপারে নিশ্চুপ ছিল, যা সন্দেহ বাড়িয়ে দিচ্ছিল আরো।
কেবল পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি এস পেসকভ প্রেসিডেন্টের নিখোঁজ হওয়ার খবরকে নিছকই গুজব বলে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘পুতিন ভালো আছেন।’ রাশিয়ার সংবাদপত্র ফোর্বস রাশিয়াকে তিনি বলেন, ‘ভাবছি রুশ ধনীদের বলব গুজব ছড়ানোর সংবাদ তৈরির একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে।’ তবে পেসকভ এভাবে বিদ্রূপ করলেও তিনিও সেদিন বলেননি তাদের প্রেসিডেন্ট কোথায় আছেন।
পত্রিকাগুলোর রিপোর্টে বলা হয়, পুতিনকে নিয়ে এমন গুজব ছড়াচ্ছিল কারণ সর্বশেষ গত ৫ মার্চ সকালে ইতালির প্রধানমন্ত্রী মাত্তিও রেনজির সাথে এক বৈঠকে দেখা গেছে তাকে। এরপর হঠাত্ করে কাজাখস্তানে এক গুরুত্বপূর্ণ সফর বাতিল করেন পুতিন। ৭ মার্চ স্থগিত করা হয় মস্কোয় অনুষ্ঠিতব্য দক্ষিণ ওশেনিয়ার প্রতিনিধিদের পূর্বনির্ধারিত এক চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান। প্রতিনিধিদের মস্কো যেতে নিষেধ করা হয়েছিল অনুষ্ঠানের আগের দিন। এমনকি রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবির শীর্ষ কর্মকর্তাদের  নির্ধারিত বার্ষিক সভায় দেখা মেলেনি তার। এরপর কার সাধ্য ছিল গুজব ঠেকিয়ে রাখবে!
কেবল মিডিয়া নয়, ফেসবুক-টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতেও পুতিনকে নিয়ে রসালো সব আলোচনা শুরু হয়। ফটোশপ ব্যবহার করে তৈরি করা হয় মজার মজার সব পোস্টার, প্ল্যাকার্ড। একটি ছবিতে দেখা যায়, কাটঠোকরার পিঠে বসে আছে এক বেজি, তার উপর লাগাম ধরে উড়ে পালাচ্ছেন পুতিন। তবে সবচেয়ে বেশি গুজব ছড়ায় পুতিনের স্বাস্থ্যগত সমস্যা নিয়ে। কোনো কোনো ছবিতে দেখা যায়, গোপনে পুতিনের শেষকৃত্য সারা হচ্ছে। আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, দেয়ালে দেয়ালে সাঁটা হয়েছে একটি ‘নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি’। ডাস্টবিনের গায়ে লাগানো হয়েছে এমন একটি পোস্টারে পুতিনের ছবির নিচে লেখা, ‘আমি নিখোঁজ, কেউ কি আমাকে দেখেছ? দেখলে ফোন করুন এই নাম্বারে’! নিচে একটি ফোন নাম্বার দেয়া।
তবে সব গুজবের অবসান ঘটাতে গত সোমবার তার নিজের শহর সেন্ট পিটার্সবার্গের বাইরে কনস্ট্যানটিন প্যালেসে কিরঘিজ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রকাশ্যে এক বৈঠকে মিলিত হন। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নে হেসে বলেন, গুজব না ছড়ালে জীবনটাই নিরামিষ হয়ে যায়। কিন্তু তবুও তিনি বলেননি যে কোথায় ছিলেন এই দশ দিন যেখানে কেউ তাকে দেখতে পেল না! কোন যাদুবলে তিনি এভাবে পৃথিবীর সবার কাছ থেকে দশ দিন নিজেকে লুকিয়ে রাখতে সক্ষম হলেন তা এক রহস্য হয়েই থাকলো প্রযুক্তির এই স্বর্ণযুগেও।