রংপুরে বাম্পার ফলনের পরেও আলু চাষিদের মাথায় হাত


রংপুরে লক্ষ্যমাত্রার বেশি ও বাম্পার ফলন হলেও বাজারমূল্য কম থাকায় আলু চাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। উত্পাদন খরচ তুলতে পারছেন না, লাখ লাখ টাকার লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আলুর রপ্তানি কমে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা। পরিবহন সংকটে সরবরাহ খরচ দ্বিগুণ হওয়ায় আলুর ব্যবসায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন এজেন্টরা।
বাংলাদেশ থেকে আলু আমদানি করতে রাশিয়ার দেয়া শর্ত এবং নেপালের অনাগ্রহে কিছুটা বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় আলু রপ্তানিকারকরা। রংপুর থেকে আলু সংগ্রহ করে গত বছর প্রায় ৩ লাখ টন আলু রাশিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরে রপ্তানি করা হলেও চলতি মৌসুমে আলু রপ্তানিতে তোড়জোড় নেই রপ্তানিকারকদের মধ্যে। চলতি মৌসুমের শুরুতে রংপুর থেকে অনেকটাই ধীরগতিতে চলছে আলু রপ্তানির কার্যক্রম। গুটিকয়েক রপ্তানিকারক আলু সংগ্রহ শুরু করেছেন এবং এ পর্যন্ত প্রায় ৮০ হাজার টন আলু মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করেছে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জুলফিকার হায়দার জানান, ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্থানীয় কিছু রপ্তানিকারক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আলু রপ্তানি করে আসছেন। ক’দিন আগে রাশিয়া ও সিঙ্গাপুরে প্রায় ৫ হাজার টন আলু রপ্তানি করা হয়েছে। আরো ৮ থেকে ১০ হাজার টন আলু রপ্তানি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় আলু রপ্তানিকারক মাহিগঞ্জ কলেজ রোডের ব্যবসায়ী গাজী শরিফুল আলম খোকন জানান, চট্টগ্রামের সায়েম এন্ড ব্রাদার্স নামের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আলু রপ্তানি করে আসছেন। তিনি জানান, মাঠ পর্যায়ে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে আলু সংগ্রহ করে তা বাছাই প্রক্রিয়া শেষে রপ্তানির জন্য কার্টুনে প্যাকিং এবং পরে তা কন্টেইনারে নেয়ার জন্য চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানো হয়।
সূত্রমতে, চলতি মৌসুমে রংপুর কৃষি অঞ্চলের ৫ জেলা নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধায় আলু উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছিল ৮৮ হাজার ৮৩৬ হেক্টর জমিতে। তবে উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ৯১ হাজার ৯২১ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়।
রংপুর জেলায় ৪৮ হাজার হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হলেও ৪৯ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। উত্পাদিত আলুর পরিমাণ ১০ লাখ টন। এর মধ্যে ডায়মন্ড, গ্রানুলা, স্টারিক্স, লড়া, কুম্ভিকা জাতের আলু রয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টন। বাকি সাড়ে ৫ লাখ টন আলুর মধ্যে রয়েছে কার্ডিনাল, শীল, ঝাউসহ বিভিন্ন জাতের দেশি আলু। সরেজমিনে রংপুরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, মাঠে আলু তোলার ধুম পড়ে গেছে। আলু চাষি খতিবর, আউয়াল, আফতাব, নজরুল, আতিয়ার রহমান, সিরাজুল ইসলাম, আনিছুল ইসলামসহ অনেকের সাথে কথা বললে তারা জানান, এবার বাজার মূল্য কম থাকায় উত্পাদনের খরচও তুলতে পারছেন না তারা।
প্রতি বিঘা জমিতে আলু উত্পাদনে চাষিদের খরচ হয়েছে ৩৫ হাজার টাকা। সেই অনুযায়ী প্রতি বস্তা আলু উত্পাদনে খরচ হয়েছে ৭’শ টাকা। কিন্তু বর্তমান বাজারে ৮৮ কেজির প্রতি বস্তা আলু প্রকারভেদে ৪’শ থেকে ৬’শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর ফলে বস্তা প্রতি আলুতে লোকসান গুনতে হচ্ছে ১’শ থেকে ২’শ টাকা। বাজারদর কম থাকায় চাষিরা হিমাগারমুখী হয়ে পড়েছেন। কিন্তু চলতি বছর আলু মজুদে ব্যবহূত বস্তার দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় চাষিরা খোলা মাঠসহ নিজেদের বাড়িতে পালা দিয়ে রাখছেন আলু।
বাজারদর কম থাকায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অনেকেই আলুর বড় মজুদ গড়ে তুলে হিমাগারে সংরক্ষণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সাধারণ আলু চাষিরা আলু সংরক্ষণে প্রতি বছরের মতো হিমাগারের ভাড়া বৃদ্ধি না করাসহ অগ্রিম ঋণ প্রদানে হিমাগার মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।