নেতানিয়াহুর বিজয়, শান্তির পরাজয়?

 
যুদ্ধ আর রক্তপাতের মাধ্যমে দখলকৃত অঞ্চলে জন্ম নেয়া ইসরাইলের মসনদে আবারো বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। যার অন্যতম প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল, জয়ী হলে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র বলে কিছু থাকবে না। নেতানিয়াহুর এই ভাষ্য মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি স্থাপনে যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো কৌশল দুই রাষ্ট্র নীতিকে চ্যালেঞ্জ করে। ওয়াশিংটনের এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড নীতি নিয়ে নেতানিয়াহুর সাথে ওবামা প্রশাসনের দূরত্বও বাড়ছে। ফলে শান্তি আলোচনার টেবিলে ইসরাইলের ফিরে আসা নিয়েও সন্দেহ-সংশয় বাড়ছে সবার। বাড়ছে অনিশ্চয়তাও।
গত ১৭ মার্চ ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটের নির্বাচনে অধিকাংশ আসন লাভ করে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি। অথচ ধারণা করা হচ্ছিল উল্টোটা। তবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক আসন পায়নি দলটি। এ জন্য সমমনা দলগুলোর সমর্থন নিতে এখন জোর তত্পর চালাচ্ছেন নেতানিয়াহু। তবে বিশ্বের একমাত্র এই ইহুদি রাষ্ট্রের নতুন কেবিনেটের মূল লক্ষ্যই হবে নিজেদের দখলদারিত্ব ও অস্তিত্ব জানান দিতে আরো শক্তিমত্তা অর্জন। এই লক্ষ্যই প্রতিফলিত হয়েছিল প্রার্থীদের নির্বাচনী অঙ্গীকারে। তবে লক্ষ্য অর্জনের ভিন্ন পথ বাতলেছিলেন নেতানিয়াহুর ঘোর সমালোচক ও লিবারেল পার্টির নেতা আইজ্যাক হারজগ। তার মতে, স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে ফিলিস্তিনসহ আন্তর্জাতিক মহলের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন জরুরি। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে কোনো কিছুই বলতে শোনা যায়নি তাকে। জয়ী হলে সার্বভৌম অঞ্চলের বাইরে দখলকৃত এলাকায় ইহুদি বসতি স্থাপন বন্ধ করারও ঘোষণা দিয়েছিলেন হারজগ। মধ্য-বামপন্থি জোট জিওনিস্ট ইউনিয়ন গঠন করে কোমর বেঁধে তিনি নেমেছিলেন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে। কিন্তু সাম্প্রদায়িক এই দেশের জনগণ নেতানিয়াহুর পক্ষেই রায় ঘোষণা করে। ইসরাইলিরা মনে করে, ফিলিস্তিনিদের সাথে উপযুক্ত আচরণে নেতানিয়াহুই সেরা। আর তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হারজগ যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি করতে চাচ্ছেন, নির্বাচনের আগে এমন ধারণাই জন্মে সবার মধ্যে।
নির্বাচনী ফল ঘোষণার সাথে সাথে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয় ইসরাইলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। কূটনৈতিক ঐতিহ্যের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বিজয়ী প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাতেও দেরি করে ওয়াশিংটন। হোয়াইট হাউস ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় দুই রাষ্ট্র কৌশল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে ওয়াশিংটন। অর্থাত্ ইসরাইলের মতো স্বাধীন, সার্বভৌম দেশ হিসাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন। বিবৃতিতে আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনকে মেনে নিয়ে গণতান্ত্রিক ও কূটনৈতিক উপায়েই ইসরাইলকে অগ্রসর হওয়ার পরামর্শ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। একই ধরনের পরামর্শ দেয় জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তবে বিশ্লেষকদের মূল উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা অন্যখানে। সেটা হলো— নির্বাচনের মাধ্যমে ইসরাইলে ক্ষমতার পরিবর্তন না হওয়ায় ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা আরো বাড়তে পারে।
কিন্তু ইসরাইল অনেক আগে থেকেই আন্তর্জাতিক আইন ও বিধিনিষেধ উপেক্ষা করার বেয়াড়াপনায় অভ্যস্ত। দখলকৃত এলাকায় দেদারসে চলছে ইহুদি বসতি স্থাপনের কাজ। সেই একগুঁয়েমির কারণেই মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়া বহুদিন ধরে স্থবির। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের দুই রাষ্ট্র নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আলোচনার গতি রুখতে বসতি স্থাপনের কাজ চালিয়ে যাওয়ার কৌশল হাতে নেয় ইসরাইল। ফিলিস্তিনিরা তাই মনে করেন, ইহুদি রাষ্ট্রের টিকে থাকার পথ ভয়াবহ। নেতানিয়াহুর আবারো প্রধানমন্ত্রী হওয়া মানেই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র না হওয়া। এ কারণে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আদালতই একমাত্র ভরসা বলে মনে করেন ফিলিস্তিনিরা। এরই মধ্যে তারা ইসরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশল কাজে লাগিয়েছে। ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এখন শুরু হবে আইনের লড়াই।
হেগ ভিত্তিক আন্তর্জাতিক আদালত— আইসিসির সদস্যপদের জন্য আবেদন জানিয়েছেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। আইসিসির সদস্য হতে পারলে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলা ঠুকে দিতে পারবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। যুদ্ধ ও আলোচনার মাধ্যমে কয়েক যুগেও দ্বন্দ্বের অবসান না হওয়ায় এই উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়েছে ফিলিস্তিন। এর ফলে ইসরাইলের ওপর চাপ প্রয়োগ করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ফিলিস্তিনিরা বলছেন, নিজেদের দাবিকে তারা আন্তর্জাতিকীকরণ করছেন। এর আগে, তিন বছরের মধ্যে অধিকৃত এলাকা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের দাবিতে নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব উত্থাপন করে ফিলিস্তিন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোতে তা নাকচ হয়। এর পরই আইসিসি প্রতিষ্ঠাকালীন রোম চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। এরই পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন জানিয়েছিলেন, আগামী পয়লা এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিসির সদস্যপদ অর্জন করতে পারে ফিলিস্তিন। বিশেষ করে, গত ১৩ জুন থেকে গাজা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে শুরু হওয়া ইসরাইলি আগ্রাসনের বিচার চান মাহমুদ আব্বাস। পঞ্চাশ দিনের ঐ অভিযানে হত্যা করা হয় দুই হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে। যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। গুঁড়িয়ে দেয়া হয় গাজার কয়েক হাজার ঘরবাড়ি। পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম দখল করে সেখানে ইহুদি বসতি নির্মাণের বিরুদ্ধেও আন্তর্জাতিক আদালতে অভিযোগ করার পরিকল্পনা রয়েছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের। রোম চুক্তির অষ্টম ধারায় বলা হয়েছে, সামরিক দখলদারিত্বের মাধ্যমে কোনো এলাকার জনগণকে যদি অন্যায়ভাবে বিতাড়িত বা বন্দী করে রাখা হয়, তবে তা হবে যুদ্ধাপরাধ। এরই ভিত্তিতে ইসরাইলি আগ্রাসনকে যুদ্ধাপরাধ বলে স্বীকৃতি দেয় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের আগের সীমানায় স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে চায় ফিলিস্তিনিরা। কিন্তু সমস্য হলো— যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল কেউই আন্তর্জাতিক আদালতের সদস্য নয়। এ কারণে এ দুটি দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা যাবে না। তবে যুদ্ধাপরাধের জন্য দায়ী সে দেশের সংশ্লিষ্ট নাগরিককে বিচারের মুখোমুখি করতে পারবে আইসিসি। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ওবামা প্রশাসনের ক্রমবর্ধমান দূরত্ব কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন রিপাবলিকান নেতারা। এ লক্ষ্যে আগামী এপ্রিলে ইসরাইল সফরে যাচ্ছেন পার্লামেন্ট স্পিকার জন বোয়েনার।