গাভি, ইউনিসেফ, ডব্লিউএইচও এবং গ্লোবাল পোলিও এর ডিকেশন ইনিশিয়েটিভ (জিপিইআই)-এর সহযোগিতায় শিশুর জন্য দু’টি নতুন টিকা প্রবর্তন করা হয়েছে। গত শনিবার ইউনিসেফ এই তথ্য প্রকাশ করে। ইউনিসেফ মনে করে বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচিতে এই নতুন দু’টি জীবনরক্ষাকারী টিকা প্রবর্তন ত্রিশ লাখেরও বেশি শিশুকে নিউমোনিয়ার প্রধান কারণের (নিউমোককাল ভ্যাক্সিন-পিসিভি) হাত থেকে রক্ষা করবে এবং শিশুরা পোলিও এরাডিকেশন এ্যান্ড গেম স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ২০১৩-২০১৬-এর অংশ হিসেবে ইন এ্যাক্টিভেটেড পোলিও ভ্যাক্সিন (আইপিভি) থেকেও বিশেষভাবে উপকৃত হবে। এই বিষয় ভ্যাক্সিন এলায়ন্সে গাভির প্রধান নির্বাহী র্কমর্কতা (সিইও) ডা. সেঠ বার্কলে বলেছেন, ‘নিউমোনিয়া হলো বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান একটি কারণ। এ কারণে পাঁচ বছরের কম বয়সী ২২ শতাংশ শিশুর মৃত্যু হয়ে থাকে। সুতরাং নিউমোককাল ভ্যাক্সিনের প্রবর্তন শিশুর বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে বড় একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তিনি আরও বলেন, এই নিউমোককাল রোগ সারাবিশ্বে প্রতিবছর পাঁচ বছরের কম বয়সী পাঁচ লাখ শিশুর জীবন কেড়ে নেয়। এই মৃত্যুর বেশির ভাগই ঘটে উন্নয়নশীল দেশসমূহে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউনিসেফ প্রতিনিধি এডওয়ার্ড বগি বেডের বলেন, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে পিসিভি ও আইপিভির সংযোজন, পাঁচবছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যু ও রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ভাল ফলাফল বয়ে আনবে। সরকার এবং অন্য অংশীদারদের প্রতিশ্রুতি ও সংকল্প অনুসারেই ইউনিসেফ নিশ্চিত যে, এই প্রচেষ্টা শিশুদের জন্য সুষম সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশে শিশুদের বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।’
বাংলাদেশে নিযুক্ত বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) প্রতিনিধি ডা. এন.পারানিথারন বলেন, বাংলাদেশে উচ্চ টিকাদান হার-এর সাথে এই দুটি টিকা—পিসিভি এবং আইপিভি’র সংযোজন যথার্থ একটি পদক্ষেপ। বাংলাদেশের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে আইপিভি’র সংযোজন বাংলাদেশের পোলিওমুক্ত অবস্থান ধরে রাখতে সহায়তা করবে এবং ব্যয় সাশ্রয়ী পিসিভি’র সংযোজন শিশুর রোগ ও মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করবে। আমরা নিশ্চিত যে, এই টিকার সরবরাহ ও ব্যবহার ক্রমবর্ধমানহারে বাড়বে। ডব্লিউএইচও বাংলাদেশের ইপিআই বা সমপ্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে সহায়তা চালিয়ে যাবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমানে প্রচলিত টিকা মুখে খাওয়ানোর প্রথা ধীরে ধীরে তুলে ফেলার কথাও ভাবছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ মুখে খাওয়ানোর ক্ষেত্রে টিকার সম্পূর্ণ প্রভাব প্রাপ্তি থেকে শিশুরা বঞ্চিত হতে পারে। এই ভ্যাক্সিন দুটি শুরুতে মুখে খাওয়ানো ও ইনজেক্টেবল—এই দু’ভাবে ব্যবহার করা হলেও ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ ফল পাওয়ার জন্য শুধুই ইনজেক্টেবল হিসাবে ব্যবহার করা হবে।
উল্লেখ্য ২০১৩ সালের মে মাসে বিশ্বস্বাস্থ্য সম্মেলন পোলিও এরাডিকেশন এন্ড গেম স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ২০১৩-২০১৮ অনুমোদন করে। এতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা এবং মুখে খাওয়ানো পোলিও টিকা ধীরে ধীরে তুলে নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। মুখে খাওয়ানোর পোলিও টিকা উন্নয়নশীল দেশসমূহে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই টিকা বিশ্বব্যাপী পোলিও সংক্রমণ সফলভাবে ৯৯ শতাংশ হ্রাস করেছে। এর সাথে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে আইপিভি সংযোজন শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করবে এবং পোলিও জীবাণু ঘটিত ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
ডা. বার্কলে আরও বলেন, শিশু বিকলাঙ্গ এবং অক্ষম করে দেয়া রোগ নির্মূলে বিশ্ব প্রচেষ্টাকে সুসংহত করার ক্ষেত্রে আইপিভি’র সংযোজন আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। জিপিইআই-এর সাথে গাভি ২০১৫ সালের মধ্যে বেশিরভাগ দেশেই আইপিভি চালু করার অভূতপূর্ব একটি প্রচেষ্টায় সহায়তা করছে। পোলিও সংক্রমণ রোধ করা এবং একে শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে জোরালো একটি টিকাদান কর্মসূচি অত্যাবশ্যকীয়। যেকোনো একটি দেশে একটি শিশুও পোলিও আক্রান্ত হলে সারাবিশ্বের সকল শিশুই বিপদগ্রস্ত হয়।
পরিসংখ্যান মতে, গতবছর বিশ্বে ৩৫০ জন শিশু পোলিও আক্রান্ত হয়েছে বলে চিহ্নিত হয়। এর অধিকাংশই পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও নাইজেরিয়ায়। ২০১৫ সালের শুরু থেকে এপর্যন্ত ১৭টি পোলিও আক্রান্ত শিশু বিশ্বব্যাপী চিহ্নিত হয়েছে যার মধ্যে ১৬টিই পাকিস্তানে এবং ১টি আফগানিস্তানে। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক হেলথ সার্ভে -২০১১।