পুষ্টির অভাবে রক্তশূন্যতায় ভুগছে দেশের অর্ধেক নারী

মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নে গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ বিশ্বে ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখালেও সঠিক পুষ্টির অভাবে দেশের অর্ধেক নারী এখনও রক্তশূন্যতায় ভুগছে। বাংলাদেশ স্বাস্থ্য ও জনমিতি জরিপ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও বৈশ্বিক বিভিন্ন গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রসূতি নারীরাই অধিক হারে পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। পুষ্টির ঘাটতির প্রধান কারণ আর্থিক নয়। সচেতনতার অভাব ও খাদ্যাভ্যাস বা মানসম্পন্ন খাদ্য গ্রহণ না করাই এর মূল কারণ। গবেষণায় বলা হচ্ছে, পুষ্টি ঘাটতির শিকার কর্মজীবী নারীদের কর্মক্ষমতা ও সৃষ্টিশীলতা কম হয়। সুস্থ-সবল ও মেধাদীপ্ত সন্তান জন্মেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছেন তারা। তবে দীর্ঘমেয়াদি বিবেচনায়, নারীদের এই পুষ্টিহীনতার মূল আঘাতটি লাগছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে, তথা সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
বেসরকারি সংস্থা মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআই) থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ‘দিশারী’ নামক প্রকল্পের মাধ্যমে সংস্থাটি ২০১৪ সালে নরসিংদী ও সাতক্ষীরায় প্রসূতিসহ নারীদের রক্তশূন্যতা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখতে পায়-বেশিরভাগেরই দেহে আয়রনফলিক অ্যাসিডের ঘাটতি রয়েছে। প্রকল্পটি শেষে এমআই দেখে, ওই দুটি জেলার ৩৩ শতাংশ নারী আগে আয়রনফলিক অ্যাসিড বড়ি খেতেন, তবে সচেতনতা বাড়ায় এর হার প্রায় ৮৮ শতাংশে উন্নীত হয়। এমআই’র আঞ্চলিক পরিচালক জন ম্যাককালাও জানান, এ বিষয়ে তারা বাংলাদেশ সরকারকে আরও সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রোকসানা কাদের জানান, রক্তশূন্যতা রোধে ক্রমান্বয়ে সারাদেশে আয়রনফলিক অ্যাসিড বড়ি সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখন দশটি জেলায়- বিনামূলে আয়রনফলিক বিতরণ করার পাশাপাশি গণসচেতনতা বৃদ্ধিমূলক প্রকল্প গ্রহণ  করা হয়েছে। তিনি জানান, ২০১১ সালে প্রয়োজনের ৫০ শতাংশ আয়রনফলিক ওষুধ কেনা হয়েছিল। অবশ্য ২০১৪ সালে এটি বেড়ে ৮০ শতাংশ হয়।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়াধীন ‘ন্যাশনাল নিউট্রিশন সার্ভিসেস (এনএনএস)’-এর প্রোগ্রাম ম্যানেজার বিশিষ্ট পুষ্টিবিদ ড. তাহেরুল ইসলাম খান গতকাল ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, পুষ্টিহীনতার জন্য আর্থিক অসঙ্গতি বড় বিষয় নয়। সঠিক বা গুণগত মানসম্পন্ন খাদ্য নির্বাচন এবং তা সংরক্ষণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মধ্য দিয়ে গ্রহণ করতে পারলেই নারীদের পরিপূর্ণ পুষ্টি অর্জন সম্ভব। শুধু দামি খাবার খেলেই পুষ্টি মেলে-সচেতনতার অভাবে অনেকের মধ্যে এখনও এই ভুল ধারণা বদ্ধমূল। বরং হাতের কাছেই কম দামের তবে অধিক পুষ্টিসমৃদ্ধ শাকসবজি-ফলমূল খেয়েই পূর্ণ পুষ্টি পাওয়া সম্ভব। এরসঙ্গে দরকার পরিষ্কার হাতের এবং বিশুদ্ধ পানিতে ধুয়ে বা রান্না করে খাওয়ার নিশ্চয়তা। পাশাপাশি রন্ধন পদ্ধতিও স্বাস্থ্যসম্মত হতে হবে।
ড. তাহেরুল বলেন, মানবদেহে দুই ধরনের পুষ্টি দরকার হয়-ম্যাক্রো ও মাইক্রো। ম্যাক্রো হলো শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার। এক্ষেত্রে আমাদের ভাত খাওয়ার অভ্যাস বেশি, অথচ রুটি, যব, আলু বা এ জাতীয় কম দামের অন্যকিছু খেয়ে ভাতের চেয়ে বেশি পুষ্টি পাওয়া যায়। আর মাইক্রো হলো খনিজ, আয়োডিন, আয়রন জাতীয় খাদ্য। ‘ভিটামিন-এ’র অভাবে অনেক নারী বা প্রসূতি রক্তশূন্যতা ছাড়াও চোখের ও স্কিনের নানা সমস্যায় ভোগেন। অথচ পাঁচ লিটার সয়াবিন তেলের সঙ্গে এক টাকা মূল্যের একটি ‘ভিটামিন-এ’ ক্যাপসুল মেশালেই এর চাহিদা পরিপূর্ণ হয়। একইভাবে এক কেজি লবণের সঙ্গে একটু আয়োডিন মেশালেই নারীসহ সবার শরীরের আয়োডিনের চাহিদা মিটে যায়। অথচ এই সামান্য টাকার আয়োডিনের অভাবেই ১০৪ থেকে ১০৫ ধরনের রোগ-বালাই হয়।
তিনি বলেন, এমনকি একটি ডিম খেয়েও অনেক বেশি পুষ্টি পাওয়া সম্ভব। পাঙ্গাস মাছ তুলনামূলক সস্তা। একজন নারী যদি অন্য দামি মাছ না খেয়ে দিনে এক টুকরা পাঙ্গাস মাছ খান, তাহলে তিনি অনেক বেশি পুষ্টি পেতে পারেন। সরকার এখন অবিবাহিত নারীদের পুষ্টির বিষয়েই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, কারণ একজন নারী পূর্ণ পুষ্টিসম্পন্ন হলে তার সন্তান প্রসব সহজ হয়, সন্তানও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়।
কয়েকটি কেস স্টাডি উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের প্রসূতি ও গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. শারমিন ফেরদৌস গতকাল ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন ‘শহুরে নারীদের দেহে রক্তশূন্যতা তেমন দেখা যায় না, তবে গ্রামীণ নারীদের-বিশেষ করে গর্ভবতীদের দেহে প্রয়োজনীয় আয়রন, আয়রন ফলিক অ্যাসিড ও আয়োডিনের ঘাটতি থাকে। এর ফলে অনেকের অ্যানিমিয়া, ডায়াবেটিসসহ নানা জটিলতা দেখা দেয়। যা অনেকসময় ক্রনিক হয়ে যায়। এর মূল কারণ তারা কী খায় জানে না, পুষ্টিসম্পন্ন খাবার সম্পর্কে তাদের তেমন কোনো ধারণা নেই।’ ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেল্থ নিউট্রিশন- এর পরিচালক ড. মো. আলমগীর আহমেদ ইত্তেফাককে জানান, মৌলিক পুষ্টি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিষ্ঠানটি মায়েদেরসহ সকল নারীদের কাছে পুষ্টি বার্তা পাঠাচ্ছে। গণমাধ্যম ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে এই বার্তা পৌঁছানো হচ্ছে।
এদিকে, পুষ্টি সম্পর্কে গণসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর কণ্ঠে ধারণকৃত মোবাইল ভয়েস কল চালু করা হয়েছে। দেশের চার কোটি মোবাইল ফোন গ্রাহকের কাছে এর বার্তা যাবে। গত ১৮ মার্চ এই ভয়েস কল বার্তার উদ্বোধন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব সৈয়দ মন্জরুল ইসলাম বলেছেন ‘দেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নতির পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও সামাজিক সূচকের উন্নতির দিকেও যাচ্ছে। অগ্রগতির ধারায় এখন পুষ্টির দিকে নজর দেয়ার সময় এসেছে।’
 ‘পোস্ট-২০১৫’ শিরোনামে জাতিসংঘের মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) পরবর্তী বৈশ্বিক উন্নয়নের জন্য ‘কস্ট-বেনিফিট’ (খরচ এবং সে তুলনায় প্রাপ্তি) পর্যালোচনা করে এবার ২২টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে বাংলাদেশের জন্য ১০টি প্রধান লক্ষ্য ঠিক করার কাজ চলছে এখন। অন্যতম হলো ‘সবার জন্য পুষ্টি’।

এমডিজি’র পরবর্তী বৈশ্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যগুলো কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে কাজ করছেন ড. বিয়ন লোমবোর্গ। টাইম ম্যাগাজিনের চোখে তিনি দুনিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির একজন। তিনি বিশ্বের প্রথম সারির থিঙ্কট্যাংক কোপেনহেগেন কনসেনসাসের প্রেসিডেন্ট। ঢাকায় ব্র্যাক সেন্টারে ড. বিয়ন বলেন ‘ভালো বা মানসম্পন্ন খাদ্য, শিক্ষা ও পুষ্টি নিশ্চিত করা গেলে সেটিই যোগ্যকর্মী তৈরির নিশ্চয়তা দেবে। যা কর্মসংস্থানেরও সহায়ক হবে। এমডিজির সাফল্যের পর জাতিসংঘ ২০১৬ থেকে ২০৩০ সাল মেয়াদি উন্নয়নের যে নতুন লক্ষ্য নির্ধারণের পরিকল্পনা করছে সেখানে কোনটিতে খরচ কত, কোনগুলো বেশি ফলদায়ক-সেই বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। পুষ্টির পেছনে সবচেয়ে কম বিনিয়োগ করে সবচেয়ে বেশি প্রাপ্তি সম্ভব। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পুষ্টির পেছনে এক টাকা খরচ করলে ৪০ টাকার ফল পাওয়া যায়।