জাতীয়তাবাদী সমর্থক সংগঠন ‘শত নাগরিক কমিটি’র একটি প্রতিনিধি দল গতকাল বুধবার বিকাল সাড়ে ৩টায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সঙ্গে বৈঠক করেছে। প্রতিনিধি দল আসন্ন তিন সিটি নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় দুই বা তিন দিন বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক মামলায় যেসব আগ্রহী প্রার্থী ও ভোটার গ্রেফতার এবং পলাতক রয়েছেন তাদের নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দিনের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের প্রতিনিধি দল সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের কাছে লিখিতভাবে ৬ দফা দাবিনামা উপস্থাপন করেন। তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর সিইসি সাংবাদিকদের কাছে মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়সীমা না বাড়ানোর ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, মনোনয়নপত্র দাখিলের জন্য যে ১১ দিন সময় দেয়া হয়েছে সেটাই যথেষ্ট।
সোয়া এক ঘণ্টার বৈঠকে সিইসি ছাড়াও ইসি সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম অংশ নেন। একই সঙ্গে এই তিন সিটির নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরির কথাও বলা হয় সংগঠনটির পক্ষ থেকে। তবে বৈঠকে সিইসি মনোনয়নপত্র জমাদানের সময় বৃদ্ধির বিষয়টি নাকচ করলেও নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার ব্যাপারে তাদেরকে আশ্বস্ত করেন। অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে ‘শত নাগরিক কমিটি’র ব্যানারে প্রতিনিধি দলে ছিলেন সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (একাংশের) সভাপতি আব্দুল হাই শিকদার, আইনজীবী ফাহিমা নাসরিন প্রমুখ। বৈঠকে সিইসির কাছে প্রশ্ন আকারে ৬টি প্রস্তাব রাখেন তারা।
শত নাগরিক কমিটির প্রস্তাব
সিইসির কাছে লিখিতভাবে দেয়া ‘শত নাগরিক কমিটি’র প্রশ্ন আকারে ৬টি প্রস্তাবের ভূমিকাতে বলা হয়, দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন চলাকালে হঠাত্ দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে বন্ধ থাকা ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার কারণ নাগরিকদের কাছে দুর্বোধ্য। এ কারণে দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে আমরা কয়েকটি প্রাসঙ্গিক বিষয়ে আপনার মনোযোগ আকর্ষণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা বিধানের অনুরোধ জানাতে চাই।
জাতীয়তাবাদী পরামর্শক হিসেবে পরিচিত এসব নাগরিকের প্রশ্ন— (ক) ঢাকা (উত্তর), ঢাকা (দক্ষিণ) ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহী প্রার্থীদের অনেকেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা মামলা ও হয়রানির শিকার হয়ে গ্রেফতার কিংবা তারা গ্রেফতার এড়াতে গা-ঢাকা দিয়ে আছেন। এই সম্ভাব্য প্রার্থীরা যাতে অন্যান্য প্রার্থীর মতো মুক্ত অবস্থায় প্রকাশ্যে ও নিরাপদে নির্বাচন কার্যক্রম চালাতে পারেন সে ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন কি ভূমিকা পালন করবে? (খ) একইভাবে প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর জন্য যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত হবেন—তাদের কেউ মিথ্যা মামলায় কারাগারে আবদ্ধ থাকলে কিংবা গ্রেফতার এড়াতে গা-ঢাকা দিয়ে থাকলে তারা যাতে নির্বিঘ্নে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন সে ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন কি ভূমিকা পালন করবে? (গ) সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীদের বিশেষ সুবিধা দিতে অন্য প্রার্থীদের কিংবা তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত নেতা-কর্মীদের মিথ্যা অভিযোগে আটক করার কিংবা গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে বাধ্য করার প্রশাসনিক অপপ্রয়াস রোধে নির্বাচন কমিশন কি ব্যবস্থা নেবে? (ঘ) অস্ত্র কিংবা পেশীশক্তির প্রয়োগ কার্যকরভাবে রোধ করার মাধ্যমে নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন কি ব্যবস্থা নেবে? (ঙ) নির্বাচনে প্রচারকর্মী ও পোলিং এজেন্টদের জীবন ও সম্ভ্রমের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং নির্ভয়ে ও নিশ্চিন্তে তাদের দায়িত্ব পালন করার জন্য নির্বাচন কমিশন কি ব্যবস্থা নেবে? (চ) সময়ের স্বল্পতা বিবেচনায় নিয়ে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের স্বার্থে মনোনয়নপত্র জমাদানের সময় দুই/তিন দিন বৃদ্ধি করার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হবে কি না?
এই ছয়টি প্রশ্ন শেষে বলা হয়, আমরা অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রকাশ্য বিবৃতি এবং তা বাস্তবায়নের আন্তরিকতা প্রত্যাশা করছি। আপনাদের এসব প্রশ্নের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আশ্বাস পেয়েছেন কি না- জানতে চাইলে প্রতিনিধি দলের নেতা অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘কোন বিষয়ে সিইসি উত্তর দেননি। তিনি আমাদের কথা শুনেছেন। সামগ্রিক বিষয়ে সিইসি আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। তিনি তার সাধ্যমতো চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন।’ সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, তারা বিএনপির পক্ষ থেকে নন, শত নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে এসেছেন। বিএনপি সিটি নির্বাচনে অংশ নেবে কি না- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে কি না, তা দল সিদ্ধান্ত নেবে। আমরা চাই সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। সত্ ও যোগ্য প্রার্থী পেলে আমরা সমর্থন দেব।’
মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় বাড়ানোর দাবির বিষয়ে এমাজউদ্দীন বলেন, ‘সময় বাড়ানোর দাবিটি মুখ্য নয়। তবে সার্বিক বিষয়ে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিতের অনুরোধ জানানো হয়েছে। এই নির্বাচনে সব দলের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দায়িত্ব ইসির।’
ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, নির্বাচিত মেয়র বা জনপ্রতিনিধিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে সরকারি সিদ্ধান্তে বরখাস্ত করার ঘটনা ঘটছে। কিন্তু জনগণ যাকে নির্বাচিত করবে তাকে অপসারণের ক্ষমতা জনগণেরই থাকা দরকার। এই বিষয়টিও আমরা সিইসির সাথে আলোচনা করেছি।
বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘বিএনপি বা ২০ দল নির্বাচনে যাবে কি না, কাকে সমর্থন দেবে, তা দলীয় ফোরামে সিদ্ধান্ত হবে। শত নাগরিক কমিটি সবার জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরির দাবি জানাচ্ছে।
সিইসি যা বললেন
শত নাগরিক কমিটির প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে গতকাল সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় ইসি কার্যালয় ছাড়েন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। এর আগে প্রতিনিধি দলটির প্রশ্নের জবাবে সিইসি সাংবাদিকদের বলেন, ‘তারা বলেছেন দুই-তিনদিন সময় বাড়ানো হলে ভালো। কিন্তু আমরা ইতিমধ্যে সময় দু’দিন বাড়িয়ে দিয়েছি। শুক্রবার-শনিবার বন্ধ থাকার কথা ছিল। আমরা খোলা রেখেছি। ।
তিনি বলেন, ‘প্রচুর সংখ্যক প্রার্থী ইতোমধ্যে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করছেন। তফসিল ঘোষণার সময় থেকেই মনোনয়নপত্র দাখিলের জন্য প্রায় ১১ দিন সময় দেয়া হয়েছে, যা যথেষ্ট। সুতরাং প্রার্থীদের কোন সমস্যা হবে না।
সিইসি বলেন, তারা বলেছেন, হঠাত্ কেন তফসিল ঘোষণা করা হলো। আমরা বলেছি, হঠাত্ তফসিল ঘোষণা হয়নি। এর আগেও একবার তফসিল ঘোষণা হয়েছিল। কিন্তু আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে করা সম্ভব হয়নি। এরপর সীমানা নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। এ বিষয়ে কমিশন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে বারবার চিঠি দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত তারা সীমানা বিন্যাস করে দিয়েছে। তারপরও ইসি সময় নিয়ে তফসিল ঘোষণা করেছে। বারবার বলে এসেছি, এপ্রিল-মে’তে নির্বাচন হবে। এইচএসসি পরীক্ষা ও রোজার বিষয় মাথায় রেখে তফসিল ঘোষণা করতে হয়েছে।
যারা রাজনৈতিক মামলায় জেলে আটক আছেন বা পুলিশের ভয়ে যারা পালিয়ে আছেন, তাদের ব্যাপারে ইসি কী ব্যবস্থা নেবে, জানতে চাইলে সিইসি বলেন, এ বিষয়ে তো আমি আশ্বস্ত করতে পারি না। কেউ পালিয়ে থাকলে তাকে কীভাবে খুঁজে বের করব।