প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে স্বাধীনতা দিবসে উন্মুক্ত হলো স্বাধীন বাংলাদেশের রক্তাক্ত জন্ম-ইতিহাসের সাক্ষীসমূহ। উন্মুক্ত করা হলো স্বাধীনতা স্তম্ভ ও স্বাধীনতা জাদুঘর। দেশের ইতিহাসের নানা ঘটনার সাক্ষী রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে নির্মাণ করা হয়েছে গ্লাস টাওয়ার বা স্বাধীনতা স্তম্ভ। আর ভূগর্ভে স্থাপিত স্বাধীনতা জাদুঘরের সজ্জাকরণ সম্পন্ন করেছে জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। গতকাল থেকে তা সবার জন্য উন্মুক্ত হলো। দর্শনার্থীরা এখানে এসে তা প্রত্যক্ষ করবেন। এছাড়া উদ্যানে প্রশিক্ষিত গাইডরা থাকবেন, যারা পরিদর্শনের সময় দর্শনার্থীদের জানাবেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।
গতকাল বুধবার দুপুরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ভিআইপি কক্ষে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে উন্মুক্তের ঘোষণা দেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি সচিব রণজিত্ কুমার বিশ্বাস এনডিসি, জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী, ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান এম আজিজুর রহমান, স্বাধীনতা জাদুঘরের স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম প্রমুখ। স্বাধীনতা স্তম্ভ ও স্বাধীনতা জাদুঘর উন্মুক্তকরণকে স্মরণীয় করে রাখতে এরপর অনুষ্ঠিত হয় গান, আলোকচিত্র ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী।
সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, বাঙালির জাতীয় জীবনে একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধের যে সুগভীর তাত্পর্য তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে স্বাধীনতা স্তম্ভ ও গগনচুম্বী আলোকরশ্মিমালার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর সাথে সংযোজন করা হয়েছে স্বাধীনতা জাদুঘর। তিনি বলেন, সম্প্রতি সরকার রুলস অব বিজনেস সংশোধনপূর্বক পরিচালনার দায়িত্ব সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে অর্পণ করেছে। স্বাধীনতা জাদুঘর পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে জাতীয় জাদুঘরের অধিভুক্ত একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির প্রস্তাবও প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে স্বাধীনতা স্তম্ভ ও স্বাধীনতা জাদুঘর মিলে একটি সাংস্কৃতিক বলয় তৈরি করা হচ্ছে। ৬৭ একর জমিতে পরিব্যপ্ত উদ্যানের কেন্দ্রস্থলে এর নির্মাণকাজ ২০১৪ সালে শেষ করা হয়। এতে ব্যয় হয়েছে ১৭৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এই বলয়ের মধ্যে রয়েছে ৫,৬৬৯ বর্গমিটার পাকা চাতাল বা প্লাজা, এর চারপাশে রয়েছে কৃত্রিম জলাশয়। রয়েছে জাতিসত্তার প্রতিক ‘শিখা চিরন্তনী’, স্বাধীনতা সংগ্রামকে ভিত্তি করে নির্মিত দেয়ালচিত্র বা ম্যুরাল। জাদুঘরে রয়েছে ১৫৫ আসনবিশিষ্ট একটি আধুনিক মিলনায়তন। স্বাধীনতা জাদুঘরে বাঙালি ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস আলোকচিত্রের মাধ্যমে ১৪৪টি প্যানেলে উপস্থাপন করা হয়েছে। এখানে রয়েছে প্রায় তিনশ’র মতো আলোকচিত্র। রয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণের টেবিলে অনুকৃতি স্থাপনা। এছাড়া লাইট অ্যান্ড শো-র ব্যবস্থা আছে। অডিও ভিজ্যুয়াল মিলনায়তনে নিয়মিতভাবে প্রদর্শন করা হবে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র।
স্বাধীনতা জাদুঘর খোলা থাকবে প্রতি শনিবার থেকে বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেলে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত এবং শুক্রবার বিকেলে ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। বৃহস্পতিবার ও সরকারি ছুটির দিন এটি বন্ধ থাকবে। প্রবেশমূল্য মাথাপিছু দশ টাকা, ১২ বছরের কম বয়সীদের জন্য দুই টাকা।
শিল্পকলায় স্বাধীনতা উত্সব শুরু
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস-২০১৫ উপলক্ষে শিল্পকলা একাডেমীতে নাচ, গান, আবৃত্তি ও আলোচনার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে দুইদিনব্যাপী স্বাধীনতা উত্সব। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় একাডেমীর উন্মুক্ত প্রাঙ্গণের নন্দন মঞ্চে শুরু হয় দুই দিনের এই আয়োজন। স্বাধীনতা উত্সবের শুরুতে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি সচিব ড. রণজিত্ কুমার বিশ্বাস। একাডেমীর মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিনী। আলোচক ছিলেন নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার ও শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের সন্তান তৌহিদ রেজা নূর।
উদ্বোধনী সন্ধ্যায় একাডেমীর নন্দনমঞ্চে সমবেত সঙ্গীত পরিবেশন করেন সাংস্কৃতিক সংগঠন বহ্নিশিখা, ঢাকা সাংস্কৃতিক দল ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর প্রশিক্ষণার্থীরা।
শুক্রবার শুরু উদীচী’র গণসঙ্গীত উত্সব
‘পথে পথে মিছিলের প্রতিরোধ, জনতার ঐক্যকে গড়েছি’ শ্লোগান নিয়ে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গাষ্ঠীর আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দু’দিনব্যাপী ‘সত্যেন সেন গণসঙ্গীত উত্সব ও জাতীয় গণসঙ্গীত প্রতিযোগিতা-২০১৫’। আগামীকাল শুক্রবার বিকাল ৪টায় শিল্পকলা একাডেমীর উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে এ উত্সবের উদ্বোধন করবেন লোকসঙ্গীত গবেষক ও শিল্পী স্বপন কুমার হালদার। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসাবে থাকবেন ভারতের গণসঙ্গীত শিল্পী শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার। অনুষ্ঠান উদ্বোধনের পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের সম্মাননা প্রদান করা হবে। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় ও শেষ দিন ২৮ মার্চ বিকাল ৪টায় জাতীয় গণসঙ্গীত প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের সম্মাননা ও সনদ প্রদান করা হবে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উত্সব
একাত্তর সালের সেই ভয়াল ২৫ মার্চ কালরাত্রি স্মরণে প্রদীপ প্রজ্বলন, নাচ, গান, আবৃত্তি ও পথনাটক পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সপ্তাহব্যাপী স্বাধীনতা উত্সবের চতুর্থ দিন পার করেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। গতকাল চতুর্থ দিনের আয়োজনে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণে দলীয় আবৃত্তি পরিবেশন করে আবৃত্তি সংগঠন মুক্তবাক ও স্বনন। নাচ ও গানসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে মাতুয়াইল সঙ্গীত একাডেমী, বধ্যভূমির সন্তানদল ও ছায়ানটের শিল্পীরা। ২৫ মার্চ কালরাত্রি স্মরণে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণে প্রদীপ প্রজ্বলন করা হয়। সবশেষে লোকনাট্য দল (বনানী) পরিবেশিত পথনাটকের মধ্য দিয়ে শেষ হয় সপ্তাহব্যাপী এই উত্সবের চতুর্থদিনের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম। এর আগে স্বাগত বক্তব্য রাখেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা.সারওয়ার আলী। আগামী ২৮ মার্চ শেষ হবে সপ্তাহব্যাপী স্বাধীনতা উত্সব।