রূপকথাও বোধহয় এতোটা রোমাঞ্চকর হয় না! বিশ্বকাপ শুরুর কয়েকটা সপ্তাহ আগেও জীবনের কঠিন সময়টা কাটাচ্ছিলেন, ক্রিকেট তো দূরে থাক, মুক্ত বাতাসই তখন দূরের কল্পনা। সেই দুঃসময় পেছনে ফেলে বিশ্বকাপ খেলতে গেলেন এবং বল হাতে উড়িয়ে দিলেন জীবনের পথের সব কাঁটা। সেদিনের ‘খলনায়ক’ রুবেল হোসেন আজ দেশের ‘নায়ক’। বিশ্বকাপ শেষ করে দেশে ফেরা রুবেল এখনও উচ্ছ্বাসের ঘোরেই সময় কাটাচ্ছেন। সেই উচ্ছ্বাস-আনন্দের মধ্যেই বসে বললেন, বিশ্বকাপে নিজের প্রাপ্তি, প্রতিজ্ঞা ও আবিষ্কারের কথা। বাগেরহাটের ফাস্ট বোলার রুবেল হোসেনের এই দীর্ঘ-একান্ত সাক্ষাত্কার নিয়েছেন দেবব্রত মুখোপাধ্যায়—
রুবেল, নায়ক-জীবন কেমন উপভোগ করছেন?
হা হা হা...। নায়ক জীবন! ঠিক জানি না। আমি নিজেকে নায়ক ভাবিও না। আমি যা করেছি, শুধু দলের জন্য। দলের জন্য কিছু করতে চেয়েছি। পেরেছি কি না, আপনারা বলতে পারবেন। তবে নিজেকে নায়ক ভাবি না।
আপনি না ভাবলেও লোকেরা নিশ্চয়ই ভাবছে? বন্ধুরা, বাড়ির লোকজন, ভক্তরা...
তা ঠিক। বাবা-মা তো এখন ঢাকাতেই আছেন। এর বাইরে আত্মীয়রা, বন্ধু-বান্ধব তো খুব আনন্দিত। বাইরে বেরোলে অবশ্য একটা বিরাট উত্সাহ লোকজনের টের পাচ্ছি। এখন আপনার সঙ্গে কথা বলছি একটা ফুডকোর্টে বসে। কয়েকটা ঘনিষ্ঠ বন্ধু এখানে নিয়ে এসেছে। এখানেও অনেকে সেলফি তুলছেন। এগুলোতে তো মজাই লাগছে।
অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডেও তো আপনার সঙ্গে সেলফি তোলার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল শুনলাম। প্রবাসীদের ভেতরও জনপ্রিয় হয়েছেন খুব!
তা ঠিক। এগুলো ভালো লাগে। মানুষের ভালোবাসার তো একটা মূল্য আছে। আসলে আল্লাহ চেয়েছেন বলে ভালো বল করতে পেরেছি, আর সে জন্যই মানুষ ভালোবাসছে। আমার ক্ষেত্রে অন্তত বলতে পারি, মানুষের ভালোবাসাই আমাকে যা একটু সফলতা দিয়েছে।
মাস তিনেক আগে এটা কল্পনা করতে পেরেছিলেন? তখন তো বিশ্বকাপ নিয়েও শঙ্কা ছিল।
আপনার মনে আছে, আমি আপনাকে সেই সময় বলেছিলাম, আল্লাহ চাইলে আমি হয়তো বিশ্বকাপে যাবো? হ্যাঁ, আমার ওপর দিয়ে ঝড় গেছে। অনেক বড় পরীক্ষা দিতে হয়েছে। নিজেও খানিকটা ভেঙে পড়েছিলাম। কখনো কখনো মনে হয়েছে, বিশ্বকাপ দলে হয়তো নিয়ে যাবে না। কিন্তু মন শক্ত রেখেছি। নিজেকে একটা কথাই বলেছি, আমার কাজ ভালো খেলা; সেটা করে যেতে হবে।
ওই সময়টা পার করলেন কী করে?
আমি বলবো, মানুষের ভালোবাসা আর সমর্থনের জোরে। আমার খারাপ সময় গেছে। সেই সময়ে আমি চিনতে পেরেছি, কারা আমাকে সমর্থন করছেন। আমি সত্যিই মুগ্ধ হয়ে গেছি, মানুষের ভালোবাসা ও সমর্থন দেখে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কথা বলবো বিশেষ করে। বিসিবি আমাকে যে সমর্থন দিয়েছেন, তার প্রতিদান দেওয়া সম্ভব না। আমার বিপদের সময় পাশে থেকেছেন সবাই, সেই সঙ্গে আমাকে এতোকিছুর পরও বিশ্বকাপে নিয়ে গেছেন; আস্থা রেখেছেন। দলের কথা বলবো, মাশরাফি ভাইয়ের কথা বলবো; তারা বিশ্বাস রেখেছেন, আমি পারবো। আজ আমি এই সবাইকে কৃতজ্ঞতা জানাই। এদের জন্যই আমি আজ এখানে।
যখন বিশ্বকাপ খেলাটা সব ঝামেলা এড়িয়ে নিশ্চিত হলো, তখন কী এরকম একটা প্রতীজ্ঞা করেছিলেন যে, বল হাতে সব বিতর্ক উড়িয়ে দেব?
না, ঠিক এরকম না। আমি নিজেকে বলতাম, কিছু একটা অন্তত করতে হবে। দলকে অন্তত একটা ম্যাচ জেতাতে হবে। আমি অবশ্য কল্পনাও করতে পারিনি, সেই ম্যাচটা ওই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করা ম্যাচটাই হয়ে যাবে। এটা কিন্তু স্বপ্নের চেয়েও বেশি হয়ে গেছে।
আচ্ছা, আমরা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটায় আসি। শেষ ওভারটার কথা বলেন। বল করার আগে কী মনে হচ্ছিল?
প্রথমটা একটু থতোমতো খেয়ে গিয়েছিলাম। আমি জানতাম, ডেথ ওভারটা আমারই করতে হবে। তারপরও মাশরাফি ভাই যখন বলটা হাতে দিলো, একটু কয়েক সেকেন্ডের জন্য নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলাম। মাশরাফি ভাই বললো, ‘এটা তোর জীবনের সেরা চান্স। কাজে লাগা।’ সাকিব ভাইয়ের কথাগুলো খুব মনে আছে। উনি কাছে এসে বললেন, ‘রুবেল, জীবনের সেরা ছয়টা বল কর। তোর দিকে সারা বাংলাদেশ শুধু না, সারা পৃথিবী চেয়ে আছে। মানুষ দলের জন্য বল করে, ম্যাচ জেতানোর জন্য বল করে; তুই নিজের জীবনের জন্য বল কর। তুই যদি পারিস, সারা জীবনের জন্য মানুষ তোকে মনে রাখবে।’ আমার জীবনে কোনো কথায় এতো প্রেরণা পাইনি। মনে হয়েছে, আসলেই জীবনের জন্য বল করছিলাম।
এটা তো দারুণ আবেগের দিকটা গেল। টেকনিক্যালি কী করলেন?
টেকনিক্যালি আমার ইচ্ছা ছিল, মাশরাফি ভাইয়েরও সাজেশন ছিলো একেবারে ব্লক হোলে ইয়র্ক করে যাওয়া। এতে ভয় কম থাকে। যেহেতু ভালো পেস করতে পারছিলাম, ভালো জায়গায় ইয়র্ক করতে পারলে মারতে পারবে না। পরে বল হাতে নিয়ে দেখি রিভার্স সুইং করানো যাবে। সেটাই ঠিক করলাম, একটা-দুটো বল অন্তত রিভার্স করাবো। শেষ ওই বলটা চেয়েছিলামই রিভার্স সুইং করাতে। তবে সত্যি কথা বলি, অতো সুন্দর রিভার্স করবে, আমি আশা করিনি। নিজেও অবাক হয়ে গেছি।
ডেথ ওভারে অসাধারণ বল করলেন, ম্যাচ বের করে দিলেন। বিশেষ কিছু কাজ করেছেন?
হ্যাঁ। নেটে অনেক কাজ করতে হয়েছে ডেথ ওভারের বোলিং নিয়ে। এখানে হিথ স্ট্রিককে খুব কৃতিত্ব দিতে হবে। ও খুব সহায়তা করেছে। অনেক ছোটখাটো পরিবর্তন, পরামর্শ দিয়েছে। আমাদের হেড কোচও অনেক কাজ করেছেন। আমি আরেকটু কৃতিত্ব দেব আমাদের ব্যাটসম্যানদের। অনুশীলনে ডেথ ওভারের মতো করে যখনই বল করেছি, ওরা ফিডব্যাক দিয়েছে। এটা খুব কাজে দিয়েছে। ঠিক কোন বলটায় ব্যাটসম্যান খেলতে পারছে না, ব্যাটসম্যান নিজে জানালে সবচেয়ে ভালো হয়।
রিভার্স সুইং করানো, ভালো লেন্থে বল করা; এগুলো তো আছেই। আপনি আরেকটা কারণে খুব নজর কাড়লেন—গতি। বাংলাদেশ যতোগুলো ম্যাচ খেলেছে, প্রায় সবগুলোতে দু দল মিলিয়ে সবচেয়ে গতিশীল বোলার ছিলেন আপনি। এটা কেমন উপভোগ করলেন?
অসাধারণ। আসলে বলতে পারেন, অনেক দিন পর মনে পড়ল, আমি আসলে ফাস্ট বোলার। একটা বল করছি, ডিজিটাল বোর্ডে উঠছে—১৪৬ কিলোমিটার, ১৪৫ কিলোমিটার! এটা দেখলে তো বুকটা বড় হয়ে যায়। এমন অভিজ্ঞতা তো আমাদের খুব একটা হয় না। এই বিশ্বকাপে বল করতে করতে বারবার মনে হচ্ছিল, আমি এখনও ফাস্ট বোলারই আছি।
বিশ্বকাপে দল যাওয়ার আগে আপনাদের ফাস্ট বোলারদের এক ধরনের চাপ ছিলো। বাংলাদেশে বোলিং মানে স্পিন, তারাই সব মনোযোগ পেয়ে থাকেন। আবার এখানে কিছু করতে হলে ফাস্ট বোলারদেরই করতে হবে। এটা কী আপনাদের চাপে ফেলছিল?
নাহ। ওভাবে ভাবিনি। আমরা জানতাম, দলে আমাদের রোলটা কী। এখানে ভালো করতে হবে। কিন্তু সে জন্য চাপ ছিলো না। আমরা জানতাম ওখানে ট্রু উইকেট হবে। খারাপ বল করলে ব্যাটসম্যানরা ভালো খেলবে। আর ভালো করতে পারলে পুরস্কারটা মিলবে। সে ভাবেই নিজেদের প্রস্তুত করেছি।
ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটার কথায় আসি। বিরাট কোহলিকে আউট করে যে বিশেষ উল্লাসটা, এর পেছনে কী অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ইতিহাস কাজ করেছে?না, পুরোটা না। আমাদের কিছু পুরোনো সম্পর্ক ছিলো। কিন্তু সেসব কিছুই না। বিরাট কোহলি তো এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান। তাকে আউট করে একটু বাড়তি আনন্দ পেয়েছি, এই যা।
শেষ প্রশ্ন রুবেল। এখন নিজের এই নায়ক চেহারাটা ধরে রাখার পরিকল্পনা কী?
নায়ক নয়, নায়ক নয়। পারফরমার চেহারাটা ধরে রাখতে চাই। সামনেই পাকিস্তান আসছে বাংলাদেশে। আশা করি, এখানেও নিজের সেরা বোলিংটা করতে পারবো। আসলে পুরোনোটা নিয়ে বসে থাকলে তো হবে না। এখন আরও ভালো করার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।