জঙ্গিবাদকে ‘না’ বলুন : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সহিংসতা, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডকে ‘না’ বলতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, শিশুদের নিরাপত্তা এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ নিশ্চিত করতে সর্বোপরি দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে হানাহানি, সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগের রাজনীতি পরিহার এবং সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদকে ‘না’ বলতে হবে। শিশুরা যাতে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারে, এ জন্য একটি উন্নত ও সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার কাজে প্রত্যেককে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, হরতাল-অবরোধের নামে যারা পুড়িয়ে শিশু-অন্তঃসত্ত্বা মহিলাসহ নিরীহ সাধারণ মানুষ হত্যা করছে তাদের কোনো ক্ষমা নেই। জাতি তাদের কখনোই ক্ষমা করবে না।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে জাতীয় শিশু-কিশোর সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। ৪৫তম মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস      পালন উপলক্ষে ঢাকা জেলা প্রশাসন এ শিশু-কিশোর সমাবেশের আয়োজন করে।
শেখ হাসিনা বলেন, দেশের জনগণ সমাজে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চায়। একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ প্রত্যাশা করে। বর্তমান সরকার জনগণের এই প্রত্যাশা পূরণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা উন্নত দেশ চাই, শান্তিপূর্ণ সমাজ চাই। তিনি বলেন, সন্ত্রাস-সহিংস কর্মকাণ্ড চালিয়ে দেশের অগ্রযাত্রা আটকানো যাবে না। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হবে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধশালী দেশ হবে। যেখানে আজকের শিশুরা খুঁজে পাবে একটি সুন্দর ভবিষ্যত্ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। তিনি বলেন, যারা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, আগুন দিয়ে শিশুদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারছে, তাদেরকে ছাড় দেয়া হবে না। যারা শিশুদের ভবিষ্যত্ নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে, জাতি কখনোই তাদেরকে ক্ষমা করবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা পহেলা জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দিয়েছি। কিন্তু শিশুরা স্কুলে যেতে পারছে না, ঠিকমতো পরীক্ষা দিতে পারছে না। সহিংসতার জন্য পরীক্ষার সূচি পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, যারা এই জঘন্য কর্মকাণ্ড করছে তাদের কোনো ক্ষমা হয় না। শিশু-কিশোরদের নিয়মানুবর্তিতার প্রতি গুরুত্ব দিতে পরামর্শ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, তোমরা দেশ-বিদেশে সুনাম অর্জন করবে, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। তোমরা বাবা-মা, শিক্ষকদের কথা শুনবে। আমিও তোমাদের মতো একদিন শিশু ছিলাম। তোমাদের মধ্য থেকেই একদিন কেউ প্রধানমন্ত্রী হবে। তিনি বলেন, শিশুদের উন্নত জীবন গড়ে তোলাই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে শিশুদেরকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, স্বাধীনতা আমাদেরকে নিজস্ব পরিচয়ে বাঁচার সুযোগ করে দিয়েছে। আমরা আমাদের নিজস্ব পৃথক ভূখণ্ড পেয়েছি। আমরা আমাদের পৃথক জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত ও সংবিধান পেয়েছি। শেখ হাসিনা বলেন, অনেক রক্তের বিনিময়ে আমরা আমাদের স্বাধীনতা পেয়েছি। আমাদের লক্ষ্য স্বাধীনতাকে অর্থবহ করা এবং একটি সমৃদ্ধশালী দেশ গঠনের মাধ্যমে সর্বক্ষেত্রে জাতির অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা। শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের, সকল মুক্তিযোদ্ধা এবং যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর হাতে সম্ভ্রম হারা মা-বোনদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, আমাদের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীনতা পেয়েছে। বঙ্গবন্ধু সমগ্র জাতিকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিশুদের জন্য বঙ্গবন্ধুর গভীর ভালোবাসা ছিল। সে কারণে তাঁর জন্মদিনটি শিশুদের জন্য জাতীয় দিবস হিসেবে উত্সর্গ করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার শিশুদের মেধা এবং শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। তিনি বলেন, একটি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে আমাদের প্রতিশ্রুতি আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। কম্পিউটার ও প্রযুক্তি শিক্ষা গ্রহণে ছাত্রদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা গ্রহণে শিক্ষার্থীদের সহায়তা দিতে স্কুলে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস রুম স্থাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, শিশুদের জন্য সাংস্কৃতিক চর্চা ও তাদের সংস্কৃতিমনা করে গড়ে তুলতে শিশু একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতার আয়োজন করছে। প্রতিটি উপজেলায় ছোট স্টেডিয়াম করা হচ্ছে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে এখন শিক্ষার্থীদের জন্য ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জনে শিশুদের মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে পৌঁছালে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক তাকে স্বাগত জানান। প্রথমেই জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয়। অনুষ্ঠান মঞ্চে গিয়ে দাঁড়ানোর পর প্যারেড কমান্ডার সালাম জানালে প্রধানমন্ত্রী পায়রা ছেড়ে ও বেলুন উড়িয়ে শিশু-কিশোর সমাবেশের উদ্বোধন করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী একটি খোলা জিপে করে দিবসটি পালন উপলক্ষে আয়োজিত প্যারেড পরিদর্শন করেন। প্যারেড পরিদর্শনের পর স্টেডিয়ামের বিশাল পর্দায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ প্রচার করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর বিএনসিসি, ঢাকা জেলা নৌ স্কাউট, ভারতেশ্বরী হোমস, শহীদ আব্দুর জব্বার আনসার ও ভিডিপি স্কুল ও কলেজ, ভিকারুন্নিসা স্কুল ও কলেজ, বাংলাদেশ ফিমেল অ্যাকাডেমি, তেজগাঁও শিশু পরিবারসহ ৪৬টি প্রতিষ্ঠান প্যারেডে অংশ নেয়। প্রধানমন্ত্রী সালাম গ্রহণ করেন।  বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ এবং শিশুদের শারীরিক কসরত প্রত্যক্ষ করেন শেখ হাসিনা। এরপর ভারতেশ্বরী হোমস ও পিলখানার বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা আকর্ষণীয় ডিসপ্লে প্রদর্শন করে। দিবসটি উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের গ্যালারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ও বীর শ্রেষ্ঠদের প্রতিকৃতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি এবং বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ছবি দিয়ে সুসজ্জিত করা হয়।

এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পরে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে গণভবনে গিয়ে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে একটি স্মারক ডাকটিকেট, একটি উদ্বোধনী খাম ও একটি ডাটা কার্ড অবমুক্ত করেন তিনি। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে মুক্তিযোদ্ধাদের শুভেচ্ছা জানান শেখ হাসিনা। সকালে মোহাম্মদপুরের গজনবী সড়কে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের বিশ্রামাগারে ফুল, ফল ও মিষ্টি পাঠান তিনি।