রংপুর কারমাইকেল কলেজে ২৬ শিক্ষকের পদ শূন্য

সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন বিদ্যাপীঠ রংপুর কারমাইকেল কলেজ। কলেজের ৪ একর সম্পত্তি বেদখল হয়ে গড়ে উঠেছে বস্তি। দীর্ঘদিন ধরে কলেজের ২১টি বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ২৬টি পদ শূন্য থাকায় পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আরো নানা কারণে বছরের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকছে পাঠদান কার্যক্রম। পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সংকট, শিক্ষক স্বল্পতা, পরিবহন সংকটসহ অন্তহীন সমস্যার মধ্যে নিপতিত হলেও প্রতীকারের পদক্ষেপ নেই।  কলেজটি তার ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলতে বসেছে। শিক্ষক, শিক্ষিকা ও কর্মচারীরা কলেজ এলাকার প্রভাবশালী মহলের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ায় বেদখল সম্পত্তি উদ্ধার সম্ভব হচ্ছে না। কলেজে চাকরি সরকারিকরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরতদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কলেজটিতে মোট ১৩৮ জন কর্মচারী রয়েছেন। যার মধ্যে সরকারি ৩০ জন, মাস্টার রোলে ৭২ জন এবং আরো বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত রয়েছেন ৩৬ জন।
এসব ব্যাপারে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিনে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর বিনতে হুসাইন নাসরিন বানুর সাথে কথা বললে তিনি শিক্ষক স্বল্পতাসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিভাগে শিক্ষকদের পদ শূন্য থাকার বিষয়টি স্বীকার করে আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর ক্লাস রুম সংকট নিরসনে বহুতল ভবন নির্মাণ, পরিবহন ব্যবস্থা, শিক্ষকদের জন্য নতুন আবাসিক ভবন এবং শিক্ষক ও শিক্ষিকাদের জন্য পৃথক ডরমেটরিয়াম নির্মাণ, নতুন বিভাগ খোলার আবেদন জানিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পত্র প্রেরণ করেছি। ছাত্রীদের জন্য নতুন আবাসিক হল নির্মাণের অনুমোদন হয়েছে। এজন্য স্থান নির্ধারণও করা হয়েছে। দ্রুত হল নির্মাণের কাজ শুরু হবে। সাড়ে ৮শ’ একর সুবিশাল এলাকাজুড়ে স্থাপিত দৃষ্টিনন্দন এই কলেজের পাশে বেদখল ৪ একর জমির উপর গড়ে ওঠা বস্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। চাকরি সরকারিকরণ নিয়ে কর্মচারীদের মাঝে ক্ষোভের বিষয়ে বলেন, গত বছরের ডিসেম্বর মাসে কলেজের পক্ষ থেকে মাস্টার রোলে কর্মরতদের বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে তাদের চাকরি সরকারিকরণ আমার এখিতয়ারে নেই শিক্ষা বোর্ডই পারবে। শিক্ষা বোর্ডের ডিজি বলেছেন, শীঘ্রই কর্মচারীদের চাকরি সরকারিকরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
কলেজ পরিচালনায় উন্নয়ন কমিটিসহ খাতা-কলমে ৩৬টি কমিটির নাম থাকলেও মাঠ পর্যায়ে তাদের কার্যক্রম নেই বললেই চলে। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সেবাদানে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও তা বছরজুড়েই বন্ধ থাকে। নেই কোন ওষুধপত্র। স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত শিক্ষার্থীরা। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে একজন বেসরকারি চিকিত্সক ও তার সহকারী নিয়োজিত রয়েছেন। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাসিক ২০ টাকা হারে চাঁদা গ্রহণ করে তাদের বেতন পরিশোধ করা হয়।
সাড়ে ৮শ’ একর অবিভক্ত বাংলায় উচ্চশিক্ষা বিস্তারের জন্য যে কটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিপুল খ্যাতি অর্জন করেছিল কারমাইকেল কলেজ তাদের অন্যতম। ১৯১৬ সালের ১০ নভেম্বর এ কলেজটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তত্কালীন বাংলার গভর্নর লর্ড ডেভিড ব্যারন কারমাইকেল। তারই নামানুসারে কলেজটির নামকরণ হয়। কলেজের মূল ভবনটি স্থাপত্যশিল্পের অনন্য নিদর্শন। একইসাথে ইন্দো-স্যারাসিনিক স্থাপত্য রীতির স্বাক্ষরে ভাস্বর। ড. ওয়াটকিনস ছিলেন এ কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯১৭ সালের জুলাই মাসে এ কলেজে আইএ ও বিএ ক্লাস খোলার অনুমতি দেয়। ১৯২২ ও ২৫ সালে খোলা হয় যথাক্রমে আইএসসি ও বিএসসি ক্লাস। ‘৪৫ সালে কলেজটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় আসে। ১৯৫৩ সালে কলেজটি যুক্ত হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায়। বর্তমানে এটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন। একসময়ে বিহার, জলপাইগুড়ি ও আসাম থেকে ছাত্ররা পড়তে আসতো এ কলেজে। বর্তমানে কলেজে ২১টি বিভাগে অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। ক্লাসরুম রয়েছে মাত্র ৬০টি, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ক্লাসরুম স্বল্পতার কারণে বহু ক্লাস নেয়া সম্ভব হয় না। শিক্ষার্থীদের বসে থাকতে হয়-কখন কোন রুম খালি হবে। রুটিন থাকলেও সে অনুযায়ী ক্লাস হয় না। রুম খালি হলে শিক্ষকদের খবর দেয়া হয়। নেই কোন সুনির্দিষ্ট সময়সূচী। ছাত্র-ছাত্রীদের অভিযোগ, এ ঘটনা নিত্যদিনের। অধিকাংশ ক্লাসরুমে বৈদ্যুতিক ফ্যানের ব্যবস্থা না থাকায় গ্রীষ্মের গরমে হাঁসফাঁস অবস্থায় ক্লাস করতে হয় শিক্ষার্থীদের।
যে কোন বিভাগের টেস্ট পরীক্ষা, ভর্তি পরীক্ষা, সেমিস্টার পরীক্ষা—যে কোন পরীক্ষা হলেই ক্লাস বাতিল করা হয়। শিক্ষকরা বলছেন ক্লাসরুম স্বল্পতার কারণে নিয়মিত ক্লাস নেয়া সম্ভব হয় না। পরীক্ষার স্বতস্ত্র ভবন নেই। শিক্ষক সমস্যা দীর্ঘদিনের। বেশিরভাগ বিভাগে অধ্যাপক পদে শিক্ষক নেই। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় ২৬ শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। ২৫ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য আবাসিক হল মাত্র ৭টি। জিএল, কেবি, ওসমানী, সিএম ছাত্রাবাস থেকে সমপ্রতি বিপুল দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করায় ওইসব হল বন্ধ রাখা হয়েছে। ছাত্রীদের জন্য রয়েছে ৩টি আবাসিক হল। এসব আবাসিক হলের আসন সংখ্যা মাত্র ১ হাজার। ক্যাম্পাসে আবাসন সংকটের কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থী বাইরের মেসে অধিক ভাড়া দিয়ে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে। কলেজের শিক্ষকদের আবাসিক সমস্যা দীর্ঘদিনের। শিক্ষকদের আবাসিক ৩৭টি বাড়ির মধ্যে সবগুলোই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়লেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে সেখানেই বসবাস করছেন।