রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বনাম অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি

 
 
চীন থেকে যে অর্ডার স্থানান্তরিত   হচ্ছে তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রতিযোগী দেশগুলোতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অর্ডার সরিয়ে নেয়ার একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের তুলনায় ভিয়েতনাম, ভারত আর পাকিস্তানের রপ্তানি বেড়েছে অনেক বেশি হারে। তবে পরিবহনে হামলার পরেও রপ্তানি কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন উদ্যোক্তারা। অস্থিতিশীলতা সত্ত্বেও দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে এই হার আরো বৃদ্ধি পাবে বলে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন
 
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় ব্যাহত হচ্ছে দেশের শিল্প উৎপাদন। কমছে রপ্তানি আয়। অস্থিতিশীলতার আশঙ্কায় বিনিয়োগ নিবন্ধনও কমছে। তবে রাজনৈতিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও উদ্যোক্তারা টিকিয়ে রাখছেন অর্থনীতির সচলতা। তাই প্রায় ৮০ দিন অবরোধের পরও কারখানার উত্পাদন অব্যাহত রয়েছে। অব্যাহত রয়েছে রপ্তানি আয়। পরিবহনে হামলার পরেও রপ্তানি কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন উদ্যোক্তারা। দেশি ও বিদেশি অর্থনীতি বিশ্লেষকরা আশা করছেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সত্ত্বেও দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে।
 
সম্প্রতি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এক পূর্বাভাসে চলতি অর্থবছরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ১ শতাংশ হবে বলে জানিয়েছে। আগামী অর্থবছরে (২০১৫-১৬) এ হার বেড়ে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। এডিবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন হচ্ছে না। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বাংলাদেশ বেশ কিছু সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। তবে এসব সংস্কার কার্যক্রমের সাফল্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করবে। অবকাঠামো উন্নয়নের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক ধারায় থাকবে। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়বে বলে মনে করছে এডিবি।
 
গত জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়। এর আগের ৬ মাস অর্থনীতিতে প্রাণবন্ত পরিস্থিতি ছিল। ২০১৪ সালে জাতীয় নির্বাচনের পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হতে শুরু করে। ফলে চলতি অর্থবছরে অপেক্ষাকৃত ভালো প্রবৃদ্ধি হবে বলে আশা করা হয়েছিল। তবে গেল জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া অবরোধ এবং সহিংসতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে কিছুটা বাধার মুখে ফেলে দিয়েছে। কারণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে পরিবহন যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা বিনিয়োগ ও রফতানি কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে। এত বাধার মধ্যেও উত্পাদন কার্যক্রম ও রপ্তানি অব্যাহত রাখা উদ্যোক্তাদের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য। তবে এই কষ্টসাধ্য কাজটাই করছেন উদ্যোক্তারা। তবে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা না থাকলে রপ্তানি আয় হতো আরো অনেক বেশি। এ অবস্থায় দেশের অর্থনীতির স্বার্থে সরকারকে উদ্যোক্তাদের পাশে থাকতে হবে।
 
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো’র (ইপিবি) তথ্যে দেখা গেছে, বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কম ধরা হলেও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে আট মাস শেষে পিছিয়ে রয়েছে রপ্তানি আয়। চলতি বছর রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০ শতাংশ। ইপিবি’র প্রাথমিক হিসাবে দেখা গেছে, গত জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রপ্তানি বেড়েছে আড়াই শতাংশেরও কম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে গত দুই মাস ধরে চলা অবরোধ আর হরতালে ক্রেতারা পিছিয়ে যাচ্ছেন। ক্রেতারা সম্ভাব্য অর্ডারের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমিয়ে তা ভারত, পাকিস্তান আর ভিয়েতনামে নিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে চীন থেকে যে অর্ডার স্থানান্তরিত হচ্ছে তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রতিযোগী দেশগুলোতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অর্ডার সরিয়ে নেয়ার একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের তুলনায় ভিয়েতনাম, ভারত আর পাকিস্তানের রপ্তানি বেড়েছে অনেক বেশি হারে। সর্বশেষ গত ডিসেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ। একই সময়ে ভিয়েতনামের বেড়েছে সাড়ে ৪ শতাংশ, ভারতের ১০ ও পাকিস্তানের বেড়েছে ২০ শতাংশ। বিজিএমইএ সূত্র জানিয়েছে, চলমান পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া আগামী মাসগুলোতে দেখা যাবে। তাতে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া আরো পরিষ্কার হবে। চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩ হাজার ৩২০ কেটি মার্কিন ডলারের রপ্তানির লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে রপ্তানি হয়েছে ২ হাজার ৩০ কোটি ডলারের। বাকী চার মাসে ১ হাজার ২৯০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করতে হবে।
 
এদিকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় আমদানি, রপ্তানি ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম কিছুটা সংকুচিত হওয়ায় দেশের রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরের রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অন্তত ১৩ হাজার কোটি টাকা কম আদায় হতে পারে বলে মনে করছে রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। চলতি অর্থবছরে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। এনবিআরের হিসাবে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি রয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, অর্থবছরের অবশিষ্ট অর্ধেক অদায় করতে হবে ৯০ হাজার ৩২২ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চলমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বাকী ছয় মাসে এ বিশাল পরিমাণ রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে না। ফলে সরকারের ব্যয় কমিয়ে আনতে হবে। নয়তো ব্যাংক ঋণ বাড়াতে হবে।
এদিকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কায় দেশে বিনিয়োগ করতে যথেষ্ট আগ্রহ পাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। তাই কমে যাচ্ছে বিনিয়োগ নিবন্ধন। বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ডের (বিওআই) তথ্যে দেখা গেছে, গত বছরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগে (এফডিআই) নিবন্ধন কমেছে অর্ধেকেরও বেশি হারে। আর নিবন্ধিত বিনিয়োগের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়। বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ডের সর্বশেষ হিসাবে ২০১৪ সালে বিদেশি বিনিয়োগ নিবন্ধন হয়েছে ৯৩  কোটি ৭০ লাখ ডলার। ২০১৩ সালের ২৬২ কোটি ১৫ লাখ ডলার নিবন্ধনের তুলনায় তা ১৬৯ কোটি ডলার কম। প্রকল্পের সংখ্যাও ২০১৩ সালের ১৮১ থেকে ১২৩টিতে নেমে এসেছে। বস্ত্র খাতের বিনিয়োগ পৃথকভাবে নিবন্ধন হলেও মোট বিদেশি বিনিয়োগ নিবন্ধন সন্তোষজনক নয়।