লড়াইয়ের ভেতর লড়াই

ক্লার্ক—ম্যাককালাম
বয়সে ১৭৮ দিনের ব্যবধান দু’জনের; মাইকেল ক্লার্ক একটু বড়। ক্লার্ক ওয়ানডে খেলেছেন ২৪৪টি, ম্যাককালাম ২৪৮টি। টেস্ট ও ওয়ানডে অভিষেকও একেবারে পাশাপাশি সময়ে। সবমিলিয়ে অভিজ্ঞতার বিচারে দু’জন একেবারে কাছাকাছি অবস্থান করছেন। তবে ব্যাটসম্যানশিপ ও লিডারশিপের কথা বললে মাইকেল ক্লার্ক অনেক অনেক এগিয়ে। টেস্ট ও ওয়ানডে ব্যাটিং গড়ে বিস্তর ব্যবধানে পেছনে ফেলবেন তিনি ম্যাককালামকে। অধিনায়কত্বের জন্যও তৈরি হয়েছেন তিলতিল করে। অন্যদিকে ম্যাককালাম কিছুদিন আগেও ‘বিস্ফোরক তরুণ’ বলে পরিচিত ছিলেন। ফলে সামগ্রিক ক্যারিয়ারের বিচারে ক্লার্ককে এগিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু এসব আলোচনাই মিথ্যে হয়ে যাবে চলতি বিশ্বকাপে চোখ বোলালে। এখানে যেন ক্লার্ককে ম্লান করে দিয়ে আবির্ভাব হয়েছে অন্য এক ম্যাককালামের। কী অধিনায়কত্ব, কী ব্যাটিং; পুরো বিশ্বকাপে সবচেয়ে তাক লাগানো নেতা ম্যাককালাম। অসাধারণ আক্রমণাত্মক অধিনায়কত্ব করে নিউজিল্যান্ডকে অপরাজিত রেখেই ফাইনালে নিয়ে এসেছেন এই ওপেনিং ব্যাটসম্যান। নিজের ব্যাট তরবারির মতো চালাচ্ছেন। ৮ ম্যাচে ৪১.০০ গড়ে ৩২৮ রান করেছেন ম্যাককালাম; এর মধ্যে সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে গুড়িয়ে দেয়া ফিফটিও আছে। বিপরীতে ক্লার্ক যেন আক্রমণ করতেই ভুলে গেছেন। ব্যাটে, অধিনায়কত্বে কিছুতেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না সেই ক্লার্ককে। আজ কী তার ফেরার দিন?
গাপটিল-স্মিথ
দু’জনই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছেন অনেকদিন ধরে। দু’জনের নামের আগেই ‘ভবিষ্যত্ ভরসা’ তকমাটাও লেগে আছে অনেকদিন ধরে। মাঝে মাঝে জ্বলে উঠলেও ঠিক জাত চেনাতে পারছিলেন না যেন। অবশেষে এই বিশ্বকাপ ও তার আগে থেকে নিজেদের চেনাতে শুরু করলেন মার্টিন গাপটিল ও স্টিভেন স্মিথ। স্মিথকে তো বলা হচ্ছে, চলতি গ্রীষ্মের সেরা আবিষ্কার। টেস্টে ক্লার্কের বদলে অধিনায়কত্ব করে ‘ভবিষ্যত্ নেতা’ হিসেবেও নিজেকে প্রমাণ করে ফেলেছেন। বিশ্বকাপে সেই সোনালী ফর্মটা ধরে রেখে অস্ট্রেলিয়াকে কাঁধে করে ফাইনালে তুলে এনেছেন। বলা হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং এখন স্মিথের কাঁধে সওয়ার। ঠিক স্মিথের মতো একার কাঁধে গাপটিলকে সব দায়িত্ব নিতে হচ্ছে না। কিন্তু প্রয়োজন হলে ব্যাটটা কতো চওড়া হতে পারে পরপর দু’ম্যাচে সেঞ্চুরি ও ডাবল সেঞ্চুরি করে সেটা বুঝিয়ে দিয়েছেন। এখন শেষ লড়াইয়ের পালা।
ম্যাক্সওয়েল—অ্যান্ডারসন
লোকেরা তাদের বোলিং ক্ষমতাটার কথা ভুলে যায় বলে দু’জনই একটু কষ্ট পেতে পারেন। তবে এটা আনন্দের বিষয় যে, লোয়ার মিডল অর্ডারে দু’জনেরই পরিচিতি মূলত বিনোদনদায়ী ব্যাটসম্যান হিসেবে। এ ক্ষেত্রে ম্যাক্সওয়েল হয়তো দর্শকের মনে একটু এগিয়ে থাকবেন। অপ্রচলিত শট আর বড় বড় ছক্কা মারার কারণে বিনোদন দেয়ার ক্ষমতাটা তারই একটু বেশি। ৭ ম্যাচে ৬৪.৮০ গড়ে ৩২৪ রান করেছেন। সেই সঙ্গে অত্যন্ত কার্যকর অফস্পিন দিয়ে প্রয়োজনের সময় ভড়কে দিতে পারেন প্রতিপক্ষকে; ইতিমধ্যে ৫ উইকেট ঝুলিতেও পুরেছেন। যেটা মেলবোর্নে হয়ে উঠতে পারে অস্ট্রেলিয়ার বড় অস্ত্র। তবে কোরি অ্যান্ডারসন অলরাউন্ডার হিসেবে চলতি বিশ্বকাপে অন্তত এগিয়েই আছেন। ব্যাট হাতে মিডল অর্ডারে নিয়মিত ভরসা হয়ে ৮ ম্যাচে ২৩১ রান করেছেন এবং ১৪টা উইকেট তুলে নিয়েছেন মিডিয়াম পেস বোলিং দিয়ে। আজ ফাইনালের ভাগ্য ঠিক করে দিতে পারেন এই দুই অলরাউন্ডারও।
স্টার্ক-বোল্ট
মিলটা হলো, দু’জনই বাঁহাতি নিখুঁত ফাস্ট বোলার। আলোটা ছিলো আসলে অন্য দু’জনের ওপর—মিচেল জনসন ও টিম সাউদি। তারা খুব খারাপ করছেন তা নয়। তবে গতির ঝড় ও আগ্রাসনে বিশ্বকাপেরই সেরা দুই বোলার মিচেল স্টার্ক ও ট্রেন্ট বোল্ট। স্টার্ক ৭ ম্যাচে ২০টি এবং বৌল্ট ৮ ম্যাচে ২১টি উইকেট নিয়ে সেরা বোলার হওয়ার লড়াইয়ে রীতিমতো হাতাহাতি করছেন। তরুণ দুই ফাস্ট বোলারই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ছোট্ট মেয়াদেই রীতিমতো সেনসেশন হয়ে উঠেছেন। গ্রেট অস্ট্রেলিয়ানরা বিশ্বাস করেন, নতুন প্রজন্মের অস্ট্রেলিয়ার পেস বোলিংটা সামলাবেন স্টার্ক। আর বোল্টকে তো ‘জুনিয়র বন্ড’ বলাটা রেওয়াজে পরিণত হয়ে গেছে। এখন দেখার বিষয়, আজ সবচেয়ে বড় মঞ্চটা কে দখলে নিতে পারেন।
লেহম্যান-হেসন
দু’জনকে পাশাপাশি দাঁড় করালে তুলনাটাও হাস্যকর হয়ে ওঠে। একদিকে অস্ট্রেলিয়ার সোনালী যুগের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান ও বিশ্বজয়ী ড্যারেন লেহম্যান; অন্যদিকে অজ্ঞাতকূলশীল এক মাইক হেসন। লেহম্যানের পরিচয় দেয়াটাও বাতুলতা। অস্ট্রেলিয়ার সর্বজয়ী দলের এই সদস্য নিজগুণেই পরিচিত। তবে হেসন জোরগলায় বলতে পারেন, বর্তমান কর্মে তিনি অন্তত এগিয়েই আছেন লেহম্যানের চেয়ে। অস্ট্রেলিয়ার সংকটকালে ডেকে আনা লেহম্যান টানা সাফল্য কোচ হিসেবে পাচ্ছিলেন না। বিশ্বকাপেও মাঝে মাঝেই হোঁচট খেতে হয়েছে তাকে। আর একেবারে অপরিচিত ঘরোয়া ক্রিকেট দল ওটাগো থেকে আসা হেসন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এসেই সফলতা পেতে শুরু করেছেন। আজ এক বিশ্বজয়ীকে হারিয়ে দেয়ার চ্যালেঞ্জ তার।