আস্থা সঙ্কটে পুঁজিবাজার তারল্য সঙ্কট কাটছে না

পুঁজিবাজারে দফায় দফায় দরপতনের ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। গত চার বছরে তিন চার দফায় কয়েকদিন লেনদেন ভাল হলেও তা স্থায়ী হয়নি। বরং বেশিরভাগ সময়ই লেনদেন হয়েছে তিনশ’ কোটি টাকার নিচে। এর মধ্যে সময়ে সময়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার তীব্রতাও বাজারে আস্থা সঙ্কট বাড়াতে ইন্ধন যুগিয়েছে। ২০১৩ সাল জুড়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার পর গেল জানুয়ারি থেকে দেশে ফের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা শুরু হয়েছে। তাই বিনিয়োগকারীদের আস্থার সঙ্কটও প্রশমিত হয়নি। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা চলতে থাকলে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয় কমে যাবে। ফলে কোম্পানির শেয়ারদরও কমতে পারে। এ জন্য শেয়ার বিনিয়োগকারীরা বাজারে কম বিনিয়োগ করছেন। এ অবস্থায় কেউ নতুন তহবিল আনতে উত্সাহ পাচ্ছেন না। ফলে তারল্য সঙ্কট তীব্র হয়ে বাজারের লেনদেন কমে গেছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্যে দেখা গেছে, গত ডিসেম্বর থেকে বাজারের লেনদেন কমতে শুরু করেছে। বর্তমানে লেনদেন নেমে এসেছে আড়াইশ’ কোটি টাকায়। সম্পদ ও আয়ের তুলনায় বাজারে বেশ কিছু কোম্পানির শেয়ারদর অনেক কমে গেলেও বিনিয়োগকারীরা শেয়ার ক্রয়ের দিকে ঝুঁকছেন না। আস্থা সঙ্কট কেটে গেলে কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের ঘোষণায় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কমে আসার সম্ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। গেল সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে সাড়ে তিনশ’ কোটি টাকারও বেশি। এ অবস্থায় যে কোনভাবেই হোক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারে আস্থা ও তারল্য সঙ্কট ২০১০ সালে বাজার ধ্বসের পর থেকেই শুরু হয়েছে। বাজার সংস্কারের লক্ষ্যে ডিমিউচুয়ালাইজেশন (স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা থেকে মালিকানা পৃথকীকরণ), সার্ভিল্যান্স সফটওয়্যার স্থাপন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অনিয়ম করায় শাস্তি প্রদান এবং লেনদেনে নিষ্পত্তিতে আধুনিকতা আনা হলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরেনি। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিনিয়োগকারীরা সব সময় বাজারের সূচক ঊর্ধ্বমুখী দেখতে চান। বাজারের সংস্কারমূলক কাজে তাদের দৃষ্টি নেই। বরং বাজারের সূচক বাড়লো কিনা সেটাই তারা বিবেচনা করে। তবে ধীরে ধীরে বাজারে দক্ষ বিনিয়োগকারীও আসতে শুরু করেছেন। তাই যেসব কোম্পানির দাম তুলনামূলক কমে যায় সেসব কোম্পানিতে তারা বিনিয়োগ করে মুনাফা তুলে নিচ্ছেন। দাম কমে যাওয়ায় তারা হতাশ হচ্ছেন না, বরং আশান্বিত হয়ে বিনিয়োগ করছেন।
এদিকে তারল্য সঙ্কটের কারণ হিসেবে বাজার সংশ্লিষ্টরা আস্থা সঙ্কটের পাশাপাশি ঋণাত্মক মার্জিন ঋণকেও দায়ী করেন। কারণ ঋণাত্মক মার্জিন ঋণে এখনও অনেক টাকা আটকে আছে। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ করতে পারছেন না। আটকে থাকা মার্জিন ঋণ লেনদেনে ফিরিয়ে আনতে পদক্ষেপ নেয়ার পরও তা সম্পূর্ণ লেনদেনে ফিরে আসেনি। জানা গেছে, ঋণাত্মক পোর্টফোলিওতে থাকা গ্রাহকের হাজার হাজার কোটি টাকার শেয়ার লেনদেনে ফিরিয়ে আনতে মার্জিন ঋণ বিধিমালার ৩ (৫) উপ-বিধির কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়েছে। চার দফা এ স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। মার্জিন ঋণ বিধিমালার ৩ (৫) উপ-বিধি অনুযায়ী, শেয়ারদর কমে যাওয়ার কারণে গ্রাহকের নিজস্ব ইকুইটি মার্জিন ঋণের ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমলে গ্রাহক নগদ অর্থ দিয়ে ঋণ সমন্বয় করবেন। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট হিসাবে শেয়ার লেনদেন করা যাবে না। এদিকে ২০১০ এর বাজার ধ্বসের পরও দফায় দফায় দর পতনের ফলে গ্রাহকের নিজস্ব ইকুইটি মার্জিন ঋণের ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। ফলে হাজার হাজার কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন অযোগ্য হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় ডিএসইর প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে মার্জিন ঋণ বিধিমালা, ১৯৯৯-এর ৩(৫) উপ-ধারা স্থগিতাদেশ দেয় বিএসইসি। এ বিধিমালা স্থগিতাদের দেয়ায় মার্জিন ঋণে আটকে পড়া শেয়ার লেনদেনযোগ্য হয়। এরপরও মার্জিন ঋণে আটকে থাকা বিশাল অঙ্কের অর্থ বাজারে লেনদেনে আসতে পারছে না।