ফেরারির সংজ্ঞা নিয়ে বিভ্রান্তি

ফেরারি আসামির সংজ্ঞা নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সিটি নির্বাচনে দায়িত্বরত রিটার্নিং অফিসারদের কাছে ইতিমধ্যে পাঠানো নির্দেশনায় জানিয়েছে, কোন আদালত কর্তৃক ফেরারি আসামি ঘোষিত ব্যক্তি নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হবেন। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯-তেও একই নির্দেশনা রয়েছে। তবে এর ব্যাখ্যায় নির্বাচন কমিশন মনে করছে- কোন আদালত কর্তৃক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারিকৃত ব্যক্তি জামিন না নিয়ে পলাতক থাকলে তিনিই ফেরার হিসেবে গণ্য হবেন। কমিশন থেকে রিটার্নিং অফিসারদের কাছে অলিখিত নির্দেশনায়ও এ ব্যাখ্যা জানানো হয়েছে; কিন্তু আইন বিশেষজ্ঞরা কমিশনের এই ব্যাখ্যার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।      এ প্রসঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, ‘ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপিসি) ৮৭ ও ৮৮ ধারার কার্য সম্পাদনের পর ৩৩৯ ধারা অনুযায়ী বিচারক যেদিন থেকে কোন আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার কাজ শুরু করবেন সেদিন থেকেই ওই ব্যক্তি আইনানুযায়ী ফেরার।’

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯-এর ৯ ধারায় সিটি নির্বাচনে মেয়র ও কাউন্সিলরগণের যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বর্ণনা রয়েছে। ওই ধারার ২ উপ-ধারায় বলা আছে, ‘কোন ব্যক্তি মেয়র বা কাউন্সিলর পদে নির্বাচিত হইবার এবং উক্তরূপ মেয়র বা কাউন্সিলর পদে থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি তিনি (ধ) কোন আদালত কর্তৃক ফেরারি আসামি হিসেবে ঘোষিত হন।’ এখন এই ‘ফেরারি আসামি ঘোষণা’ নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। গতকাল রাতে নির্বাচন কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, ‘কোন উপযুক্ত আদালত কর্তৃক ওয়ারেন্ট ঘোষিত আসামি জামিন না নিয়ে পলাতক থাকলেই তিনি ফেরারি আসামি হিসেবে গণ্য হবেন।’
কিন্তু এই ব্যাখ্যার সঙ্গে দ্বি-মত পোষণ করে ড. শাহদীন মালিক ইত্তেফাককে বলেন, ‘কোন ব্যক্তিকে ফেরার ঘোষণা করতে হলে ঘোষণার আগে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী কতগুলো কার্যক্রম সম্পাদন করতে হয়। ওই বিধির ৮৭ ও ৮৮ বিধান সম্পাদন না হওয়া পর্যন্ত কাউকে ফেরার ঘোষণা করা যায় না।’ প্রসঙ্গত, ৮৭ (১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোন আদালতের এইরূপ বিশ্বাসের কারণ থাকে (সাক্ষ্য গ্রহণ করিয়া বা না করিয়া) যে, উক্ত আদালত যাহার বিরুদ্ধে পরোয়ানা প্রদান করিয়াছেন সেই ব্যক্তি পলাতক হইয়াছে অথবা পরোয়ানা যাহাতে কার্যকরী না হইতে পারে তজ্জন্য আত্মগোপন করিতেছে, তাহা হইলে উক্ত আদালত তাহাকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে ও নির্দিষ্ট সময়ে (ঘোষণা প্রকাশের তারিখ হইতে ৩০ দিনের কম নহে) হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়া একটি লিখিত ঘোষণা প্রকাশ করিতে পারেন। (২) এই ঘোষণা নিম্নলিখিতরূপে প্রকাশ করিতে হইবে:(ক) উক্ত ব্যক্তি সাধারণত যেইখানে বাস করে, সেই শহরে অথবা গ্রামের কোন প্রকাশ্য স্থানে উহা প্রকাশ্যে পাঠ করিতে হইবে; (খ) উক্ত ব্যক্তি সাধারণত যেইখানে বাস করে সেই বাড়ি বা বস্তু অথবা শহরে বা গ্রামের কোন প্রকাশ্য স্থানে উহা লটকাইয়া দিতে হইবে; এবং (গ) উহার একটি কপি আদালত ভবনের কোন প্রকাশ্য স্থানে লটকাইয়া দিতে হইবে। (৩) ঘোষণা প্রদানকারী আদালত যদি এই মর্মে একটি লিখিত বিবৃতি দেন যে, ঘোষণাটি একটি নির্দিষ্ট দিনে যথাযথভাবে প্রকাশিত হইয়াছে, তাহা হইলে এই ধারার শর্ত যে পূরণ হইয়াছে এবং ঘোষণাটি যে উক্ত দিনে প্রকাশিত হইয়াছে , বিবৃতিটি তাহার চূড়ান্ত প্রমাণ বলিয়া গণ্য হইবে।’
শাহদীন মালিক বলেন, তারপর ফৌজদারি কার্যবিধির ৮৮ ধারা অনুযায়ী পলাতক ব্যক্তির সম্পত্তি ক্রোকের জন্য আদালতকে ক্রোক পরোয়ানা জারি করতে হয়। ওই ক্রোক পরোয়ানা অনুযায়ী স্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের পর ৩৩৯ (খ) (১) ধারা অনুযায়ী বিচার আদালতকে আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার কাজ শুরু করতে হয়। ওই ধারায় বলা হয়েছে, ‘৮৭ ও ৮৮ ধারার বিধান পালন করিবার পর আদালতের বিশ্বাস করিবার কারণ থাকে যে, আসামিকে যাহাতে গ্রেফতার ও বিচারে সোপর্দ করা না হয় সেই জন্য সে পলায়ন করিয়াছে বা আত্মগোপন করিয়াছে এবং তাহাকে গ্রেফতার করিবার আশু সম্ভাবনা নাই, সেইক্ষেত্রে নালিশি অপরাধ আমলে গ্রহণকারী আদালত বহুল প্রচারিত কমপক্ষে দুইটি বাংলা দৈনিক সংবাদপত্রে প্রকাশিত আদেশ দ্বারা উক্ত ব্যক্তিকে আদেশে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেই আদালতে হাজির হইবার নির্দেশ দিবেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি উক্ত নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হইলে তাহার অনুপস্থিতিতে তাহার বিচার অনুষ্ঠিত হইবে।’ 
এ প্রসঙ্গে শাহদীন মালিক বলেন, যখন কোন ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে বিচার কার্যক্রম শুরু হয় তখন থেকে ওই ব্যক্তি আইনের দৃষ্টিতে ফেরার।

ফৌজদারি অপরাধ আইনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট গোলাম কিবরিয়া ইত্তেফাককে বলেন, কোন মামলায় জামিনে থাকার পর কোন ব্যক্তি যদি বিচার চলাকালে অনুপস্থিত থাকেন তাহলে তিনিও আইনের দৃষ্টিতে পলাতক। সুতরাং বিচার শুরু হওয়ার আগে কাউকে ফেরার ঘোষণা করা যায় না। তিনি বলেন, কাউকে ফেরার ঘোষণা করতে হলে আদালতকে ঘোষণা দিতে হবে। আদালতের ঘোষণা ছাড়া কাউকে ফেরার বলা যাবে না।