ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের আক্রমণের মধ্যে প্রেসিডেন্ট আব্দ-রাব্বু মনসুর হাদি পিছু হঠতে বাধ্য হলে জানুয়ারিতে বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করে বেশ কিছুদিন তাকে গৃহবন্দি করে রাখে। গত মাসে সানা থেকে কোনরকমে পালিয়ে দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এডেনে আশ্রয় নেন হাদি। কিন্তু শিয়া এই বিদ্রোহী ও তাদের মিত্র বাহিনী এডেনের বিমান ঘাঁটি দখল নিয়ে এডেন অভিমুখে অগ্রসর হয়। হাদির এডেনের বাসভবন লক্ষ্য করেও শুরু করে বোমা হামলা। সুন্নি সম্প্রদায়ের মনসুর হাদি যখন কোণঠাসা হয়ে পড়েন তখন সুন্নি প্রধান দেশ সৌদি আরবের সাহায্য প্রার্থনা করলে তারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। সৌদি আরবের বিশেষ নিরাপত্তার মধ্যে হাদিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়। এরই মাঝে ইয়েমেনে শুরু হয় সৌদির নেতৃত্বে আরব বাহিনীর বিমান হামলা। নিজেদের অভিযানের ব্যাখ্যায় সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ জানায়, ইয়েমেনের বৈধ সরকারের পতন রোধে যা করতে হয় তার সবই করা হবে।
হুতি যোদ্ধা ও এর সহযোগী সেনাবাহিনীর ইউনিটগুলো বেশ কিছুদিন ধরেই দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে চলছিলো। সর্বশেষ তারা ইয়েমেনের আরব সাগর তীরের বন্দর শাকরা দখল করে নেয়। এই বন্দরটি দখলের মাধ্যমে হুতিদের সম্মিলিত বাহিনী প্রথমবারের মতো আরব সাগরের উপকূলে পৌঁছে গিয়েছিলো। তবে বৃহস্পতিবার থেকে শুরু করে গত চার দিনের ধারাবাহিক বিমান হামলায় অনেকটাই সফলতা পেয়েছে আরব জোট। ইয়েমেনের রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ নেয়া বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। দেশটির উত্তরাঞ্চলে হুতি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও বিমান হামলা চালানো হচ্ছে। বিদ্রোহীরা সৌদিতে আত্মঘাতী হামলা চালানোর হুমকি দেয়ার পর আরো জোরালো হয়েছে আরব জোটের হামলা। সৌদির দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত শহরে যাতে হাউথি বিদ্রোহীরা অগ্রসর হতে না পারে সেদিকে নজর রাখছে সৌদি।
সৌদি ভিত্তিক আল-আরাবিয়া টিভি জানায়, বিমান হামলায় সৌদি আরব ছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, জর্ডান, মরক্কো, সুদান অংশ নিচ্ছে। এদের মধ্যে মিশর, জর্ডান ও সুদান স্থল অভিযানে অংশ নিতেও প্রস্তুত রয়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব বাহিনীর এ হামলা নিয়ে নতুন করে দুইটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ। সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোটের প্রায় সকল সদস্যই এই হামলার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে ইতিমধ্যে যুদ্ধবিমানসহ সব ধরনের সামরিক সহায়তা বৃদ্ধি করেছে। মিশরের শারম এল-শেখ এ আরব লীগের নেতাদের শনিবারের সম্মেলনে ইয়েমেনের হাউথি বিদ্রোহীদের বিপক্ষে তাদের এ যুদ্ধের বিভিন্ন দিক নির্ধারণ করেছেন। সৌদির নেতৃত্বে যৌথ সামরিক বাহিনী গড়ে তোলারও সিদ্ধান্ত হয় ঐ বৈঠকে। বৈঠকে ইয়েমেন থেকে পালিয়ে যাওয়া প্রেসিডেন্ট মনসুর হাদিও অংশ নিয়েছেন। আরব জোটের পক্ষে সমর্থন রয়েছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, তুরস্ক, বেলজিয়াম। তবে শিয়া হাউথিদের প্রতি পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করে সৌদিকে আক্রমণ থেকে সরে আসারও আহ্বান জানিয়েছে শিয়া প্রধান ইরান। আর ইরানের পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে চীন ও রাশিয়া।
সৌদি আরবের মিত্র দেশ হিসাবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য সরাসরি কোন পক্ষকেই সমর্থন করার কথা পরিষ্কার করেনি। ইয়েমেনের ওপর সৌদির হামলায় ইরান অখুশি হওয়ায় নিজেদের সম্পৃক্ততার কথাও এড়িয়ে যেতে চাইছে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর এ দেশটি। ইয়েমেনে হামলা শুরু হওয়ার পর মার্কিন কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, সৌদি আরব এখনো ইয়েমেনে বিমান হামলা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যুক্তরাষ্ট্রকে দেয়নি। দেশটি ঐ অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চাইছে। মার্কিন সামরিক কেন্দ্রীয় কমান্ডের প্রধান জেনারেল লিওড অস্টিন গত বৃহস্পতিবার মার্কিন সিনেটের এক শুনানিতে জানান, হামলার আগে সৌদির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রধানের সঙ্গে তার কথা হয়। বিমান হামলা নিয়ে সৌদির পরিকল্পনা এবং উদ্দেশ্যে সম্পর্কে তারা বেশি কিছু জানেন না। তবে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে তারা নিয়মিত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছেন এবং ইয়েমেন হামলার কারণও ব্যাখ্যা করে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে। যুক্তরাষ্ট্রে সৌদির রাষ্ট্রদূত আবদেল আল জুবায়ের বলেন, ইয়েমেনে হামলা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ট যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। ইয়েমেন হামলার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, হাউথি বিদ্রোহীরা প্রেসিডেন্ট হাদির সর্বশেষ আশ্রয়স্থল এডেন শহরের দিকে যাচ্ছিলো। এ কারণেই দ্রুত হামলা করতে বাধ্য হয় আরব জোট।
এদিকে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্টের প্রতি সর্বসম্মত সমর্থন দিয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ নিউইয়র্কে এক জরুরি বৈঠকের পর দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পরিষদ ইয়েমেনের ঐক্য, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার পক্ষে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছে। সুন্নি প্রেসিডেন্ট মনসুর হাদির ডাকে সাড়া দিয়ে বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোট। অন্যদিকে শিয়া প্রধান ইরান শিয়া হুতিদের পক্ষ নিয়ে এ হামলা বন্ধ করে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছে। এখনো আলোচনার কোন ইঙ্গিত দেয়া হয়নি সৌদির পক্ষ থেকে। আবার আলোচনার কথা বললেও এখনো কোন ধরনের হামলার পদক্ষেপও নিতে দেখা যায়নি ইরানকে। যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে উভয় পক্ষের মাঝামাঝি অবস্থানে। এখন দেখার বিষয়, যুদ্ধ নাকি সংলাপের মধ্যদিয়ে ইয়েমেন সঙ্কটের সমাধান হয়।