যে পাইলট বিমান চালিয়ে যাত্রীদের জীবন রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন তাদেরই একজন আকাশে পরিণত হলেন মৃত্যুদূতে! ফ্রান্সে সম্প্রতি জার্মানির যাত্রীবাহি বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ১৫০ আরোহীর মৃত্যুর কারণ উদঘাটন করতে গিয়ে জানা গেল এই ভয়ানক তথ্য।
পাইলটরা বিমান ওড়ানোর আগে ইঞ্জিন চালু করা, আকাশে ওঠানো থেকে শুরু করে গন্তব্যস্থলে নিরাপদে নামানো পর্যন্ত সব দায়িত্ব পালন করেন। তাদের উপর আস্থা রেখেই নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েন কিংবা কাজে ব্যস্ত থাকেন যাত্রীরা। পাইলট কিংবা কো-পাইলট যখন বিমান চালনায় নিয়োজিত থাকেন তখন তার ব্যক্তিগত সবকিছুই গৌণ হয়ে যায়। মুখ্য হয়ে ওঠে যাত্রীদের জীবন। কিন্তু ব্যতিক্রম দেখা গেল গত মঙ্গলবার আল্পস পর্বতমালার ফরাসি অংশে বিধ্বস্ত জার্মানউইংসের এয়ারবাস-৩২০-এর কো-পাইলট অ্যান্ড্রিয়াস লুবিেসর বেলায়। ফ্লাইট রেকর্ডারের অডিও বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা প্রায় নিশ্চিত হয়েছেন যে কো-পাইলটই ইচ্ছে করে বিমানটি বিধ্বস্ত করেছিলেন। এজন্য তিনি পাইলটকে ককপিটে অবরুদ্ধ করেও রাখেন।
একটি পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লুবিেসর সাবেক বান্ধবী মারিয়া ডাব্লিউ বলেছেন, লুবিত্স অনেক আগেই এ ধরনের কাণ্ড ঘটানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। তার ইচ্ছা ছিল আরো বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটানোর। মারিয়া জানান, গত বছর তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারা ইউরোপে ভ্রমণে যান। সেই সময় লুবিত্স তাকে বলেছিলেন, দেখে নিও, আমি এমন একটা ঘটনা ঘটাব যা সবকিছু বদলে দেবে এবং আমার নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। মারিয়া কথাটি শুনেছিলেন মাত্র। সেটি কখনো মনে রাখেননি। ভাবতেও পারেননি যে তারই বন্ধু এমন একটা মর্মান্তিক ঘটনা ঘটাবেন যেটি মানুষকে কেবল সারাজীবন কাঁদাবে এবং মানুষের কাছে ভিলেনে পরিণত হবেন তিনি। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, লুবিেসর চরিত্রের দুটি দিক ছিল। প্রকাশে তিনি স্মার্ট এবং বন্ধুত্বপূর্ণ ছিলেন। কিন্তু ঘরের ভেতর তিনি ছিলেন আগ্রাসী এবং বিষণ্ন। আর এ কারণেই তার সঙ্গে মারিয়ার সম্পর্কটা বেশি দূর এগোয়নি। যদিও ওই সময় তারা দুজনই সুখেই দিন কাটিয়েছিলেন। লুবিত্স তার পাইলট হওয়ার স্বপ্নের কথা মারিয়াকে জানিয়েছিলেন। মারিয়া জানান, লুবিেসর মধ্যে নিয়ম ভাঙার একটা প্রবণতা ছিল। তিনি লুফথানসার পাইলট হিসেবে চাকরি করতে চাইলেও স্বাস্থ্যগত কারণে সেটা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ফ্লাইট ক্লাব লুফথানসার প্রধান নির্বাহী কার্স্টেইন স্পোর বলেন, ২০০৮ সালে লুবিত্স পাইলটের প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। তবে শারীরিক সমস্যার কারণে মাঝপথে তা বন্ধ হয়ে যায়।
লুবিেসর কেবল শারীরিক সমস্যাই ছিল না। মানসিক সমস্যাও ছিল। এ বিষয়টি জানা যায় তার বাড়িতে তল্লাশি করতে গিয়ে। ফ্রান্সের অনুরোধে জার্মান পুলিশ তার স্থানীয় বাড়ি এবং তার নিজের ফ্লাটে তল্লাশি চালিয়েছে। পুলিশ ওই ফ্ল্যাটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু কাগজপত্র পেয়েছেন। এগুলো ডাক্তারি রিপোর্ট বলে জানিয়েছে পুলিশ। সেখানে দেখা যায়, তিনি মানসিক বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। চিকিত্সকরা তাকে বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন, এমনকি বিমান দুর্ঘটনার দিনেও। কিন্তু লুবিত্স নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ এবং বন্ধুদের কাছে তার এই অসুস্থতার কথা গোপন রেখেছিলেন। দুর্ঘটনার দুই দিন আগে তার ফেসবুক পাতাটিও গায়েব হয়ে যায়।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে ফ্লাইট ক্লাবে তার বন্ধুদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, অ্যান্ড্রিয়াস লুবিত্স আকাশে উড়তে ভালোবাসতেন। তিনি এটিকে সবসময় উপভোগ করতেন। ক্লাবের সদস্য পিটার রাকার জানান, ওই যুবক সবসময় প্রফুল্ল থাকতেন। তিনি একজন সচেতন পাইলট ছিলেন। সেই ব্যক্তিটি এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটাতে পারেন ভাবতেই পারছি না। লুফথানসার মুখপাত্র মার্টিন রিকেন জানান, লুবিত্স জার্মান উইংসে কো-পাইলট হিসেবে যোগ দেন ২০১৩ সালে। তিনি ৬৩০ ঘণ্টা বিমান চালিয়েছেন। বিমান চালনার শতভাগ যোগ্যতা তার মধ্যে ছিল, কোনো সীমাবদ্ধতা ছিল না তার।
জার্মানউইংসের ফ্লাইট ফোরইউ৯৫২৫তে মোট ১৫০ জন আরোহী (১৪৪ জন যাত্রী, চারজন কেবিন ক্রু এবং দুইজন ক্রু) ছিলেন যাদের মধ্যে কো-পাইলট নিজেও আছেন। নিজে তো মারা গেছেনই, বাকি ১৪৯ জনকেও নিয়ে গেছেন সঙ্গে। এই ১৪৯ জনের মধ্যে ছিলেন ১৬ জন শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে ১৪ জন ছাত্রী এবং দুইজন ছাত্র। সঙ্গে ছিলেন দুইজন শিক্ষক। এরা স্পেনে একটি কর্মসূচি শেষ করে দেশে ফিরছিলেন। জার্মানির স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ওই স্কুল থেকে ৪০ জনের যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু লটারির মাধ্যমে ১৬ জনকে নির্ধারণ করা হয়।
বিমানের ককপিট ভয়েস রেকর্ডার থেকে জানা যায়, মঙ্গলবার গ্রিনিচ মান সময় ৯টা ০১ মিনিটে স্পেনের বার্সেলোনা বিমানবন্দর থেকে জার্মানির ডুয়েসলড্রফের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে ফ্লাইট ফোরইউ৯৫২৫। সমুদ্রের ওপর দিয়ে ফ্রান্সের দিকে যাচ্ছিল। ৯টা ৩০ পর্যন্ত বিমানটি স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। ৯টা ৩০ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডে বিমানটি শেষবারের মতো এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে এবং হঠাত্ করেই এটি ৩৮ হাজার ফুট উঁচু থেকে ১০০ ফুটে নেমে আসে। ৯টা ৩১ মিনিটে বিমানটি অপ্রত্যাশিতভাবে অন্যদিকে যেতে শুরু করে। ওই সময় অ্যান্ড্রিয়াস লুবিত্সই কেবল ককপিটে ছিলেন। পাইলট হয়তো বাথরুমে গিয়েছিলেন। বাথরুমের দরজা খোলার শব্দও কন্ট্রোল রুম থেকে শোনা গিয়েছিল। ৯টা ৩৫ মিনিটে কন্ট্রোল রুম থেকে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করার পরও সম্ভব হয়নি। কো-পাইলট কোনো সাড়া দেননি। এ সময় পাইলট হয়তো ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। ৯টা ৪০ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডে রাডারে বিমানটির অবস্থান ৬ হাজার ১৭৫ ফুট ওপরে দেখা যায় যা আল্পস পর্বত থেকে মাত্র দুই হাজার ফুট ওপরে। দশ মিনিটেরও কম সময় বিমানটি আকাশে ওড়ে এবং অবশেষে পর্বতে আছড়ে পড়ে। এ সময় কো-পাইলট দুর্যোগের আভাস দিয়ে কোনো কল করেননি কিংবা তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। অথচ ওই সময় তার শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক ছিল।
বিমান রক্ষাকর্তাদের দোষে যেসব দুর্ঘটনা: ২০১৩ সালের ২৯ নভেম্বর নামিবিয়ায় যে বিমান দুর্ঘটনা ঘটে তাতে ৩৩ জন নিহত হয়। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, এর দায় পাইলট এবং কো-পাইলটের। ১৯৯৯ সালে মিসরের এয়ার বোয়িং-৭৬৭ বিধ্বস্ত হয়। নিহত হন ২১৭ জন আরোহী। এ ক্ষেত্রেও কো-পাইলটই দায়ী বলে তদন্তে জানা যায়। তবে এর পেছনে যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ১৯৯৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে একটি বিমান বিধ্বস্ত হয় যাতে নিহত হয় শতাধিক। জানা যায়, ওই বিমানের পাইলট কর্মক্ষেত্রে নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছিলেন। সন্দেহ করা হয়, তিনি ইচ্ছা করেই ফ্লাইট রেকর্ডার বন্ধ করে দেন এবং বিমানটি পানিতে ডুবিয়ে দেন।