আব্বাস-খোকন ঋণগ্রস্ত

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর-পোরেশনের মেয়র নির্বাচনে প্রার্থীদের অধিকাংশ ঋণগ্রস্ত। সবচেয়ে বেশি ঋণ বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের। তারপরে রয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী সাঈদ খোকনের। হলফনামায় দেয়া তথ্য অনুযায়ী আব্বাসের দায়দেনা রয়েছে ৭৫ কোটি ৬৫ লাখ ২৫ হাজার ৯০৩ টাকা। অন্যদিকে সাঈদ খোকনের দেনা আছে ১৯ কোটি ২৭ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। মেয়র প্রার্থী নগর বিএনপির নেতা আবদুস সালামের ৫ লাখ ১৬ হাজার ২৫৫ টাকা।

গত রবিবার তিন সিটি নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীরা মনোনয়নপত্রের সঙ্গে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হলফনামা দাখিল করেছেন। নির্বাচন কমিশন গতকাল রাত ৯টা পর্যন্ত শুধুমাত্র ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রামের প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাসের সম্পদও যেমন বেশি তেমনি দায়দেনাও বেশি। মামলার দিক দিয়েও তিনি এগিয়ে আছেন। তার বিরুদ্ধে বর্তমানে ফৌজদারী মামলা রয়েছে ৩৭টি। এছাড়া অতীতে তার বিরুদ্ধে আরো ২৪টি মামলা ছিল। হলফনামা অনুযায়ী গত ২৭ মার্চ পর্যন্ত মির্জা আব্বাসের কাছে নগদ টাকা আছে ৫০ লাখ। তার স্ত্রীর কাছে ১ লাখ। ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমাকৃত অর্থের পরিমাণ ১০ লাখ ৬২ হাজার ১২৩ টাকা। স্ত্রীর জমা আছে ৩২ লাখ ৯৪ হাজার ৯৫ টাকা। বন্ড, ঋণপত্র, স্টক এক্সচেঞ্জ তালিকাভুক্ত ও তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানীর শেয়ার আছে ৩৫ কোটি ৬ লাখ ৭৯ হাজার ১শ টাকা (ঢাকা ব্যাংক লিমিটেড) এবং ৪২ কোটি ৪৮ লাখ ৩৫ হাজার ৮৪৫ টাকা (বি/ও)। তার স্ত্রীর নামে বন্ড ও ঋণপত্র আছে ২ লাখ ৭৪ হাজার ৬৬০ টাকা। ঢাকা ফোনে বিনিয়োগ আছে ১০ কোটি টাকা। এছাড়া কোম্পানীর শেয়ার আছে ৯৫ লাখ ৭৯ হাজার ৯১৭ টাকা। মির্জা আব্বাসের স্থায়ী আমানতে বিনিয়োগ আছে ১০ কোটি ৬৫ লাখ ৫৭ হাজার ১৪৯ টাকা। স্ত্রীর আছে ১ কোটি ৬০ লাখ ৮৭ হাজার ৩৩৪ টাকা। আব্বাসের বিভিন্ন ধরনের যানবাহন আছে ৯৭ লাখ টাকা মূল্যমানের। স্বর্ণ আছে ২ লাখ টাকার। স্ত্রীর আছে ১৭০ তোলা যার মূল্য ২২ লাখ টাকা। ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী ১০ লাখ ও আসবাবপত্রের মূল্যমান ধরা হয়েছে ৭ লাখ টাকা। স্ত্রীর আসবাবপত্র আছে ৫ লাখ টাকার। এছাড়া তার অকৃষি জমির মূল্যমান ১ কোটি ৮৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। শাহজানপুরে তার দু’টি দালান আছে, যার মোট মূল্য ৩ কোটি ৯৮ লাখ ৭৭ হাজার ৬৮ টাকা। জমির বায়না বাবদ অগ্রিম আছে ৪ কোটি টাকা। তবে সম্পদের চেয়ে তার দেনাও কম নয়। মোট দেনা ৭৫ কোটি ৬৫ লাখ ২৫ হাজার ৯০৩ টাকা। এর মধ্যে বিও একাউন্টে ৬৩ কোটি ৬৪ লাখ ৪৯ হাজার ৯৪১ টাকা, কেএম শহীদুল্লাহ নামে এক ব্যক্তির কাছে ৭ কোটি টাকা, বাড়ি ভাড়া হিসাবে অগ্রিম নেয়া আছে ৩ কোটি ৫১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৫৪ টাকা, সিকিউরিটি ডিপোজিট আছে ৭৫ লাখ এবং স্ত্রী আফরোজা আব্বাসের কাছে ঋণ আছেন ৭৪ লাখ ৩৭ হাজার ১০৮ টাকা। মির্জা আব্বাস ফুলটাইম রাজনীতিবিদ হলেও মনোনয়নপত্রে তিনি নিজেকে ব্যবসায়ী বলে উল্লেখ করেছেন। মির্জা আব্বাস স্নাতক পাস বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।
আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী সাঈদ খোকনের কাছে নগদ আছে ১ কোটি ১০ লাখ ৪৬ হাজার ৫৭৮ টাকা। যদিও সাঈদ খোকন তার হলফনামায় বলেছেন, সর্বশেষ আয়কর বিবরণী অনুযায়ী তার হাতে ছিল ২৩ কোটি ৭২ লাখ ৪৬ হাজার ৫৭৮ টাকা। কিন্তু ৩০ জুন ২০১৪ এর করবর্ষ শেষে গুলশানের একটি বাড়ির নির্মাণের জন্য কন্ট্রাক্টার ও সাপ্লায়ারদের বিল পরিশোধ করেছেন তিনি ৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এছাড়া অন্যত্র আরো দু’টি বাড়ি নির্মাণের কন্ট্রাক্টার ও সাপ্লায়ারদের ১৬ কোটি ১২ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন। সাঈদ খোকনের স্ত্রীর কাছে নগদ আছে ৩০ লাখ টাকা। ব্যাংকে জমা আছে ২৭ লাখ টাকা। খোকনের ব্যাংকে জমা আছে ৪৩ হাজার টাকা। বন্ড ও ঋণপত্র আছে ১৭ কোটি ৭১ লাখ ৯০ হাজার ৬৭৫ টাকা। স্ত্রীর জমা আছে ১ কোটি টাকা। তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানীর শেয়ার আছে ১৩ লাখ টাকা। খোকনের আছে ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের মূল্য ধরা হয়েছে ৩৮ লাখ টাকা। স্ত্রীর ৩২ লাখ টাকা। সাঈদ খোকনের কোন স্বর্ণ নেই। তবে স্ত্রীর আছে ২ লাখ ৫ হাজার টাকা মূল্যমানের স্বর্ণালংকার। খোকনের আসবাবপত্র সব উপহারে পাওয়া। স্ত্রীর আসবাবপত্রের মূল্য ধরা হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। বিভিন্ন ব্যবসায় মূল্য ধন আছে ৭৬ লাখ ২৮ হাজার ৪৯১ টাকা। খোকনের ব্যবসায় মূলধনের পরিমাণ ৩৪ লাখ টাকা। তার অকৃষি জমির মূল্যমান ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। স্ত্রীর অকৃষি জমির পরিমাণ বেশি। তার আছে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যমানের। আবাসিক ও বাণিজ্যিক দালান আছে ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যমানের জমি। খোকনের এসব সম্পদ আছে ২৬ কোটি ৮৯ লাখ ৪৯ হাজার টাকার। পৈতৃক সূত্রে নাজিরাবাজার লেনে খোকন একটি বাড়ি পেয়েছেন। বাড়ি ভাড়া বাবদ তার বার্ষিক আয় ৩২ লাখ ৩৪ হাজার ১৫০ টাকা। ব্যবসা থেকে আয় ৮ লাখ ৩২ হাজার ৬৩০ টাকা। শেয়ার, সঞ্চয় ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বাবদ আয় ১ লাখ ৮ হাজার টাকা। সাঈদ খোকনের বেশ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে-এগুলো হচ্ছে ইসলামী ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড, সাঈদ খোকন প্রপার্টিজ লিমিটেড, একটি ম্যাচ প্রস্তুতকারক কারখানা, একটি আবাসিক হোটেল এছাড়া আমদানি রপ্তানি ট্রেডিং ব্যবসা রয়েছে। সাঈদ খোকনের যেমন অনেক ব্যবসা আছে তেমনি দায়দেনাও রয়েছে। প্রিমিয়ার ব্যাংকে বর্তমানে তার দেনা রয়েছে ১৯ কোটি ২৭ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। মনোনয়নপত্রে তিনিও পেশা হিসাবে ব্যবসায়ী উল্লেখ করেছেন। অতীতে তার বিরুদ্ধে ৫টি মামলা হয়েছিল। সবগুলো মামলা থেকে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন। সাঈদ খোকন স্নাতক পাস বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।
কারাগার থেকে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু। তিনি তার হলফনামায় উল্লেখ করেছেন তার কাছে নগদ টাকা আছে ৫ কোটি ৯২ লাখ ৬৮ হাজার ৩২২ টাকা। পিন্টুর বন্ড ও ঋণপত্র আছে ৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা, স্থায়ী আমানত আছে ৬ কোটি ৮৭ লাখ ৭ হাজার ২৮০ টাকা। তার স্বর্ণ আছে ৮ তোলা, অকৃষি জমির মূল্য ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৭২ লাখ ৭১ হাজার ২৯৮ টাকা। অন্যদিকে তার দায়দেনা আছে স্ত্রীর কাছে ২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, ভাই নাসিম আহমেদের কাছে আছে ৭০ লাখ টাকা, গাড়ি বাবদ দেনা আছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ১০৭ টাকা, ফিনিক্স লিজিং-এ ২ লাখ ৪৪ হাজার ১০৭ টাকা, ডায়মন্ড স্পিনিং মিলস লিঃ ৫৪ কোটি ৪৩ লাখ ৪৬ হাজার ৮ টাকা। পিন্টুর বিরুদ্ধে বর্তমানে ফৌজদারি মামলা আছে ৪টি, অতীতে ছিল ২টি। পিন্টুর আয়ের উত্স বাড়ি ভাড়া ও শেয়ার সঞ্চয়পত্র। বাড়ি থেকে বার্ষিক তার আয় ১৫ লাখ ৫০ হাজার ১৪০ টাকা। শেয়ার ও সঞ্চয়পত্র থেকে ৭২ লাখ ৭৮ হাজার ৩৭২ টাকা।

বিএনপির অপর নেতা আবদুস সালামও ঋণগ্রস্ত। কিন্তু তার ঋণ খুব সামন্য। বর্তমানে তিনি ৫ লাখ ১৬ হাজার ২৫৫ টাকা ঋণী। তবে তার কাছে নগদ টাকা আছে ৩২ লাখ ১৯ হাজার ৩৭৮ টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা আছে ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ১২১ টাকা, স্বর্ণ আছে ১২ তোলা যার মূল্য ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার টাকা। অন্য প্রার্থীদের মধ্যে মো. আকতারুজ্জামান ওরফে আয়াতুল্লাহার নগদ আছে ১০ হাজার টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আছে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। আব্দুল খালেক হোটেল ব্যবসায়ী, তার নগদ আছে ১ লাখ টাকা, এফডিআর ১০ লাখ ও স্বর্ণ আছে ৫ ভরি। বার্ষিক আয় ৬ লাখ টাকা। জাহিদুর রহমানের নগদ আছে ২ লাখ টাকা। বার্ষিক আয় ২ লাখ টাকা। পেশায় স্ট্যাম্প ভেন্ডার। আরেক প্রার্থী আবু নাছের মুহাম্মদ মাসুদ হোসাইন। তিনি পেশায় খতিব। আয়ের উত্স চাকরি। মেয়র প্রার্থী বাহারানে সুলতান বাহার পেশায় টেইলার্স ও সোশ্যাল ওয়ার্কার। বার্ষিক আয় আড়াই লাখ টাকা। স্বতন্ত্র প্রার্থী এ এস এম আকরামের কোন  পেশা নেই। আয়ের উত্স বাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য বাবদ ৪ লাখ টাকা। স্বর্ণ আছে ২০ ভরি। এই সিটিতে ২৬ জন মেয়র পদে মনোনয়ন দাখিল করলেও এখনো পর্যন্ত সবার হলফনামা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়নি।