গণবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি

পৃথিবীতে সবার আগে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল এথেন্সে। খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ শতকে সলোন থেকে পেরিক্লিস পর্যন্ত সংস্কারকগণ অভিজাততন্ত্রের হাত থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্তি দিতে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করতে যে ব্যবস্থা পাকা করেছিলেন চরিত্র বিচারে বিশ্ববাসী একে গণতন্ত্র নামে আখ্যা দেয়। অনেক পরে আমেরিকায় আব্রাহাম লিঙ্কন যে গণতন্ত্রের উদ্বোধন করেন তাতে জনগণকেই রাষ্ট্রের প্রধান নায়ক বানিয়েছিলেন। সরকার পরিচালকরা জনগণের সেবক মাত্র। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে গণতন্ত্র একটি অবিভাজ্য শব্দ ও ধারণা। এর আগে ও পরে কোনো শব্দ জুড়ে দিলে তা আর গণতন্ত্র পদবাচ্য হয় না। গত শতকের ষাটের দশকে পাকিস্তানের একনায়ক আইউব খান তাঁর প্রবর্তিত গণতন্ত্রের সামনে ‘বেসিক’ বা ‘মৌলিক’ যুক্ত করে গণতন্ত্রকে অবিভাজ্য থাকতে দেননি। তবে মানতেই হবে আইউব খানের দর্শনে যেভাবেই হোক গণতন্ত্র শব্দটা থাকায় অলক্ষ্যে হলেও এর সুবাতাস কিছুটা ছড়িয়ে ছিল।

আইউব খান তাঁর নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে মৌলিক গণতন্ত্রীদের দখলে দিতে চেয়েছিলেন। তাই নতুন ধারায় চেয়ারম্যান পদকে উজ্জ্বল করতে ‘প্রেসিডেন্ট’ নামকরণ করলেন। আইউব খানের সমর্থক হলেও মানতেই হবে ইউনিয়ন পরিষদের এই প্রেসিডেন্টদের অনেকেই নিজেদের জনগণের সেবক বলেই মনে করতেন।
অনুসন্ধান মতে আইউবী যুগের ইউনিয়ন কাউন্সিলের এই প্রেসিডেন্টদের অধিকাংশ  জনসেবকই ছিলেন। মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই তারা এ দায়িত্ব পালন করতেন। এখন স্থানীয় পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বার থেকে সিটি কর্পোরেশনের মেয়র-কাউন্সিলর এবং জাতীয় পর্যায়ের সংসদ সদস্যদের পর্যবেক্ষণ করলে কতভাগকে জনসম্পৃক্ত এবং কতভাগকে জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতি করতে দেখা যায় তা কাছে থেকে জনগণ ভালো মূল্যায়ন করতে পারে।
বর্তমানে মৌলিক নয় কাগজে কলমে নির্ভেজাল গণতন্ত্রের ব্যবস্থা চালু আছে দেশে। গণতন্ত্রের পতাকাবাহীও সবাই। ইদানিং জামায়েতে ইসলামীও গণতন্ত্র বলে মুখে ফেনা তুলে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সর্বজনীন ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে নির্বাচন হয়। এদিক থেকে সব ঠিকঠাক আছে। শুধু বর্তমানের এই নির্ভেজাল গণতন্ত্রে জনকল্যাণের প্রসঙ্গটা প্রায়োগিক ক্ষেত্রে প্রায় অদৃশ্য থেকে যায়। আর এ কারণে প্রার্থী মনোনয়নে জনদরদী নেতা—পোড়খাওয়া রাজনীতিক গুরুত্ব পান না। বণিক, আমলা ও পেশীশক্তি ধারণকারীরা নির্বাচকদের প্রথম পছন্দ হন। নির্বাচনে টাকার খেলা প্রাধান্য পাওয়ায় ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’ বলে শব্দ যুগল প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। দলীয় ফাণ্ড বাড়াতে এ পথেই হাঁটতে হয়। তৃণমূলের রাজনীতি থেকে বেড়ে ওঠা বিত্তহীন পরীক্ষিত নেতারা তাই বিবেচনায় আসেন না। অতপর রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে জনসমর্থনের চেয়ে নির্বাচনে জেতার কলাকৌশল প্রয়োগ করতে থাকেন বেশি। এভাবে প্রচুর খরচপাতি করে যারা ‘নির্বাচিত’ হয়ে জনপ্রতিনিধি হন তারা সাংসদ হওয়াটাকে মানসিকভাবে লাভজনক হিসাবে বিবেচনা করেন। সরকারি দলের এমপি হয়েও সংসদে না এসে কোরাম সংকট ঘটান। অন্যদিকে বিরোধী দলে থেকে লাগাতার সংসদ বর্জন করেন। তাই যেকথা সংসদে বলার জন্য মানুষ ভোট দিয়ে পাঠিয়েছে তা মাঠে ময়দানে বলে বেড়ান।
যেহেতু অদ্ভুত গণতন্ত্রের দেশে বরাবর বাষ্ট্রক্ষমতায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আসা-যাওয়া। তাই একদল ক্ষমতাসীন হলে নিয়ম করে অন্যদল সংসদ বর্জন করে। প্রয়োজনীয় নির্বাচিত সদস্য সংখ্যা না থাকায় নিজেদের প্রস্তাব বাতিল হবে ভেবে আইন পাসের সহযোগী হতে নারাজ থাকে।
এই বাস্তবতায় সরকারি দলের ভূমিকা অনেকটা একনায়োকচিত হয়ে যায়। নিজ দলের বর্তমান ও ভবিষ্যত্ লাভের কথা ভেবে খালি মাঠে গোল দেয়। অর্থাত্ বেচারা সংবিধানকে খোঁড়াখুঁড়ি করে। ১৯৭৫-এর পরে বিএনপি ও জাতীয় পার্টি যার যার ক্ষমতাকালে খোদকের ভূমিকায় থেকে ক্ষত-বিক্ষত করেছে সংবিধানকে। ২০০৮-এর নির্বাচনে জনগণের ভোটে শক্ত ভিত্তি পাওয়ার পরও আত্মবিশ্বাসের অভাবে আওয়ামী লীগও খোঁড়াখুঁড়ি করেছিল। এমনি করে প্রতিদিন স্পষ্ট হচ্ছে আমাদের বর্তমান রাজনীতির পরিচালকরা যার যার দলতন্ত্রের ভেতর আটকে দিয়েছেন গণতন্ত্রকে। রাজনৈতিক দলগুলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা হারিয়েছে অনেক আগেই। জন্মেছে পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস।
বাংলাদেশের সংবিধান রক্তমূল্যে কেনা। তাতে সময়ের প্রয়োজনে সংস্কার করা যেতে পারে বিধিবদ্ধ নিয়ম মেনে। বলার অপেক্ষা রাখে না আওয়ামী লীগ ৫ম সংশোধনী করেছিল নিজের রাজনৈতিক সুবিধাকে সামনে রেখে। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগের এই সংশোধনীর পর যখন ক্ষুব্ধতার সাথে প্রকাশ্য সভায় বলেছিলেন ক্ষমতায় এলে সংবিধান ছুঁড়ে ফেলবেন তখন গণতন্ত্রের প্রতি তাদের যে কোনো শ্রদ্ধা এবং সংবিধানের প্রতি আনুগত্য নেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়। বিপাকে পরে তখন মির্জা ফখরুলরা এই বক্তব্যের নানা ব্যাখ্যা দিয়ে হালকা করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু টিভি চ্যানেলে যারা বেগম জিয়ার সংবিধান ছুঁড়ে ফেলার শব্দবাণ শুনেছিলেন তাদের বিভ্রান্ত করা সম্ভব হয়নি। এরপর মওদুদ আহমদ আরো সুললিতভাবে যখন বলেন তারাও ক্ষমতায় এসে এসব সংশোধনী ফেলে দিয়ে নিজেদের পছন্দ মত আবার খোঁড়াখুঁড়ি করবেন তখন আর বিস্ময়ের কিছু থাকে না। দেখা যাচ্ছে রাজনীতিকদের এসব কাণ্ডেও জনগণ অনুপস্থিত। অর্থাত্ দেশটা যেন দুই পক্ষের রাজনীতিকদের। স্বাধীনভাবে সংবিধান খুঁড়বেন আর ইচ্ছেমত ছুঁড়বেন।
এমন অগণতান্ত্রিক চেতনা রাজনীতিকদের মধ্যে সক্রিয় বলেই বোধ হয় জনগণকে বিপন্ন করে রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণ করতে চান আমাদের সুবিধাবাদী রাজনীতিকরা। গণতন্ত্রের নামাবলী জপে বিএনপি জোট হরতাল অবরোধের নামে সন্ত্রাস চালিয়ে জিম্মি করছে সাধারণ মানুষকে। বিপন্ন করছে তাদের জীবন। দৃশ্যত মানুষ বর্জন করেছে এসব কর্মসূচি। মাঝে মাঝে পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে সাধারণ মানুষের জীবন সংহার করে যেন বলতে চাচ্ছে আমাদের কর্মসূচি এখনো বহাল রয়েছে। হরতাল অবরোধে বিএনপি জামায়াত নেতাদের মিল কারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জনপরিবহন সব চালু থাকলেও হরতাল না মানার অপরাধে শাস্তি পেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। চট্টগ্রাম ও ঢাকার সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিএনপি অংশ নিয়ে একটি আশাবাদ তৈরি করেছিল। মানুষ ভেবেছিল নিজ সৃষ্ট হরতাল অবরোধের বন্দিশালা থেকে এবার বিএনপি মুক্তি পাবে এবং জনগণকে মুক্তি দেবে। কিন্তু বাস্তবে জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতি শুভবুদ্ধির চোখ অন্ধ করে দেয়। ব্যর্থ আন্দোলন নিয়ে দোদুল্যমান বিএনপি নেতারা শেষ পর্যন্ত নিজ হতাশার বহিঃপ্রকাশ করলেন। ঢাকা ও চট্টগ্রাম ছাড়া সারা দেশে হরতাল অবরোধ অব্যাহত থাকার ঘোষণা দিয়ে ফেললেন। বিএনপি পক্ষের একনায়কোচিত নেতা বা নেত্রী ভাবছেন কর্মসূচি মানুষ পালন করুক বা না করুক তা প্রত্যাহার করা যাবে না। এতে দলটির আরেকবার পরাজয় ঘটবে। কিন্তু হাট ভেঙ্গে গেলে যে আর বসানো যায় না এ সত্যকি নতুন করে বোঝানো সম্ভব! সম্পূর্ণ উলঙ্গ হওয়ার চেয়ে স্বল্প বসনে সম্ভ্রম রক্ষা করা কি শুভ নয়? বিএনপি জোট কি এখন এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ক্ষতি করে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের দিকে হাত বাড়াচ্ছে? গণতন্ত্র নিয়ে আলোচনার অবতারণা করেছিলাম। রাজনীতিকদের এসব আচরণ গণতন্ত্রকে আরো অন্ধকারে ঠেলে ফেলছে। সরকার পক্ষ নিজেদের অবস্থান সুসংহত রাখতে বিএনপির দুর্বলতাকে দারুণ উপভোগ করছে যেন। আর বিএনপি নেতৃত্ব সংকটে পরে কর্মসূচির নামে বার বার রাজনৈতিক ভুল করে যাচ্ছে।
অস্থির রাজনীতির এসব অশুভ প্রকাশ এদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে আরো বেশি বিপন্ন করে তুলবে। রাজনীতিতে দলতন্ত্র আর সুবিধাবাদ এখন এতটা দাপুটে অবস্থায় রয়েছে যে তাতে মনে হয় না সুস্থ চিন্তার বোধদয় ঘটবে অসুস্থ রাজনীতি চর্চাকারীদের মধ্যে। তাই ভবিষ্যত্ গণতন্ত্রকে শক্ত অবস্থানে দাঁড় করাতে হলে এখন দেশপ্রেমিক নির্লোভ মানুষদের সংঘবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই। গণবিচ্ছিন্ন রাজনীতি শিক্ষকদের বিভক্ত করেছে, আইনজীবীদের বিভক্ত করেছে, বিভক্ত করেছে সাংবাদিকসহ সকল পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে। এ অবস্থায় সুস্থ চিন্তার মানুষ যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজনীতিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে তবে রাজনীতি সুস্থধারায় ফিরবে না। স্বাধীনতার চুয়াল্লিশ বছর পর আজ আমাদের ভাবতে হবে সকল কিছুর ঊর্ধ্বে থেকে আমরা গণতন্ত্রকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চাই কিনা। এ সত্য মীমাংসিত যে দেশপ্রেমিক সুস্থ মানুষদের চাওয়ার ইচ্ছেটা অনেক বেশি শক্তিশালী হয়।
n লেখক: অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawazju@yahoo.com