ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টুর সম্পদও বেশি ঋণও বেশি। প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আনিসুল হকের চেয়ে তার দ্বিগুণের বেশি সম্পত্তি রয়েছে। আনিসুল হকের বার্ষিক আয় ৭৬ লাখ টাকা। অন্যদিকে মিন্টু আয় করেন ৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা। ঋণের দিক দিয়েও এগিয়ে রয়েছেন মিন্টু। তার দায়দেনা রয়েছে ১৪ কোটি ৭২ লাখ ৬ হাজার ৩১৭ টাকা। আনিসুল হকের দেনা আছে ৫ কোটি ২৯ লাখ ৪৭ হাজার ৮৯৭ টাকা। ব্যাংকে মিন্টুর আছে ৬৮ লাখ ৭৯ হাজার ২৬৩ টাকা। আনিসুলের বিরুদ্ধে নেই কোন ফৌজদারী মামলা। মিন্টুর আছে ১৩টি মামলা। অতীতে ছিল আরো ৩টি। শিক্ষাগত যোগ্যতায় তারা সমানে সমান। আনিসুল এমএ করেছেন, মিন্টু কৃষি অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থাপনায় এমএ করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে অপর প্রার্থী সারাহ বেগম কবরীর শিক্ষগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত। জাতীয় পার্টি-জাপা সমর্থিত প্রার্থী বাহাউদ্দিন আহমদের শিক্ষাগত যোগ্যতা অক্ষরজ্ঞান পর্যন্ত।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে ২১ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। গত সোমবার গভীর রাতে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে উত্তরের প্রার্থীদের হলফনামা প্রকাশ করা হয়। এর আগেই ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনের প্রার্থীদের হলফনামা প্রকাশ করা হয়।
আনিসুল হক
হলফনামার তথ্যে এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি আনিসুল হক ২২টি প্রতিষ্ঠানের মালিক বলে উল্লেখ করেছেন। তার বার্ষিক আয় ৭৫ লাখ ৮২ হাজার টাকা। এর মধ্যে বাড়ি ভাড়া থেকে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা, ব্যবসায় ২৫ লাখ টাকা, শেয়ারে ১ লাখ ৬১ হাজার টাকা, এফডিআর মুনাফাসহ অন্যান্য খাতে ৪৫ লাখ ৮৯ হাজার ৮৩১ টাকা আয়ের তথ্য রয়েছে। এসব খাত থেকে তার স্ত্রীর আয় ৮৪ লাখ ৯৩ হাজার ৪৬২ টাকা। তার ছেলের আয় ২ লাখ ৯১ হাজার ৫১৯ টাকা। তার দুই মেয়ের আয় ২২ লাখ ৩৮ হাজার ৪৬০ টাকা।
আনিসুল হকের নিজ নামে অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ২২ কোটি ৭৫ লাখ ৬৫ হাজার ৮৪৪ টাকার। নগদ টাকার পরিমাণ ১ কোটি ৯৫ লাখ ১৩ হাজার ৩০ টাকা। ব্যাংকে জমা মাত্র ৬ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯৯ টাকা। শেয়ার রয়েছে ১১ কোটি ৪৮ লাখ ৪৫ হাজার ৫০০ টাকার। স্থায়ী আমানতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৩ কোটি ৫৩ লাখ ৪৫ হাজার ৬৮৬ টাকা। স্বর্ণালঙ্কার আছে ১১ লাখ ১২ হাজার ৭৫০ টাকার। এছাড়া স্ত্রী ও ছেলেমেয়ের নামে ৭ কোটি টাকারও বেশি সম্পদ রয়েছে বলে আনিসুল জানিয়েছেন। তার ঋণ আছে ৫ কোটি ২৯ লাখ ৪৭ হাজার ৮৯৭ টাকা। তার স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে ৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকার অকৃষি জমি, স্ত্রীর নামে ৭০ লাখ টাকার বাড়ি/অ্যাপার্টমেন্ট এবং ছেলে ও দুই মেয়ের নামে ৩.৮৫ কাঠা জমির তথ্য হলফনামায় এসেছে।
আবদুল আউয়াল মিন্টু
আবদুল আউয়াল মিন্টু ১৪টি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও বিভিন্ন পদে রয়েছেন। বার্ষিক আয় ৫ কোটি ১৮ লাখ ৪৫ হাজার ৫০৩ টাকা। কৃষি খাতে আয় ৩ কোটি ৫০ লাখ ৯৯ হাজার ৫২২ টাকা। বাড়ি ভাড়া পান ৯ লাখ ৪ হাজার ৫০০ টাকা। ব্যবসায় (পারিতোষিক) আয় ৯৩ লাখ টাকা। শেয়ার ও ব্যাংক আমানতে আয় ২৪ লাখ ৩০ হাজার ৬৭০ টাকা। এ ছাড়াও অন্যান্য মূলধনী লাভ ৪১ লাখ ১০ হাজার ৮১১ টাকা। হলফনামায় দেয়া তথ্য অনুযায়ী মিন্টুর বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে তিনি পাঁচটিতে জামিনে রয়েছেন। বাকিগুলো ‘পেন্ডিং’ রয়েছে বলে তিনি কমিশনকে জানিয়েছেন। এছাড়া আগের তিন মামলার মধ্যে দুটিতে অব্যাহতি পেয়েছেন মিন্টু, একটির কার্যক্রম হাই কোর্টের আদেশে স্থগিত।
মিন্টুর অস্থাবর সম্পদ আছে ৫৩ কোটি ৯৮ লাখ ৬৩ হাজার ২১৭ টাকার। তার স্ত্রীর আছে ৯ কোটি ১২ লাখ ১৭ হাজার ৫৪৩ টাকা। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে নগদ টাকা ৮ লাখ ৫০ হাজার ৩২০ টাকা, স্ত্রীর নামে ৭ লাখ ৭৭ হাজার ৭৪৩ টাকা। ব্যাংকে জমা প্রায় ৭ কোটি টাকা। শেয়ার রয়েছে ৪০ কোটি ৫৮ লাখ ৯০ হাজার ৬৫০ টাকার। স্থায়ী আমানতে বিনিয়োগ রয়েছে ৭৪ লাখ ৯৩ হাজার ৬৫৪ টাকা। পুরনো কয়েন, সরকারের কাছে জমা, অগ্রিম ও ঋণ প্রদান এবং জীবন বীমা খাতে আছে ১১ কোটি ৫১ লাখ ৯১ হাজার ৬৬৩ টাকা।
স্থাবর সম্পদের মধ্যে ৩ কোটি ৮৫ লাখ ১৪ হাজার ৮৩০ টাকার অকৃষি জমি আছে। নিজ নামে ২৯ লাখ ৮২ হাজার ৮৫৪ টাকার বাড়ি, স্ত্রীর নামে ১৯ লাখ ৪১ হাজার ৪২৩ টাকা মূল্যের একটি বাড়ি রয়েছে। এ ছাড়াও যৌথ মালিকানাধীন বাড়ি রয়েছে ৬১ লাখ ৭৬ হাজার ১৪৯ টাকা মূল্যের। বিভিন্ন খাতে মিন্টুর দায়ের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৬ কোটি টাকা।
সারাহ বেগম কবরী
আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য চলচ্চিত্র অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী হলফনামায় নিজের চলচ্চিত্র প্রযোজন সংস্থা ‘কে প্রোডাকশন’ এর কথা উল্লেখ করেছেন। তার বার্ষিক আয়ের হিসাবে কৃষিখাত থেকে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা, ব্যবসা থেকে ৫ লাখ ৪২ হাজার ৪৪২ টাকা, শেয়ার সঞ্চয়/ব্যাংক আমানতে ২ লাখ ১ হাজার ৭৫ টাকা, পেশা থেকে ৪ লাখ ২৯ হাজার টাকা ও অন্যান্য থেকে ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৫৬ টাকার তথ্য দিয়েছেন। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা ৭২ লাখ ৪৪ হাজার ৩৫ টাকা, ২৮ লাখ ৩৪ হাজার টাকার বৈদেশিক মুদ্রা, ১৬ লাখ ৮৮ হাজার ৯৫৭ টাকার স্থায়ী আমানত এবং ১ লাখ ২০ হাজার টাকার স্বর্ণ আছে। এছাড়া স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে গুলশানে একটি ৬ তলা বাড়ি।
মাহী বদরুদ্দোজা চৌধুরী
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক পাস বিকল্পধারার কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি একিউ এম বদরুদ্দোজ্জা চৌধুরীর ছেলে মাহী বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তিনিও ঋণগ্রস্ত। মার্কেন্টাইল ব্যাংকে ২৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ঋণ রয়েছে তার। মাহীর কাছে নগদ আছে ১ লাখ টাকা। ব্যাংকে আছে ১ লাখ টাকা। তার থেকে তার স্ত্রীর নামে ব্যাংকে জমা আছে দ্বিগুণ টাকা। এছাড়া বন্ড ও ঋণপত্র আছে ৫০ হাজার টাকা। তার বিরুদ্ধে নেই কোন মামলা। সাড়ে ১৯ লাখ টাকার নিসান জিপ আছে তার। নিজের বা স্ত্রীর নামে নেই কোন দালান কোঠা। তবে সাভারে অকৃষি জমি আছে ৩১ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা মূল্যমানের।
বাহাউদ্দিন আহমেদ
জাতীয় পার্টি-জাপা সমর্থিত মেয়র প্রার্থী বাহাউদ্দিন আহমেদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন’। বাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য খাত থেকে বার্ষিক আয় ৫ লাখ ২৯ হাজার ২০০ টাকা। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে নগদ ৪ লাখ ৪৫ হাজার ৯০৫ টাকা, ব্যবসায়ী মূলধন ১২ লাখ ৭৮ হাজার ৮৭ টাকা এবং ১ লাখ ৮০ হাজার টাকার স্বর্ণ। এছাড়া স্ত্রীর নামে রয়েছে ৩৫ ভরি স্বর্ণ। বাহাউদ্দিনের স্থাবর সম্পদের মধ্যে একটি দ্বিতল ভবন, ২২টি আধাপাকা গুদাম ও ঢাকায় একটি ফ্ল্যাটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ববি হাজ্জাজ
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের সদ্য বহিষ্কৃত উপদেষ্টা ববি হাজ্জাজও মেয়র প্রার্থী। তিনি আলোচিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসেরের ছেলে। হলফনামায় ববি হাজ্জাজ বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৬ লাখ ২৭ হাজার ৫৭২ টাকা। তার হাতে নগদ ৬০ হাজার টাকা, স্ত্রীর হাতে ৪৫ হাজার টাকা, নিজের হাতে বৈদেশিক মুদ্রা রয়েছে ৫ হাজার ৯৮৯ ডলার। ব্যাংকে জমা ৬৯ হাজার ৬২৫ টাকা, স্ত্রীর নামে ২ লাখ ৪ হাজার ১০২ টাকা। বন্ড ও শেয়ার রয়েছে ৫০ হাজার টাকা। স্ত্রীর নামে স্বর্ণালঙ্কার রয়েছে ১০০ ভরি। এ ছাড়াও ঢাকায় তার স্ত্রীর নামে একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এমবিএ ডিগ্রিধারী ববি তার হলফনামায় পেশার ঘরে শিক্ষকতার কথা লিখেছেন। তবে একইসঙ্গে ডেটকো প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক পদেও আছেন তিনি।
চৌধুরী ইরাদ আহম্মদ সিদ্দিকী
বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা চৌধুরী তানবীর আহম্মেদ সিদ্দিকীর ছেলে ইরাদ আহম্মদ। উত্তরের এই মেয়র প্রার্থী নিজেকে লেখক ও গবেষক হিসেবে উল্লেখ করেছেন হলফনামায়। তার বার্ষিক আয় ১০ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। নিজের হাতে ও ব্যাংকে মোট টাকার পরিমাণ ৫০ হাজার। স্ত্রীর কাছে ৪০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার রয়েছে। এ ছাড়াও ১০ কাঠা জমির ওপর তার একটি আবাসিক ভবন রয়েছে।
তাবিথ আউয়াল
উত্তরে আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে তাবিথ আউয়ালও শেষ মুহূর্তে প্রার্থী হয়েছেন। বাবা বিএনপির রাজনীতিতে থাকলেও তাবিথ সরাসরি কোনো দলের সঙ্গে নেই। মাল্টিমোড গ্রুপের উপ-প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাবিথ আউয়ালের নামে কোনো মামলা নেই। তিনি নিজেও ১৭টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত। হলফনামায় তিনি নিজের বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন সোয়া কোটি টাকা। তার অস্থাবর সম্পত্তির তালিকায় রয়েছে ১৪ কোটি ৮১ লাখ টাকার বন্ড ও শেয়ার। অন্যান্য খাতে রয়েছে আরও ১৫ কোটি ২৫ লাখ টাকার সম্পদ। তার স্ত্রীর নামে রয়েছে ৬০ ভরি স্বর্ণ।
আবদুল্লাহ আল ক্বাফী
ঢাকা উত্তর সিটিতে মেয়র পদের এই প্রার্থী নিজেকে সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক (সিপিবি) কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। বাড়ি ভাড়া, শেয়ার ও সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে তিনি বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা। একই খাত থেকে তার ওপর নির্ভরশীলদের বার্ষিক আয় ১০ লাখ ৩২ হাজার টাকা।