সমাজ সংস্কারের বলিষ্ঠ হাতিয়ার লোকজ সংস্কৃতির যাত্রাপালা। (গাজী-কালু পালাগান) ও নাটকের মালিক, শিল্পী ও কলা-কুশলীদের বড় দুর্দিন চলছে। চলতি বছর হরতাল ও অবরোধে এ শিল্পের মুখ থুবড়ে পড়েছে।
বিলুপ্তির পথে সাতক্ষীরার যাত্রা শিল্প
একসময় সাতক্ষীরা ছিল যাত্রা ও পালাগানের ঐতিহ্য। আজ বিলুপ্তির পথে সেই সাতক্ষীরার যাত্রা শিল্প। এ শিল্পে এখন চলছে চরম দুরবস্থা। ষাটের দশকে সাতক্ষীরা জেলার অনেক যাত্রাদল ছিল। যারা দেশের বিভিন্ন স্থানে পালা করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতো। এ শিল্পের সাথে জড়িত অনেকে এখন ভিন্ন পেশা বেছে নিয়েছে। আশির দশকের পরেও জেলায় বেশ কিছু যাত্রাদল ছিল। এ শিল্পের সাথে জড়িত সহস্রাধিক শিল্পী, কলা-কুশলী বর্তমানে বেকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। সাতক্ষীরার কুখরালি গ্রামের যাত্রাশিল্পী কিনু সরদার জানান, একসময় এ জেলার আর্য অপেরা, চাঁদ সেতারা, নিউ প্রভাষ অপেরা উল্লেখযোগ্য যাত্রা দলগুলোর সুনাম ও খ্যাতি ছিল দেশজুড়ে। তখন আমরা এখানকার দলের হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিনয় করতে যেতাম, বিনিময়ে ভালো পারিশ্রমিকও পেতাম। কিন্ত বর্তমানে দলগুলো ভেঙ্গে যাওয়ায় আমরা কয়েকজন শিল্পী জেলার বাইরের দু’একটি দলে কাজ করি। তবে কাজ খুব কম, সে সাথে পারিশ্রমিকও আগের মত পাওয়া যায় না। ফলে অনেক কষ্ট করে চলতে হয়।
বিশিষ্ট যাত্রাশিল্পী প্রভাষ চ্যাটার্জী জানান, সংস্কৃতি-বিরোধী চক্রের কারণে যাত্রা শিল্প সাতক্ষীরা থেকে বিলীন হতে চলেছে। যদিও দু’একটি দল এখনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে এই শিল্প বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। এছাড়া অনেক যাত্রশিল্পী এখন পেশা বদল করে জীবন-জীবিকার তাগিদে দিনমজুরের কাজ করছেন। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক নাজমুল আহসান জানান, এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মনিরামপুরে যাত্রা মালিক ও শিল্পী, কলা-কুশলীদের দুর্দিন
যশোরের মনিরামপুর উপজেলায় আনন্দ অপেরা, পূর্ণিমা অপেরা, বৈকালী অপেরা, প্রতিমা অপেরা, রুপসী অপেরা, অগ্রগামী অপেরা, রাজমহল অপেরা, পলাশ অপেরা, বাসন্তী অপেরা, সঙ্গীতা অপেরা, স্বপ্না অপেরা, নার্গিস অপেরা, শ্রীমা অপেরা, পদ্মা যাত্রা ইউনিটসহ ১৫/১৬টি যাত্রাদল আছে। প্রতিটি যাত্রাদলে কমপক্ষে ৪৫/৫০ জন শিল্পী, কলা-কুশলী থাকে। সে হিসেবে বাংলাদেশে ৩/৪ লাখ শিল্পী, কলা-কুশলী মানবেতর জীবন যাপন করছে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে থাকছে না তাদের সেই নবারের ভূমিকায় অভিনয় করার মনমানসিকতা ও কলা-কৌশল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত এসব লোকজ যাত্রাপালার সোনালি যুগ ছিল। যাত্রা লোকশিক্ষার বাহক। সেই যাত্রাপালা শিক্ষারূপে পৌঁছে দিতে ২০০৯-১০ সালের দীপ্ত শিক্ষা হাতে নিয়ে শিল্পকলা একাডেমী শ্রেষ্ঠ দল হিসেবে পুরস্কারপ্রাপ্ত হয় প্রতিমা অপেরা শিল্পী গোষ্ঠী। যেখানে শ্রেষ্ঠাংশে সুপারস্টার নায়ক এমএ হামিদ ও গায়িকা, নায়িকা মমতা রানীসহ প্রিন্সেস ডল, প্রিন্সেস বৃষ্টি নামকরা শিল্পী, কলা-কুশলী দ্বারা গঠিত। যে সমস্ত নৃত্য ও যাত্রাপালা নিয়ে স্বাধীনতার পর থেকে বাংলার মানুষের মনোজগতে সমাজের বিভিন্ন কুসংস্কারকে সংস্কার করেছে সেসব পালার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হল: সাতপাকের সিঁদুর, অশ্রু নদীর তীরে, আমার লক্ষ্মী ফিরিয়ে দাও, আঁধারের মুসাফির, একটি পয়সা, বৌমা তোমার পায়ে নমস্কার, মেঘে ঢাকা তারা, রক্ত দিয়ে কিনলাম, ভাইয়ের রক্তে ভাই ফোঁটা ও চরিত্রহীন, নিহত গোলাপ।
যশোরের মনিরামপুর উপজেলার যাত্রা মালিক এসএম আব্দুল আজিজ ও শ্রী গনেশ কুন্ডু জনান, প্রতিটি যাত্রাদলের মালিকরা যাত্রাপালা শুরুর আগে শিল্পী, কলা-কুশলীদের মহড়ার (প্রশিক্ষণ/ রিহার্সেল) জন্য আগে ২/৩ মাসের বেতন দিয়ে শিল্পীদের বুক করতে হয়। এতে একজন মালিকের অগ্রীম বেতন বাবদ ৫/৭ লাখ টাকা গুনতে হয়। মহড়া বাড়ি ওঠা থেকে শুরু করে মৌসুম শেষ না হওয়া পর্যন্ত সকল শিল্পী, কলা-কুশলীর যাবতীয় খাওয়া-পরাসহ মাসিক বেতন বহন করতে হয় মালিকদের। ভালো শিল্পীদের কদর এমনিতেই অনেক বেশি। এবছর যাত্রা মালিকদের লাখ লাখ টাকা গচ্চা দিতে হয়েছে হরতাল-অবরোধের কারণে।
যাত্রাদলের কার্যক্রম শুরু হয় আষাঢ়-শ্রাবণ মাসের শেষে রথযাত্রা থেকে। এ সময়ে দলের কলা-কুশলীরা প্রশিক্ষণের জন্য মহড়া বাড়িতে হাজির হয়। ১/২ মাস প্রশিক্ষণ/ মহড়া শেষে দুর্গাপূজা ষষ্টি হতে যাত্রাগানের বায়না শুরু হয়। এ বছরও মনিরামপুর উপজেলার ১৫ থেকে ১৬টি যাত্রাদল লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে দীর্ঘদিন মহড়া চালিয়ে প্রস্তুত করেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি, হরতাল-অবরোধ, জ্বালাও-পোড়াও, ককটেল, পেট্রোল বোমায় ডেকে এনেছে মালিক, কলা-কুশলীদের দুরবস্থা। এসব যাত্রাদলে দেশজুড়ে হাজার হাজার শিল্পী, কলা-কুশলী রয়েছে যারা এই পেশা ছাড়া অন্য পেশা জানে না। ফলে তাদের বড়ই দুর্দিন।
ধর্মীয় গোঁড়ামি, জঙ্গিবাদের উত্থান, নাশকতা, মোড়ে মোড়ে টেলিভিশন, সিনেমা, ডিশ এন্টেনার মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্বের নগ্ন ছবির ছড়াছড়ির কাছে নুয়ে পড়েছে বাঙালি জাতির লোকজ সংস্কৃতির চিত্রগুলো। সর্বোপরি মালিকদের আর্থিক দীনতায়ও এ শিল্পের ভরাডুবি শুরু হয়েছে।