কিছু ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গে
অনিয়মকারীদের যোগসাজশ এবং প্রভাবশালী খেলাপিদের কারণে পুরো অর্থনীতিতে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে
—ফজলে কবির
গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক
কোনো একটি লোনে ডিফল্ট করেছে কোনো একটি লোক। যখন সেই লোকটাকে ধরা যাচ্ছে না, তখন ব্যাংক কর্মকর্তাকে ধরা হচ্ছে। সে হয়ত আসলেই নির্দোষ
—সৈয়দ মাহবুবুর রহমান
চেয়ারম্যান, এবিবি
সম্প্রতি তিনটি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন অনুমোদন পাওয়া তিনটি ব্যাংক হলো বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, সিটিজেন ব্যাংক এবং পিপলস ব্যাংক। সিদ্ধান্ত আগেরই, বাকি ছিল শুধু ঘোষণা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সম্প্রতি নতুন তিন ব্যাংকের অনুমোদন দিয়ে সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। এসব ব্যাংককে দুই বছরের মধ্যে পরিশোধিত মূলধন ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করতে হবে। অনুমোদন পর্যায়ে ব্যাংগুলোর পরিশোধিত মূলধন ৪০০ কোটি টাকা করে। ২০০৯ থেকে মহাজোট সরকারের তিন মেয়াদে এখন পর্যন্ত ১৪টি বেসরকারি ব্যাংকের অনুমোদন দিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সর্বশেষ নতুন তিনটি ব্যাংকের আগে নতুন ব্যাংক পেয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ পুলিশও। সেই ব্যাংকগুলো হলো, সীমান্ত ব্যাংক এবং কমিউনিটি ব্যাংক। নতুন তিন ব্যাংকের অনুমোদনের ফলে দেশে মোট তফসিলি ব্যাংকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬২টিতে।
বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, কয়টি ব্যাংক আছে এটা ব্যাপার না। ব্যাংকগুলো যদি নিয়মনীতি মেনে চলে, কার্যক্রম যদি থাকে, যে উদ্দেশ্যে ব্যাংক করা যদি সেই উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে, অর্থাত্ গ্রাহকদের সেবা দিতে পারে, তাহলে সংখ্যা দিয়ে কিছু হবে না। বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৮৩ সালে। তত্কালীন এরশাদ সরকারের মেয়াদে (১৯৮২-৯০) ৯টি ব্যাংক অনুমোদন পায়। ১৯৯১-৯৬ সালে বিএনপি সরকারের সময়ে নতুন ৮টি ব্যাংক অনুমোদন পায়। আওয়ামী লীগ সরকারের ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে অনুমোদন পায় ১৩ ব্যাংক। আর ২০০৯ থেকে এখন পর্যন্ত তিন মেয়াদে ১৪টি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গত এক দশকে সরকারি ব্যাংকের মতো বেসরকারি ব্যাংকে বড় ধরনের অনিয়ম ঘটেছে। মালিকানায়ও বড় ধরনের রদবদল ঘটেছে। ২০১৩ সালে কার্যক্রম শুরু করা ফারমার্স ব্যাংক (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) এর সমস্যা পুরো ব্যাংক খাতকে সমস্যায় ফেলেছে। বিদ্যমান সমস্যা দূরীকরণে ব্যাংক খাতে একটি কমিটি গঠন করা হচ্ছে। খেলাপি ঋণ পর্যালোচনা কমিটি শীর্ষক এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নরকে। অর্থমন্ত্রণালয়ের দুজন যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা ছাড়াও থাকছেন রাষ্ট্রমালিকানাধীন দুই ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এই খেলাপি ঋণ আদায়ের কৌশল নির্ধারণ, খেলাপি ঋণ আর না বাড়ার উপায় অনুসন্ধান এবং বিপুল পরিমাণের ঋণ অবলোপনের কারণ খতিয়ে দেখবে। পরে কমিটি এসব বিষয়ে তাদের মতামত প্রতিবেদন আকারে অর্থমন্ত্রীর কাছে দাখিল করবে।
ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র জানতে বিশেষ পরিদর্শন শুরু করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তারই অংশ হিসেবে নমুনা ভিত্তিতে রাষ্ট্রমালিকানাধীন, বেসরকারি ও ইসলামি ধারার একটি করে মোট তিনটি ব্যাংক পরিদর্শন করা হবে। পরিদর্শনে প্রাপ্ত তথ্যাদি পাঠানো হবে অর্থ মন্ত্রণালয়ে। এর ভিত্তিতে ব্যাংক খাত নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। রাষ্ট্রমালিকানাধীন জনতা ব্যাংক, বেসরকারি খাতে এবি ব্যাংক ও ইসলামি ধারার আল আরাফাহ ইসলামি ব্যাংককে বিশেষ পরিদর্শনের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিশেষ এ পরিদর্শনে ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হবে। বিশেষ করে কারা বড় অংকের ঋণ পেয়েছেন। তার যথাযথ ব্যবহার হয়েছে কিনা, গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা আছে কি না, এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হবে। সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে বলা যায়, আমাদের ব্যাংক খাত এখন ভালো সংকটের সময় পার করছে। ১৮তম নুরুল মতিন মেমোরিয়াল লেকচার ‘ইথিকস ইন ব্যাংকিং’ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেছেন, কিছু ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গে অনিয়মকারীদের যোগসাজশ এবং প্রভাবশালী খেলাপিদের কারণে পুরো অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
এদিকে, এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বেশিরভাগ লোকই নির্দোষ। আমরা এমন দেখেছি, কোনো একটি লোনে ডিফল্ট করেছে কোন একজন ব্যক্তি। যখন সেই লোকটাকে ধরা যাচ্ছে না, তখন ব্যাংক কর্মকর্তাকে ধরা হচ্ছে। সে হয়ত আসলেই নির্দোষ। তার মতে, যেসব কর্মকর্তা সত্যিকারভাবে দোষী তাদেরকে ধরা উচিত। শুধু ব্যাংকারদের ওপর দোষ চাপালে হবে না।’
ব্যাংক খাতকে যত দ্রুত সম্ভব খেলাপি ঋণের বোঝা মুক্ত করে সুশাসন শুদ্ধাচার নিশ্চিত করে সুস্থ, সুন্দর সুশৃঙ্খল এবং শক্তিশালী অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে হবে। আর এ জন্য দরকার অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, আমানতকারী, নীতি-নির্ধারকসহ সব পক্ষকে নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানে বাস্তবমুখী কার্যকর জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ।