কৃষি খাতে রেডিয়েশন প্রযুক্তি

জলবায়ু পরিবর্তনের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে শুধুমাত্র বিদ্যুত্ উত্পাদনই নয় একই সঙ্গে কৃষি খাতকে বন্যা ও লবণাক্ততা থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে কাজ করছে।

বাংলাদেশের নিচু অঞ্চলের ইকোসিস্টেম বিশ্বের মধ্যে অন্যতম ভঙ্গুর এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবার আশঙ্কায় রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০৫০ সাল নাগাদ এতদ্বাঞ্চলের প্রায় দুই কোটি সত্তর লক্ষ লোক ঝুঁকির মুখে পড়বে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটাতে জলবায়ু পরিবর্তন দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবার আশঙ্কা নেই এমন জাতের শস্য উদ্ভাবনে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আনবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং জাতি সংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার এগ্রিকালচার (বিনা) এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের প্রধান মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যাচ্ছি। আমাদের এই যুদ্ধ জমির লবণাক্ততা, অত্যধিক তাপমাত্রা, খরা ও বন্যার বিরুদ্ধে। মোফাজ্জল ইসলামের এই উক্তিটি আইএইএ’র জন তথ্য ও যোগাযোগ অফিসের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তারমতে, যদি শস্যের বিষয়কে বিবেচনা করা হয় তবে এসকল সমস্যা মোকাবেলায় আমাদের হাতে সমাধান রয়েছে। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে লবণাক্ততার বৃদ্ধি দেশের কৃষি খাতকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে বলে সরকার আশঙ্কা করছে। বিনার বিজ্ঞানীরা রেডিয়েশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন জাতের উদ্ভিদ উদ্ভাবন করেছেন যা পরিবর্তিত জলবায়ু সহিষ্ণু। উদ্ভাবিত জাতগুলো বাংলাদেশের কৃষকদের তাদের ধান উত্পাদন তিন গুণ বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে অবদান রেখেছে।

এফএও এবং আইএইএর’র যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এফএও এর পারমাণবিক প্রয়োগকৌশল বিভাগে কর্মরত উদ্ভিদ প্রজননবিদ এবং জেনেটিক বিশেষজ্ঞ এলজুপচো জানকুলস্কি জানান, রেডিয়েশনের মাধ্যমে উদ্ভিদের মিউটেশন ঘটানোর ফলে এমন জাত পাওয়া সম্ভব যেগুলো উন্নমানের, উচ্চ উত্পাদনশীল, অধিক মাত্রায় জলবায়ু পরিবর্তন সহিষ্ণু এবং পরিবেশগত বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব প্রতিরোধে সক্ষম। তিনি আরো বলেন যে, “বিনা’য় উদ্ভাবিত ধানের মিউটেন্ট জাত বাংলাদেশকে গত কয়েক দশকে তার ধান উত্পাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে। স্থানীয় প্রচলিত ধানের জাতের তুলনায় একটি মিউটেন্ট জাত অধিকতর দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং এর ফলনও বেশি। লবণাক্ততা সহিষ্ণু অন্য আর একটি জাত বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী দশ লক্ষ হেক্টর লবণাক্ত জমিতে চাষ করা হচ্ছে। পূর্বে এই জমিগুলো ছিল চাষাবাদের অযোগ্য।

বন্যাপ্রবণ এলাকার জন্য বিজ্ঞানীরা ধানের বিশেষ একটি জাত উদ্ভাবন করেছেন। সাধারণভাবে পানিতে নিমজ্জিত অবস্থায় শস্য ৩ থেকে ৪ দিন টিকে থাকতে পারে। কিন্তু নতুন এই জাতটি পানির নিচে ৩ সপ্তাহের অধিক বেঁচে থাকতে সক্ষম। ১৯৩০ সাল থেকে উদ্ভিদ মিউটেশন কৌশলটি ব্যবহূত হয়েছে আসছে। এই প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদের বীজ অথবা এক্সপ্ল্যান্টতে রেডিয়েশন যেমন গামা রশ্মি বা এক্স-রে প্রয়োগ করা হয়। অতঃপর এই বীজ অথবা উদ্ভিদের অংশ কোনো স্টেরাইল মিডিয়ামে বোনা বা রোপণ করার ফলে চারা উত্পাদিত হয়। প্রতিটি উদ্ভিদের তার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী স্ক্রীনিং করা হয়ে থাকে। উন্নত এগ্রোনমিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন উদ্ভিদকে সিলেকশন করে তার অনেকগুলো স্যাম্পল উত্পাদন করা হয়। কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী দ্রুততার সঙ্গে উদ্ভিদ সিলেকশনের জন্য ব্যবহূত মলিউকুলার মার্কার এর সাহায্যে প্রজনন পদ্ধতি। রেডিয়েশনের ব্যবহারের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নতুন এবং উন্নত জাত প্রজননের সময় অনেকখানি কমিয়ে এনেছেন।

২০১৭ সালে নভেম্বর মাসে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের সূচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি জগতে প্রবেশ করেছে। দুই ইউনিট সম্বলিত এই প্রকল্পটির প্রথম ইউনিটটির কমিশনিং ২০২৩ সাল নাগাদ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দূষণমুক্ত এনার্জি প্রাপ্তি এবং জলবায়ু পরিবর্তন জ্বালানি মোকাবেলায় এটি একটি বৃহত্ পদক্ষেপ। রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান রসাটম টার্ন-কি ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কাছে হস্তান্তর করবে। রূপপুর প্রকল্পের সফলতায় বাংলাদেশ যে আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছে তারই ধারাবাহিকতায় দেশটি দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুত্ প্রকল্পের জন্য উপযোগী সাইট নির্বাচনের কাজ শুরু করেছে।