পেট্রোলবোমার রাজনীতি আর নয়

গেল ৫ জানুয়ারি থেকে বেশুমার অস্থিরতায় জনতা যখন ব্যাকুল তখন খবর এলো বড় দুটো শহরে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হবে। তখন সবার মনে কী আশা জাগলো? ব্যাকুলতা কাটলো? স্বাভাবিকতার জন্য এ কোন আকাঙ্ক্ষা! বা এটা কী বড় কোনো আশা? এসব নিয়ে নাগরিকদের একপ্রকার বিরক্তিও আছে। বারবারই মনে হয়, এক সময় আফগানিস্তান-পাকিস্তান-শ্রীলংকা-সিরিয়া বা ইরান-ইরাক, প্যালেস্টাইন যুদ্ধ নিয়ে আমরা ভাবতাম। কীভাবে বেঁচে আছে ওখানকার সব মানুষ! এখন আমরাই এসবের মধ্যে যেন ফেঁসে যাচ্ছি। প্রায় প্রতিনিয়ত পেট্রোল বোমা, দগ্ধতা, বার্ন ইউনিট ইত্যাদি দেখতে আর ভাল লাগে না। মানুষজন আতঙ্কে দিশেহারা। প্রায় তিনমাসে একপ্রকার গা-সহাও হয়ে গেছে। কেউ আর এসব নিয়ে ভাবতে বা চিন্তা করতে পছন্দ করছে না। এর মাঝে অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা পেরিয়ে এসএসসি পরীক্ষা হয়ে গেল। আবার শুরু হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষা। দুটো পরীক্ষাই সবার জন্য এক শিহরিত ঘটনা। এখন এই আতঙ্কের ভেতরেই পরীক্ষা চলছে। অনেক কাজ স্থবির হয়ে পড়ে আছে। একটু আশা কবে স্বস্তির পরিবেশ ফিরবে। কিন্তু তা কতোদূর? আদৌ কী সম্ভব?
রাস্তায় বোমা-আগুন থাকবে কেন? প্রতিবাদ? কার বিরুদ্ধে কীসের প্রতিবাদ! এমনটা তো সত্য, বাংলাদেশে বর্তমান সমাজের ভেতরে পার্থক্য ও ফারাক তুমুলভাবে বেড়েছে। ক্রমশ অর্থ-প্রতিপত্তির প্রভাব নিম্ন-মধ্যবিত্ত স্তরে বেড়েছে। তাদের অর্থাগমের সূত্র দুটো উপায়, ১) কর্পোরেট চাকরি ও বাণিজ্য ২) বিশ্বাস করতে না চাইলেও এটা অসত্য নয় যে, দুর্নীতির আগ্রাসী রূপ এখন অহমিকার অধিকারী রূপ ধারণ করেছে। এ বিপুল আগ্রাসনে নৈতিক চরিত্র ও জীবনের সততার ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছে। কিন্তু এর সমাধান দেখা যাচ্ছে না। শাস্তির বিধানের প্রয়োগ একেবারেই নেই। ভোগবাদকে উস্কে দিচ্ছে, উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রবণতা প্রবল। কর্পোরাল পুঁজি দুর্বৃত্ত-পুঁজিকে পাওয়ার সব ফাঁদ পেতে রেখেছে। প্রান্তিক মানুষরা অসুখকে জয় করে প্রাণান্ত পরিশ্রম করে। সারল্য তাদের প্রাণ। কর্ম তাদের নেশা। হরতাল-অবরোধ আর অনাস্থার রাজনীতি তাদের টলাতে পারে না। কর্মময় প্রাণ নিয়েই তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে। রাজনীতিবিদদের স্পর্শ থেকে দূরে থাকে। পরিবারে, সমাজে যে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দেখে তা নির্বিচারে মেনে নিয়েই কাজে যোগ দেয়। কারণ, কাজ ছাড়া বাঁচার বিকল্প তাদের সম্মুখে কিছু নেই। তারা চলতে চায়। প্রতিকূলতার ভেতর দিয়েই চলতে চায়। প্রতিবন্ধকতা আসলে তবুও। এটি প্রকৃতপক্ষে কাজে লাগাতে পারলে অনেক কিছু দ্রুত ঘটার সুযোগ ছিল। কিন্তু তা হচ্ছে না। প্রান্তিক এসব মানুষ ছাড়া, বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স। বিদেশের মাটিতে প্রাণান্ত পরিশ্রম করছে, এদেশের মানুষরা। তাদের স্বোপার্জিত অর্থ এদেশের অপর চালিকা যোগান। এছাড়া আমরা সকলেই গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির কথা জানি। প্রাইভেটাইজেশন ঘটেছে— যে মাত্রায় সেখানে এখনও নিম্নমধ্যবিত্ত সেক্টর তেমন অকার্যকর হয়নি। মধ্যবিত্ত পর্যায়ে তাদের সামাজিক মর্যাদা উঠে আসছে। এক্ষেত্রে  মেয়েদের পর্যাপ্ততা আকর্ষণীয়। নিঃসন্দেহে তা আরও বাড়বে। এক্ষেত্রে এটিই বড় আশার সংবাদ। ‘জনসংখ্যাই জনসম্পদ’নাম্মী যে টার্মটি নিয়ে কথা হচ্ছে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তা সফলতার মুখ দেখতে পারে এদেশের শিক্ষিত মেয়েদের কল্যাণে। তাদের অসীম ধৈর্য ও সাহসিকতার কারণে। এটি একটি অগ্রবর্তী খাত বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। বিশেষ করে,  মেডিক্যাল ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পঠন-পাঠনে মেয়েরা ব্যাপকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এর ফল আগামী দশকেই লক্ষণীয় হবে। কিন্তু সামষ্টিক জনগোষ্ঠীর মান ও কল্যাণ তো শুধু কিছু মানুষের কর্মস্থান বা চাকরি পাওয়ার ওপর নির্ধারণ করে না। সামষ্টিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক সম্মান ও দেশাত্ম চেতনার উপর তা অনেকটাই নির্ভরশীল। সেটি মৌলিক বিষয়।
বাংলাদেশ অকার্যকর রাষ্ট্র হোক আমরা তা কেউ চাই না। যে ধারাবাহিক রাজনৈতিক ইতিহাসের ভেতর দিয়ে গত চুয়াল্লিশ বছরে বাংলাদেশ এ পর্যায়ে এসেছে, সেখানে অনেক ক্ষয়, রক্ত বিসর্জিত হয়েছে। মানুষ অনতিক্রান্ত বৃত্তেই আটকে আছে, অনেকটা। যে অগ্রগতি, তা স্বীয় চেষ্টার। গত বিয়াল্লিশ দিনের অবরোধ-হরতালেও মানুষ অপ্রতিরোধ্য যেন। কাজের অধিকার, কাজের নেশা, কাজের উদ্যমতার অভাব নেই। কৃষক-শ্রমিক কাজ করছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলছে। দিনরাত অস্বীকার করে, ভাগ্য গড়ার কাজে ব্যস্ত। অথচ, শিক্ষিত বা উচ্চস্থান অধিকারী বলে আমরা যারা দাবি করি, তারা এই দেশটির জন্য কী করছি। রাজনীতিকরা ক্ষমতা চান, কর্তৃত্ব করতে চান, সেটি না করতে পেরে প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠেন। এখানে দল-মত নির্বিশেষে তারা এক। এই ফাঁদে পড়ে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন বিপর্যস্ত। এ বিপর্যস্ততার কবলে পড়ে কেউ প্রাণ দিচ্ছেন, কেউবা বার্ন ইউনিটে কাতরাচ্ছেন। এসব নির্মমতায় ঘেরা এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। তারা রাজনীতি বোঝে না। রাজনীতির সুফল তাদের কাছে পৌঁছায় না। আইনের শাসন, বিচার বা শাসনতন্ত্র বিনা অভিপ্রায়ে তাদের ওপর মাঝে মাঝে খড়্গ প্রদর্শন করে। ভয় দেখায়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কখনো কখনো প্রতিপক্ষ হতেও দেখা যায়। বিচার বিভাগের বিচারকগণ দলীয় তোষণে পরিণত যে হন না তা বলা যায় না। এভাবে রাষ্ট্রের স্তম্ভসমূহ অকার্যকর হয়ে পড়লে, বা প্রতিপক্ষ হলে মানুষ দাঁড়াবে কোথায়। দ্রুত অনেক কিছু নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কিন্তু পুনরুদ্ধার হবে কোন উপায়ে। আমাদের কোনো কিছু তো সহজে পুনরুদ্ধার হয় না। একজন খারাপ করে গেলে সেই খারাপটাই দৃষ্টান্ত হয় এবং ততোধিক খারাপ করার আরও প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কথাগুলো ধান ভানতে শিবের গীত মনে হলেও তা অপ্রাসঙ্গিক নয়। একই কথার ভেতরে প্রতিনিয়ত আমরা দিন গুণছি। কবে সমস্যার সমাধান হবে, কীভাবে হবে। আর কতো নৃশংসতা চোখে পড়বে। কতোজন পুড়বে। রাজনীতির এ পোড়া বাতাস কী মানুষকে শুধু পুড়িয়েই নিঃশেষ করবে না আমরা কিছু পাব! আর কতো? আশারও তো শেষ সীমা আছে। দেয়ালে পিঠ ঠেকার কী আরও বাকি? এরকম কতো প্রশ্নে ভেতরে আর নিজেকে আটকানো যায়!
আমরা হারিয়েছি অনেক। এখন পেতে চাই। দুটো প্রধান দলের রাজনৈতিক ইতিহাস আমাদের জানা। মানুষই বেছে নিক, সঠিকটি। সে রশিটি তার হাতেই থাক। দেশপ্রেমিক শক্তি রাজনীতির ভেতর থেকেই তৈরি হবে। রাজনীতিকরাই দেশ চালাবেন। রাজনীতিকরাই গণতন্ত্র আনবেন। কিন্তু তা পরিশুদ্ধ হতে হবে। পরিচর্যাটুকু করতে হবে। সহনশীলতার ভেতরে স্থির থাকতে হবে। নইলে মানুষ জেগে উঠবে। সেটি সমাজ অভ্যন্তরের ভেতর থেকেই তৈরি হবে। মানুষই একদিন সে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাবে। সেটিই ইতিহাসের সত্য। তাতে আরও ক্ষয় ও বিনাশ হতে পারে, কিন্তু মানুষের চূড়ান্ত বিজয়ের পথটুকু মানুষই তৈরি করবে। কালে কালে তাই হয়েছে। ইতিহাসও তাই বলে।
কাজেই রাজনীতিকদের পেট্রোলবোমা থেকে সরে এসে ইতিবাচক রাজনীতি করতে হবে। ধ্বংসাত্মক রাজনীতি পরিহার করার বিকল্প নেই। কারণ, সম্মুখে এগুনোর শক্তি জনতা; জনতা এখন পজেটিভ ও ক্রিয়েটিভ কিছু চায়। তার প্রমাণ, মাঝে-মাঝে হরতাল না থাকলেই কর্মের বিপুল উদ্যমতা, কাজের জন্য অন্তর্নিহিত অনাবিল শক্তি। তাই বোমা-আগুন ছেড়ে, রাজনীতির দায়টুকু দেশের পক্ষে বহন করুন। তাতে সকলেরই কল্যাণ।    
n লেখক :অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]/* */